11/07/2026
কাঁচ
বৃষ্টি পড়ছিল টুপটাপ। যেন আকাশও দ্বিধায় ছিল ঝরবে কি ঝরবে না, সে সিদ্ধান্ত যেন এখনও নিতে পারেনি।
ঋদ্ধ সাইকেলের সিটে বসে ছিল। চায়ের দোকানের টিনের চালা থেকে টুপটুপ করে পানি পড়ছিল তার কাঁধের পাশেই। হাতে মাটির কাপ। ধোঁয়া ওঠা গরম চায়ের উষ্ণতা হাতের তালু বেয়ে ধীরে ধীরে শরীরে ছড়িয়ে যাচ্ছিল। সে নিজের ছোট্ট এক জগতে ডুবে ছিল- বৃষ্টি, চা আর নীরবতা। এই তিনে মিলে তার চারপাশে যেন এক টুকরো আশ্রয় তৈরি হয়েছিল।
তৎক্ষণাৎ একটা শব্দ। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির জানালার কাঁচ নামার শব্দ।
পাশে থেমে থাকা গাড়িটির জানালার কাঁচ আধাআধি নেমে এলো। ভেতরে ইমতিয়াজ। ঋদ্ধের বড় ভাইয়ের মতো। সম্পর্কে ফুফুর ছেলে। শহরের আত্মীয়। মুখে পরিচিত হাসি, কিন্তু চোখে সেই পুরোনো দূরত্ব, যা কখনও পুরোপুরি ঘুচে ওঠেনি।
- "কী রে, বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে চা খাচ্ছিস?"
গলায় কৌতুক মেশানো এক ধরনের স্নেহ ছিল। শোনায় আন্তরিক, কিন্তু কোথাও যেন গভীরে পৌঁছায় না।
ঋদ্ধ হালকা হেসে বলল, "হ্যাঁ। বৃষ্টির দিনে চায়ের স্বাদই আলাদা।"
কথা শুরু হলো- আবহাওয়া নিয়ে, রাস্তার জ্যাম নিয়ে, পরিবারের টুকিটাকি খবর নিয়ে। সাধারণ, ভদ্র, প্রয়োজনীয় কথা। কিন্তু প্রতিটি বাক্যের মাঝখানে যেন একটা অদৃশ্য কাঁচ দাঁড়িয়ে ছিল, যা কখনও পুরোপুরি নামেনি।
ইমতিয়াজ কথা বলছিল গাড়ির ভেতর থেকে। শুকনো, আরামদায়ক এক জায়গায় বসে। আর ঋদ্ধ বসেছিল বাইরে, সাইকেলের ওপর, বৃষ্টির মুখোমুখি।
একসময় ইমতিয়াজ হেসে বলল, "তুই তো ছোট। তোর এখনও অনেক শেখার আছে।"
কথাটা বৃষ্টির ফোঁটার মতোই ওপর থেকে নেমে এলো। গায়ে লাগল, কিন্তু ভেতরে ঢুকল না। এই বাক্যটা তার কাছে নতুন নয়। বহুবার শোনা। যেন বহুদিন ধরে লেগে থাকা এক অদৃশ্য তকমা।
ঋদ্ধ শুধু মাথা নাড়ল।
সব কথার জবাব দিতে হয় না। কিছু কথা শুধু শুনে যেতে হয়। সৌজন্যের জন্য, সম্পর্কটুকু টিকিয়ে রাখার জন্য।
মিনিট পাঁচেক কথা হলো। হাসিও হলো। কিন্তু সেই হাসির নিচে চাপা পড়ে রইল বহুদিনের অস্বস্তি। যেটা দুজনেই অনুভব করছিল, অথচ কেউ উচ্চারণ করল না।
ঠিক তখনই ইমতিয়াজের ফোন বেজে উঠল।
- "আচ্ছা রে, আমি যাই। ভালো থাকিস।"
কাঁচটা আবার ধীরে ধীরে উঠে গেল। যেন একটি দরজা নিঃশব্দে বন্ধ হয়ে গেল।
ঝাপসা বৃষ্টির মধ্য দিয়ে গাড়িটা হারিয়ে গেল, শুধু তার আলো কিছুক্ষণ জ্বলে রইল। ঋদ্ধ আরও কিছুক্ষণ বসে রইল। চায়ের শেষ চুমুকটা শেষ করল। বৃষ্টি তখনও পড়ছিল; নিরপেক্ষ, নির্বিকার। মানুষের সম্পর্কের হিসাব-নিকাশের বাইরে।
তারপর সে সাইকেলে উঠে অন্য পথে রওনা দিল।
যেতে যেতে মনে হলো-
কিছু সম্পর্ক ঠিক আধা-নামা গাড়ির কাঁচের মতো। না পুরোপুরি বন্ধ, না পুরোপুরি খোলা। শুধু সামান্য একটা ফাঁক থাকে, যেখান দিয়ে কিছু কথা এদিক-ওদিক যায়। কিন্তু উষ্ণতা কখনও পুরোটা পেরিয়ে আসতে পারে না।
#প্রতীকিগল্প #কাঁচ #ছোটগল্প #বাংলাগল্প #সম্পর্ক #নীরবতা #মানবিকসম্পর্ক #জীবনবোধ #বৃষ্টি #চায়েরআড্ডা #মনোজগৎ #সাহিত্য #বাংলাসাহিত্য #লেখালেখি #প্রতীক