02/08/2026
একটা মাত্র শর্ত পূরণ করলে রিজিকের দরজা এমনভাবে খোলে, যা কল্পনাও করেননি
রাত দুইটার একটা দৃশ্য কল্পনা করুন। এক মানুষ বিছানায় শুয়ে ছটফট করছেন। ঘুম আসছে না। মাথায় ঘুরছে সংসারের হিসাব — মাস শেষে বাড়ি ভাড়া, সন্তানের স্কুলের ফি, বাজারের বাড়তি দাম, বৃদ্ধ মায়ের ওষুধ। উপার্জন যা হয়, তা দিয়ে কীভাবে কী সামলাবেন — সেই দুশ্চিন্তায় বুকের ভেতরটা চেপে আসছে।
এই দৃশ্যটা কি চেনা লাগছে? আজ বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটা ঘরের গল্প এটাই। রিজিকের চিন্তায় আমরা এমন এক দৌড়ে নেমেছি, যে দৌড়ের শেষ নেই। সকালে অফিস, বিকেলে টিউশন, রাতে আবার একটা পার্টটাইম — তবু মনে হয় যথেষ্ট হচ্ছে না। আর এই দুশ্চিন্তার চাপে ধীরে ধীরে আমরা সেই কথাটাই ভুলে যাই, যা আল্লাহ জাল্লা জালালুহু কুরআনে সরাসরি বলে দিয়েছেন। তিনি রিজিকের একটা সমীকরণ দিয়ে রেখেছেন — এত সহজ যে বিশ্বাস হতে চায় না, এত বড় যে হিসাব মেলে না।
সমীকরণটা দেখুন —
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا ۞ وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ ۚ وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ
উচ্চারণ: ওয়া মাঁই ইয়াত্তাকিল্লাহা ইয়াজআল লাহু মাখরাজা। ওয়া ইয়ারজুকহু মিন হাইসু লা ইয়াহতাসিব। ওয়া মাঁই ইয়াতাওয়াক্কাল আলাল্লাহি ফাহুয়া হাসবুহ।
অর্থ: যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ বের করে দেন। আর তিনি তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেন, যা সে কল্পনাও করেনি। আর যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। (সূরা তালাক, আয়াত ২-৩)
দুই আয়াতে তিনটা প্রতিশ্রুতি — একটার পর একটা। আয়াতটা এত ওজনদার যে ধীরে ধীরে ভেঙে দেখতে হয়।
প্রথম প্রতিশ্রুতি — উত্তরণের পথ। আল্লাহ বলছেন, যে আল্লাহকে ভয় করে চলে, তার জন্য তিনি "মাখরাজ" বের করে দেন। মাখরাজ শব্দের অর্থ বেরিয়ে আসার দরজা। অর্থাৎ যে সংকট আপনাকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরেছে, যে সমস্যাটাকে অদ্রবণীয় মনে হচ্ছে — সেখানে আল্লাহ এমন একটা দরজা খুলে দেন, যা এতদিন আপনার চোখে পড়েনি। এই দরজা কোনো নতুন সৃষ্টি নয়, এটা আগে থেকেই ছিল — শুধু তাকওয়ার শর্তে সেটা দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
দ্বিতীয় প্রতিশ্রুতি — অকল্পনীয় উৎস থেকে রিজিক। এখানে আল্লাহ ব্যবহার করেছেন এক আশ্চর্য শব্দ — "মিন হাইসু লা ইয়াহতাসিব," এমন জায়গা থেকে যা সে হিসাবেই আনেনি। ভাবুন এই কথাটার অর্থ। আপনি আপনার রিজিকের সব সম্ভাব্য উৎসের একটা মানসিক তালিকা রাখেন — চাকরি, ব্যবসা, ভাড়া, সঞ্চয়। এই তালিকার বাইরে যাওয়ার কথা কল্পনাতেও আসে না। কিন্তু আল্লাহ বলছেন — তাকওয়াবানের জন্য তিনি তার সেই তালিকার সম্পূর্ণ বাইরে থেকে রিজিক পাঠান। কোনো একটা মানুষ কোথা থেকে হঠাৎ করে এসে দাঁড়ায়, একটা সুযোগ কোথা থেকে ঘুরে আসে, একটা পাওনা টাকা এত বছর পর হঠাৎ ফেরত পৌঁছায় — যেটাকে দুনিয়া "কাকতালীয়" বলে, মুমিন বলে "মিন হাইসু লা ইয়াহতাসিব।"
