01/01/2026
সূরা নসরের সংক্ষিপ্ত দারস: (১০মিনিট)
হামজা উল্লাহ
কক্সবাজার শহর, কক্সবাজার। ০১-০১-২০২৬খ্রি:
আরবি তেলাওয়াত
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ
১. (إِذَا جَاءَ نَصْرُ اللَّهِ وَالْفَتْحُ)
২. (وَرَأَيْتَ النَّاسَ يَدْخُلُونَ فِي دِينِ اللَّهِ أَفْواجا)
৩. ((فَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ وَاسْتَغْفِرْهُ إِنَّهُ كَانَ تَوَّابًا
এটা পবিত্র কোরআনের ১১০নং সুরা।
কুরআনের সর্বশেষ সূরা।
আয়াত ৩, শব্দ ১৯, বর্ণ ৭৯।
এই সুরাটি সূরা তওবার পরে মদীনায় অবতীর্ণ হয়।
সূরা নসরের নামকরণ
সূরা নসরের নামকরণ করা হয়েছে এর প্রথম আয়াতের শব্দ "নসর" (النَّصْر) থেকে, যার অর্থ 'সাহায্য' বা 'বিজয়’। এটি সূরা কাওসারের পর এবং সূরা ইখলাস এর আগে অবস্থিত। এই সূরার আরেক নাম হলো "তাওদী" (التوديع) বা 'বিদায়ের সূরা', কারণ এতে রাসুল (সা:) এর ওফাত নিকটবর্তী হওয়ার ইঙ্গিত ছিল।
নামকরণের কারণ:
"নসর" (সাহায্য/বিজয়): এই সূরার প্রথম আয়াতে আল্লাহর সাহায্য ও বিজযয়ের কথা বলা হয়েছে, যা ইসলামের চূড়ান্ত বিজয়কে নির্দেশ করে, তাই "নসর" নামটি এসেছে।
"তাওদী" (বিদায়): এই সূরার বিষয় বস্তু থেকে বোঝা যায় যে, রাসুল (সা:) এর মিশন প্রায় সম্পন্ন হয়েছে এবং তার বিদায় (ওফাত) সন্নিকটে। তাই একে বিদায়ের সূরাও বলা হয়।
শানে নুযুল:
সূরা আন-নসর মূলত মক্কা বিজয়ের প্রেক্ষাপটে নাযিল হয়েছিল, যা ইসলামের চূড়ান্ত বিজয় ও মানব জাতির দলে দলে ইসলামে প্রবেশ করার সু-সংবাদ দেয় এবং একই সাথে রাসূল (সাঃ) এর ওফাত সন্নিকটে হওয়ার ইঙ্গিত বহন করে, তাই এটি বিদায়ী সূরা হিসেবেও পরিচিত, যা নাজিলের পর নবীজী (সাঃ) তাঁর শেষ জীবনে বেশি বেশি (তাসবীহ ও ইস্তেগফার) পাঠ করতেন।
শানে নুযূলের মূল বিষয়:
মক্কা বিজয়: মক্কা বিজয়ের পর ইসলাম যে পূর্ণতা লাভ করে এবং আল্লাহ তায়ালার সাহায্য যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তা এই সূরার মাধ্যমে ঘোষিত হয়।
ইসলামের ব্যাপক প্রসার: আল্লাহ মানুষকে দলে দলে ইসলামে প্রবেশ করতে দেখার কথা বলেছেন, যা ছিল ইসলামের বিজরয়রই প্রতিফলন।
ওফাতের ইঙ্গিত: এই সূরা নাযিল হওয়ার পর, ইবনে আব্বাস (রা:) এর বর্ণনানুযায়ী, রাসূল (সা:) বুঝতে পারেন যে তাঁর দুনিয়ার জীবনের মেয়াদ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে এবং তিনি তাঁর প্রভুর কাছে ফিরে যাবেন, তাই তিনি তাঁর শেষ জীবনে বেশি বেশি "সুবহানাল্লাহ, আলহামদুল্লিাহ ও 'আস্তাগফিরুল্লাহ' পাঠ করতেন।
শেষ সূরা: এটি কুরআনের শেষ পূর্ণাঙ্গ সূরা গুলোর মধ্যে অন্যতম, যা রাসূল (সাঃ) এর দাওয়াত ও মিশনের সমাপ্তি ঘোষণা করে।
সংক্ষেপে: সূরা নাসর একদিকে যেমন ইসলামের চূড়ান্ত বিজয় ও প্রসারের সুসংবাদ, তেমনই অন্যদিকে এটি রাসূল (সাঃ) এর জীবনের শেষ অধ্যায়ের সূচনাকারী একটি সূরা, যা তাঁকে আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়ার এবং ক্ষমা প্রার্থনা করার নির্দেশ দেয়।
আয়াত ১:
((إِذَا جَاءَ نَصْرُ اللَّهِ وَالْفَتْحُ
“যখন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় এসে পৌঁছাবে”
আল্লাহর সাহায্য ও বিজয:
এই সূরাটি মক্কা বিজয়ের সময়ের কথা বলে, যা ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশাল সাহায্য। এটি প্রমাণ করে যে, চূড়ান্ত বিজয় আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে, মানুষের শক্তি দ্বারা নয়।
সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা:
তাফহীমুল কুরআন: এখানে “আল্লাহর সাহায্য” বলতে বোঝানো হয়েছে এমন বিশেষ সহায়তা, যার ফলে ইসলাম সুপ্রতিষ্ঠিত হবে।
“বিজয়” বলতে মূলত মক্কা বিজয়কে বোঝানো হয়েছে, যা ছিল ইসলামের দাওয়াতের নির্ধারক মোড়।
ফি জিলালিল কুরআন: সাইয়্যেদ কুতুব ব্যাখ্যা করেন: এটি ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর রাসূলের জন্য প্রতিশ্রুত বিজয়ের পূর্ণতা। শুধু
রাজনৈতিক জয় নই বরং আল্লাহর দ্বীনের সার্বিক প্রতিষ্ঠা।
মা'আরিফুল কুরআন: বিজয় আসা মানে শুধু সামরিক সাফল্য নয়, বরং দীর্ঘ বছরের দাওয়াত ও সংগ্রামের চূড়ান্ত ফল। এ বিজয় সরাসরি
আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে, মানুষ কেবল এর বাহক।
মূল কথা হচ্ছে: এই আয়াতে আল্লাহ নবী (স:) কে স্মরণ করিয়ে দেন যে, বিজয় আসলে তা হবে আল্লাহর সাহায্যের ফল, ব্যক্তিগত কৃতিত্ব নয়।
:ইসলাম ও মুসলমানদের সকল সফলতা এবং মক্কা বিজয়ের মতো বড় বিজয় আল্লাহর সাহায্যেই সম্ভব হয়েছে। মানুষের শক্তি এখানে
গৌণ, আল্লাহর ইচ্ছাই মুখ্য।
আয়াত ২:
(وَرَأَيْتَ النَّاسَ يَدْخُلُونَ فِي دِينِ اللَّهِ أَفْواجا)
“আর তুমি দেখবে মানুষ দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করছে”
মানুষের ইসলামে প্রবেশ তথা মানুষের ঢল: মক্কা বিজয়ের পর আরবের গোত্র গুলো দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করে। এটি আল্লাহর দ্বীনের সত্যতার একটি বড় প্রমাণ।
সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা:
তাফহীমুল কুরআন: মক্কা বিজয়ের আগে ইসলাম গ্রহণ মূলত ধীরে ধীরে হত, কিন্তু বিজয়ের পর গোত্র ও জাতি দলে দলে ইসলাম গ্রহণ
করতে শুরু করল। এটি ছিল আরব সমাজে ইসলামের সম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠার দৃশ্য।
ফি জিলালিল কুরআন: এটি আল্লাহর দ্বীনের বিজয়ের সর্বোচ্চ চিত্র যখন আর ভয়-শঙ্কা থাকবে না এবং মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ইসলামে
প্রবেশ করবে।
মা'আরিফুল কুরআন: এখানে “আফওয়াজা” (দলে দলে) শব্দটি নির্দেশ করছে ব্যাপক ও দ্রুত গ্রহণ যোগ্যতা, যা নবী (স:) এর মিশনের পূর্ণ
সফলতার প্রতীক।
মূল কথা হচ্ছে: বিজয় ও আল্লাহর সাহায্যের পর প্রকৃত সাফল্যের চিত্র হলো মানুষের হৃদয়ে সত্যের প্রতি ব্যাপক সাড়া জাগানো।
:বিজয়ের পর দলে দলে মানুষ ইসলাম গ্রহণ করছিল, যা আল্লাহর রহমত ও দ্বীনের প্রসারের ইঙ্গিত ছিল।
আয়াত ৩:
(فَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ وَاسْتَغْفِرْهُ إِنَّهُ كَانَ تَوَّابًا)
“তাহলে তোমার পালনকর্তাকে প্রশংসাসহ পবিত্র ঘোষণা করো এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো; নিশ্চয়ই তিনি তওবা কবুলকারী”
সাফল্যে বিনয়ী হওয়া: বড় কোনো সাফল্য বা বিজয় আসলে অহংকার না করে বরং মহান আল্লাহর প্রশংসা ও তসবিহ পাঠ করতে হবে।
ক্ষমা প্রার্থনা (ইস্তিগফার): রাসুলুল্লাহ (সা.) নিষ্পাপ হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে ইস্তিগফার করতে বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে যে, জীবনের শেষ সময়ে বা কোনো মহৎ কাজ শেষে আল্লাহর কাছে বেশি বেশি ক্ষমা চাওয়া মুমিনের গুণ।
সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা:
