11/10/2026
ফেসবুক, ইউটিউব, নিউজ পেপার,
টেলিভিশন কিংবা ইনস্টাগ্রাম..
যেদিকেই তাকাই, শুধু সমস্যা আর সমস্যা।
কোথাও অন্যায়, কোথাও অবিচার, কোথাও দুর্নীতি, কোথাও মানুষের অসহায়ত্ব। কোনো একটা ঘটনা সামনে আসে, আমরা দেখি, শুনি, কষ্ট পাই, রাগ করি। কেউ পোস্ট লিখি, কেউ শেয়ার করি, কেউ কমেন্টে ক্ষোভ প্রকাশ করি।
কেউ আবার দীর্ঘ লেখা লিখে
বোঝানোর চেষ্টা করি..
মানুষের বিবেক এখনো বেঁচে আছে।
তারপর?
কয়েকদিন পর সেই ঘটনাটা আর মনে থাকে না।
এর মধ্যেই নতুন কোনো ঘটনা সামনে আসে। নতুন কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। আমরা আবার উত্তেজিত হই,
আবার লিখি, আবার প্রতিবাদ করি।
তারপর সেটাও ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়
নতুন কোনো খবরের ভিড়ে।
এভাবেই যেন একটা বৃত্তের মধ্যে
ঘুরে চলেছি আমরা।
দেখছি, শুনছি, মন্তব্য করছি,
প্রতিবাদ করছি..
কিন্তু শেষ পর্যন্ত কতটা বদলাচ্ছি?
মাঝে মাঝে নিজের কাছেই প্রশ্ন আসে..
আমাদের বিবেক কি সত্যিই বদলেছে,
নাকি শুধু প্রতিবাদের ভাষাটা বদলেছে?
আমরা অন্যের অন্যায় খুব সহজে দেখতে পাই। কিন্তু সেই অন্যায় যখন নিজের স্বার্থের সঙ্গে জড়িয়ে যায়, তখন কি আমাদের অবস্থানটা একই থাকে?
যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমরা লিখি,
সুযোগ পেলে তার সামান্য সুবিধাটুকু
নিতে কি আমাদের দ্বিধা হয়?
যে অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলি,
সেটা নিজের সুবিধায় হলে কি
তখনও অন্যায় মনে হয়?
যে মানুষের অধিকার নিয়ে
সোচ্চার হই, বাস্তব জীবনে তার সঙ্গে
আমাদের আচরণটা কেমন?
হয়তো সমস্যাটা এখানেই।
আমরা অন্যের চরিত্রের বিচার
করতে খুব আগ্রহী, কিন্তু নিজের চরিত্রটা আয়নায় দেখতে খুব একটা আগ্রহী নই।
আমরা চাই সমাজ বদলাক,
মানুষ বদলাক, দেশ বদলাক..
কিন্তু পরিবর্তনের শুরুটা যেন সবসময়
অন্য কারও কাছ থেকেই হোক।
অথচ সমাজ তো আলাদা কোনো জিনিস নয়।
এই সমাজটা আমরাই।
আমাদের ছোট ছোট মিথ্যা,
ছোট ছোট অন্যায়, অন্যায় দেখে চুপ থাকা, নিজের স্বার্থে নীতির সঙ্গে আপস করা,
পরিচিত বা আপন মানুষ অন্যায় করলে
তার পক্ষ নেওয়া..
এসবই তো ধীরে ধীরে সমাজের
বড় চেহারাটা তৈরি করে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের
কথা বলার একটা বড় সুযোগ দিয়েছে।
কিন্তু একটা পোস্ট লিখে,
একটা ছবি শেয়ার করে,
কয়েকটা কমেন্ট করে কি সত্যিই আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়?