তৃতীয় প্রতিশ্রুতি — আল্লাহ নিজেই যথেষ্ট। "ফাহুয়া হাসবুহ" — যিনি আল্লাহর ওপর ভরসা করেন, আল্লাহই তার জন্য যথেষ্ট। এই এক লাইনে দুশ্চিন্তার শিকড় কেটে দেওয়া হলো। আপনি চাকরির ওপর ভরসা করলে, চাকরি চলে গেলে ভেঙে পড়বেন। ব্যবসার ওপর ভরসা করলে, ব্যবসায় লোকসান হলে ধুলোয় মিশে যাবেন। কিন্তু যিনি সরাসরি আল্লাহর ওপর ভরসা রাখেন, তার হিসাবের পাল্লা কোনো একটা আসবাবের ওঠানামায় দুলে যায় না — তিনি জানেন, একটা দরজা বন্ধ হলে দশটা খোলার মালিকই তাঁর ভরসার ঠিকানা।
এবার আয়াতের সেই "শর্ত"টার দিকে ফিরি। আল্লাহ কী চাইলেন এই তিন পুরস্কারের বিনিময়ে? তাকওয়া আর তাওয়াক্কুল। তাকওয়া মানে — জীবনের প্রতিটা লেনদেনে আল্লাহকে সামনে রাখা। ব্যবসায় হারামের প্রস্তাব এলে থেমে যাওয়া, লোকসানের ভয় দেখিয়ে যখন সুদের দিকে ঠেলা হয় তখন সরে দাঁড়ানো, চাকরিতে যখন মিথ্যা রিপোর্টের চাপ আসে তখন সত্য বলা। আর তাওয়াক্কুল মানে — আসবাব হাতে রেখে কাজ করা, কিন্তু ভরসা রাখা আসবাবের রবের ওপর। কাজ করবেন পুরো শক্তি দিয়ে, কিন্তু বিশ্বাস রাখবেন কাজের ওপর নয় — যিনি কাজে বরকত দেন, তাঁর ওপর।
এখানে একটা ভুল বোঝাবুঝি পরিষ্কার করি। এই আয়াত পড়ে অনেকে ভাবেন — তাহলে চেষ্টা ছেড়ে দিলেই তো হয়, আল্লাহ তো নিজে থেকেই দেবেন। এটা সম্পূর্ণ ভুল বোঝা। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে একদল লোক এসেছিলেন, যাঁরা কাজ ছেড়ে মসজিদে বসে থাকতেন — বলতেন "আমরা তো তাওয়াক্কুলকারী।" উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁদের ধমক দিয়ে বললেন — তোমরা তাওয়াক্কুলকারী নও, তোমরা ভরসা করে বসে থাকা মানুষ। প্রকৃত মুতাওয়াক্কিল সে, যে বীজ বপন করে, তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা রাখে। তাওয়াক্কুল হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকার নাম নয় — তাওয়াক্কুল হলো পুরো চেষ্টা করেও অন্তরে বিশ্বাস রাখা যে ফল আসে আল্লাহর হাত থেকে, চেষ্টার হাত থেকে নয়।
আসল কথাটা হলো, এই আয়াত রিজিক কমানোর কথা বলছে না — বলছে রিজিকের উৎস বহুগুণ বাড়ানোর কথা। এতদিন আপনি হয়তো একটাই দরজা দিয়ে রিজিক আসার হিসাব করে বসে ছিলেন, দুশ্চিন্তায় ঘুম হারাম করছিলেন — কারণ ওই একটা দরজা বন্ধ হলে সব শেষ। আর তাকওয়ার শর্ত পূরণ করলে আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন — এমন সব দরজা খুলে দেবেন, যেগুলোর অস্তিত্বই আপনি জানতেন না। ফলাফল কী? একটা দরজা বন্ধ হলেও অন্তরে কোনো ধাক্কা লাগে না — কারণ মালিক যাকে বলেছেন "মিন হাইসু লা ইয়াহতাসিব," তাঁর ভান্ডারে দরজার কোনো অভাব নেই।
আজকের জীবনে এই শিক্ষাটা কাজে লাগানোর একটা সহজ অনুশীলন দিই। এই সপ্তাহে একটা মাত্র সিদ্ধান্ত নিন — যেখানে আপনার চোখে "রিজিকের জন্য দরকার" মনে হলেও আল্লাহর অপছন্দ আছে, সেই একটা জিনিস আজ ছেড়ে দিন। হয়তো একটা সন্দেহজনক লেনদেন, হয়তো একটা বাড়তি আয়ের হারাম উপায়, হয়তো ওজনে সামান্য কারচুপি। ছাড়ার সময় অন্তরে ভয় জাগবে — সংসার কীভাবে চলবে? ঠিক তখনই এই আয়াতটা পড়ুন। আর অপেক্ষা করুন — আল্লাহ কীভাবে এমন উৎস থেকে রিজিক পাঠান, যা আপনার হিসাবে ছিলই না। এই একটা অভিজ্ঞতাই আপনার সারা জীবনের ভরসার সমীকরণ বদলে দেবে, ইনশাআল্লাহ।
তাকওয়া আর তাওয়াক্কুলের এই পুরো সমীকরণ, রিজিকের পর্দার পেছনে।