তাফহীমুল কুরআন: বিজয় ও সাফল্যের মুহূর্তে অহংকার না করে আল্লাহর প্রশংসা ও ক্ষমা প্রার্থনা করতে বলা হয়েছে। এটি নবী (স:) এর
জন্য শেষ নির্দেশ, যা ইন্তেকালের প্রস্তুতির ইঙ্গিতও দেয়।
ফি জিলালিল কুরআন: সাফল্যের সময় মুমিনের করণীয় আল্লাহর মহিমা ঘোষণা, প্রশংসা ও ক্ষমা প্রার্থনা। সাইয়্যেদ কুতুব এখানে বলেন
এটি জাগতিক বিজয় নয় বরং আধ্যাত্মিক পরিপূর্ণতা।
মা'আরিফুল কুরআন: ইস্তিগফার শুধু গুনাহ মাফের জন্য নয়, এটি আল্লাহর সামনে বিনয় প্রকাশ। মহানবী (স:) নিজেও শেষ জীবনে প্রচুর
ইস্তিগফার করতেন। হাদিস: “আমি প্রতিদিন সত্তরেরও বেশি বার ইস্তিগফার করি”
মূল কথা হচ্ছে: সাফল্যের চূড়ান্ত মুহূর্তে আল্লাহর মহিমা ঘোষণা ও বিনয় প্রদর্শনই হলো প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য।
: আমাদের জীবনে যখন কোনো বড় সাফল্য আসে, তখন আনন্দ-উল্লাস বা অহংকারে মত্ত না হয়ে সিজদায় অবনত হওয়া।
গুরুত্ব বা শিক্ষা:
১। আল্লাহর সাহায্যই ২। সাফল্যে বিনয়ী হওয়া ৩। ক্ষমা প্রার্থনা (ইস্তিগফার) ৪। অহংকার পরিহার করে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ:
আমাদের জীবনে যখন কোনো বড় সাফল্য আসে, তখন আনন্দ-উল্লাস বা অহংকারে মত্ত না হয়ে সিজদায় অবনত হওয়া এবং 'সুবহানাল্লাহ' ও 'আস্তাগফিরুল্লাহ' ইত্যাদি যিকির করার অভ্যাস করা উচিত।
== ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণনা মতে এ সূরাটি নাযিল হবার পর রসূলুল্লাহ (সা) বলেন : আমাকে আমার মৃত্যুর খবর দেয়া হয়েছে এবং আমার সময় পূর্ণ হয়ে গেছে। ( মুসনাদে আহমাদ , ইবনে জারীর , ইবনুল মুনযির ও ইবনে মারদুইয়া )
== হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত অন্যান্য রেওয়ায়াত গুলোতে বলা হয়েছে : এ সূরাটি নাযিল হবার পর রসূলুল্লাহ (সা) বুঝতে পেরেছিলেন যে ,তার দুনিয়া থেকে বিদায় নেবার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। (মুসনাদে আহমাদ ,ইবনে জারীর ,তাবারানী ,নাসায়ী ,ইবনে আবী হাতেম ও ইবনে মারদুইয়া )
== উম্মল মু’মিনীন হযরত উম্মে হাবীবা (রা) বলেন, এ সূরাটি নাযিল হলে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন : এ বছর আমার ইন্তিকাল হবে। একথা শুনে হযরত ফাতিমা (রা) কেঁদে ফেললেন। এ অবস্থা দেখে তিনি বললেন, আমার বংশধরদের মধ্যে তুমিই সবার আগে আমার সাথে মিলিত হবে। একথা শুনে হযরত ফতিমা (রা) হেসে ফেললেন। ( ইবনে আবি হাতেম ও ইবনে মারদুইয়া ) প্রায় এই একই বিষয়বস্তু সম্বলিত হাদীস বাইহাকীতে ইবনে আব্বাস (রা) থেকে উদ্ধৃত করেছেন ।
== হযরত উম্মে সালামা বলেন : রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনের শেষের দিকে উঠতে বসতে চলতে ফিরতে তার পবিত্র মুখে সর্বক্ষণ একথাই শুনা যেতো: 'সুবহানাল্লাহ' ও 'আস্তাগফিরুল্লাহ' এই যিকির সমুহ করতেন। আমি একদিন জিজ্ঞেস করলাম , হে আল্লাহর রসুল ! আপনি এ যিকিরটি বেশী করে করেন কেন ? জবাব দিলেন , আমাকে হুকুম দেয়া হয়েছে , তারপর তিনি এ সূরাটি পড়লেন ।
== ইবনে আব্বাস (রা ) বলেন , এ সূরাটি নাযিল হবার পর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আখেরাতের জন্য শ্রম ও সাধনা করার ব্যাপারে খুব বেশী জোরে-শোরে আত্মনিয়োগ করেন। এর আগে তিনি কখনো এমন ভাবে আত্মনিয়োগ করেননি। (নাসায়ী ,তাবারানী ,ইবনে আবী হাতেম ও ইবনে মারদুইয়া )
বি:দ্র: ভূল বা সংশোধনী থাকলে সহযোগীতা করার অনুরোধ রইল।
হামজা উল্লাহ, ১০নং ওয়াড, কক্সবাজার শহর, কক্সবাজার।