একটা পোস্ট হয়তো কিছু মানুষকে ভাবাবে। একটা প্রতিবাদ হয়তো কিছু সময়ের জন্য আলোচনার জন্ম দেবে।
কিন্তু বাস্তব পরিবর্তন তখনই আসবে,
যখন আমাদের কথার সঙ্গে কাজেরও
একটা মিল থাকবে।
সত্যি বলতে কী,
আমরা অনেক সময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে নই; আমরা শুধু অন্যের অন্যায়ের বিরুদ্ধে।
নিজের মানুষ হলে,
নিজের স্বার্থ জড়িত থাকলে,
নিজের সুবিধা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকলে..আমাদের নীতিবোধটা অনেক সময় আশ্চর্য রকম নরম হয়ে যায়।
আর সেখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
কারণ সমাজ শুধু বড় বড়
অপরাধে নষ্ট হয় না।
প্রতিদিনের ছোট ছোট আপস,
সুবিধার জন্য সত্যকে পাশ কাটানো,
অন্যায় দেখে চুপ থাকা,
নিজের স্বার্থে নীতিকে বিসর্জন দেওয়া..
এসবও সমাজকে ভেতর থেকে দুর্বল করে।
তাই পরিবর্তন শুধু রাস্তায় দাঁড়িয়ে
স্লোগান দেওয়ার মধ্যে নেই।
পরিবর্তন শুধু একটা পোস্টে নেই।
পরিবর্তন শুধু অন্যকে উপদেশ দেওয়ার
মধ্যেও নেই।
পরিবর্তন শুরু হতে পারে
খুব ছোট জায়গা থেকে...
নিজের ভুল স্বীকার করা থেকে।
সুযোগ পেয়েও অন্যায় সুবিধা না নেওয়া থেকে।
অন্যের অধিকারকে নিজের অধিকারের মতো গুরুত্ব দেওয়া থেকে।
নিজের মানুষ অন্যায় করলে
তার পক্ষ না নেওয়া থেকে।
আর সবচেয়ে বড় কথা..
যে নীতির কথা অন্যকে বলি, সেটা নিজের জীবনেও মানার চেষ্টা করা থেকে।
হয়তো পৃথিবী একদিনে বদলাবে না।
সমাজও একদিনে বদলাবে না।
কিন্তু অন্তত আমরা নিজেদের কাছে
সৎ হতে পারি।
অন্যায়ের খবর দেখে ক্ষুব্ধ হওয়া সহজ।
একটা পোস্ট লেখা সহজ।
অন্যকে নীতির কথা বলা সহজ।
কঠিন হলো..
নিজের স্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়েও
সেই নীতিতে অটল থাকা।
কারণ সত্যিকারের পরীক্ষা তখনই,
যখন অন্যায়টা আমার পক্ষে যায়।
সেখানে দাঁড়িয়ে যদি বলতে পারি..
“না, এটা অন্যায়।
আমার লাভ হলেও আমি এটা করব না।”
তাহলেই হয়তো বলা যাবে,
আমাদের বিবেক এখনো পুরোপুরি
হারিয়ে যায়নি।
নইলে আমরা শুধু দর্শক।
ঘটনা দেখি,
কিছুক্ষণ ক্ষুব্ধ হই,
কয়েকটা কথা লিখি,
তারপর স্ক্রল করে চলে যাই।
একটা অন্যায় চলে যায়, আরেকটা আসে।
একটা পোস্ট হারিয়ে যায়,
আরেকটা পোস্ট জায়গা নেয়।
নিউজফিড বদলায়, খবর বদলায়,
আলোচনার বিষয় বদলায়।
কিন্তু আমরা যদি না বদলাই,
তাহলে কিছুই আসলে বদলায় না।
তাই হয়তো অন্যকে বদলানোর আগে
একবার নিজের ভেতরেই তাকানো দরকার।
কারণ শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা খুব কঠিন,
কিন্তু খুব সাধারণ।
আমরা কি সত্যিই অন্যায়ের বিরুদ্ধে,
নাকি শুধু অন্যায়টা যখন আমাদের
বিরুদ্ধে যায় তখনই?