04/07/2024
বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় মধু হল সুন্দরবনের মধু। জনপ্রিয় হবার কারন হল এই মধুর ঘ্রাণ ও স্বাদ একেবারেই অতুলনীয়। সুন্দবনের মধু এখন দেশের সীমান্ত পেরিয়ে রপ্তানি হচ্ছে বিদেশে। শুধু রপ্তানিই নয়, বিদেশে বেশ সুনামও অর্জন করেছে। আমাদের সুন্দরবন পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। সুন্দরবনে খলিশা, গরান, কেওড়া, বাইন প্রভৃতি গাছ রয়েছে। এই উদ্ভিদের ফুল থেকে আহরিত মধু অন্য যে কোন মধুর থেকে ভিন্ন স্বাদ এবং সুগন্ধযুক্ত। এই সুন্দরবনের মধু সবচেয়ে ভালো। তাই ধীরে ধীরে সুন্দরবনের মধু সারা বিশ্বে খ্যাতি পেয়েছে।
অনেকে মনে করেন, সুন্দরবনের মধু মানেই মিশ্র ফুলের মধু। আসলে, এটি সম্পূর্ণ সত্য নয়। সুন্দরবনে প্রধানত ৪টি ফুল থেকে মধু উৎপন্ন হয়। খলিশা, গরান, কেওড়া ও বাইন। এই গাছের ফুল থেকে মধু সংগ্রহ ফেব্রুয়ারি মাসে শুরু হয় এবং জুন মাসে শেষ হয়। এ সময় সুন্দরবনের মধু বেশির ভাগ সংগ্রহ করা হয়।
এছাড়া সারা বছর কিছু ফুল ফোটে এবং তা থেকে মধু সংগ্রহ করা হলেও তা খুবই কম। বাংলাদেশে প্রতি বছর উৎপাদিত মোট মধুর প্রায় ২০% সুন্দরবন থেকে সংগ্রহ করা হয়।
যেহেতু মধু বিভিন্ন ফুল থেকে সংগ্রহ করা হয়, তাই মধুর স্বাদ, গন্ধ এক নয়। এই বিষয়গুলো নিয়ে আমরা প্রায়ই আমাদের গ্রাহকদের সাথে সমস্যায় পড়ি। অনেকেই বিষয়টি বুঝতে চান না।
সুন্দরবনের মধু খাঁটি না ভেজাল তা বোঝার জন্য জানতে হবে এই মধুর বৈশিষ্ট্য কী? বৈশিষ্ট্যগুলো জানলেই বুঝবেন মধু খাঁটি না ভেজাল।
সুন্দরবনের প্রাকৃতিক কাঁচা মধুর ৬টি বৈশিষ্ট্য:
১. সাধারণত হালকা অ্যাম্বার রঙ এর হয়, তবে সময় এবং ফুলের উপর নির্ভর করে কিছুটা হালকা বা গাঢ় অ্যাম্বার রঙ এর হতে পারে।
২. খুব সুস্বাদু, হালকা টক ও হালকা মিষ্টি।
৩. কিছু মানুষের কাছে- সুন্দরবনের মধুর স্বাদ আখের রসের মতো লাগে।
৪. মধুর ঘনত্ব সবসময় পাতলা হবে মানে বি গ্রেড বা সি গ্রেড এর হয় এগুলো ভুল ধারণা (আমরা সুন্দরবনে কখনও ঘন মধু পাইনি)।
৫. সুন্দরবনের মধুর একটি বৈশিষ্ট্য হল এটি অল্প ঝাঁকানোর পর অনেক ফেনা হয়, মধু যত পাতলা হয় ফেনাও তত বেশি হয়।
৬. আমরা কখনো সুন্দরবনের র মধু জমতে দেখিনি। সেটা ফ্রিজের ভিতরে হোক বা বাইরে।
বাংলাদেশে সুন্দরবনের মধু কখন এবং কিভাবে সংগ্রহ করা হয়?
ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের মধু উৎপাদন মৌসুম সাধারণত মার্চের শেষ থেকে জুন পর্যন্ত। এ সময় সুন্দরবনে অনেক ধরনের ফুল ফুটতে দেখা যায়। প্রকৃতিতে অনেক ধরনের ফুল থাকলেও মৌমাছিরা চারটি প্রধান ফুল থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে মধু সংগ্রহ করে। আর সেগুলো হলো- খালিশা, গরান, কেওড়া ও বাইন। মৌমাছিরা এ সময় সুন্দরবন থেকে যে মধু সংগ্রহ করে তাকে আমরা সুন্দরবনের মধু বলি।
Raw Honey এবং Processing Honey কাকে বলে?
মৌমাছিরা মৌচাকে যে মধু তৈরি করে সংরক্ষণ করে তা হল কাঁচা মধু বা ‘র মধু’। সেটা গ্রামবাসীদের হাতে কাটা মধু হোক বা বাক্সের ভিতরে পোষা মৌমাছির উৎপাদিত মধু। এই দুই ধরনের মৌমাছি যদি ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে, তাহলে এই দুই ধরনের মধুই ভালো মধু, খাঁটি মধু। বাজারে বিক্রি হওয়া মধুর বেশির ভাগই প্রক্রিয়াজাত মধু। র মধু এবং প্রক্রিয়াজাত মধু, এই দুই ধরণের মধুর মধ্যে পার্থ্যক রয়েছে। মধু গরম করে প্রক্রিয়াকরণ করা হয়। এবং মধু গরম করলে মধু অনেক উপাদান নষ্ট হয়। তাই আমাদের অবশ্যই ভালো মধু বা র মধু কেনার জন্য চেষ্টা করতে হবে।
সুন্দরবনের প্রাকৃতিক মধুতে ফেনা হওয়ার কারণঃ
সুন্দরবনের প্রাকৃতিক মধু ঝাঁকালে সাদা ফেনা দেখা দেয় এবং পুরো মধু সাদা হয়ে যেতে পারে। এই সাদা ফেনা দেখে মধু ক্রেতাদের প্রায়ই সন্দেহ হয় মধু খাঁটি না ভেজাল। এই ফেনা দেখে আতঙ্কিত হওয়ার দরকার নেই, লিচু ফুলের মধু পাতলা হলে মধু ফেনা হয়ে যাবে।
তবে কেন ফেনা হয় তার ব্যাখ্যা আমি বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে দেওয়ার চেষ্টা করব, ইনশাআল্লাহ, আশাকরি লিচু ফুলের মধু খাঁটি না ভেজাল তা বুঝতে আপনাদের কাজে লাগবে।
সুন্দরবনের প্রাকৃতিক র মধুতে সক্রিয় এনজাইম, প্রোটিন এবং অ্যামিনো অ্যাসিড থাকে এবং মধু নিজেই একটি কার্বোহাইড্রেট জাতীয় পদার্থ। সুন্দরবনের মধুতে রয়েছে গ্লুকোজ এবং ফ্রুক্টোজ। আবার এই গ্লুকোজ ও ফ্রুক্টোজ কার্বন, অক্সিজেন ও হাইড্রোজেন মিলে তৈরি হয়। সুন্দরবনের মধুতে সর্বদা উচ্চ আর্দ্রতা থাকে, যেমন খুব কম ঘনত্ব বা পাতলা মধু। মধু পাতলা হওয়ার কারণে হালকাভাবে নাড়ালে রাসায়নিক বিক্রিয়া শুরু হয় এবং কার্বন ডাই অক্সাইড উৎপন্ন হয় এবং কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাস মধুর পাত্রে বুদবুদ হয়ে সাদা ফেনা তৈরি ফেনা করে।
তখন সামান্য তাপ উৎপন্ন হয়। মাঝে মাঝে দেখা যায় প্লাস্টিকের বোতলে মধু রাখলে বোতল ফুলে উঠে। এতে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। বোতলটি কিছুক্ষণ স্থির রাখলে ফেনা আবার চলে যাবে। ফলে মধুতে কোনো সমস্যা হবে না এবং তা আবারও খাওয়া যাবে।
সুন্দরবনের মধু পাতলা হবার কারনঃ
সুন্দরবনের ভেতরে ছোটবড় অনেক খাল থাকায় এবং সমূদ্র তীরবর্তী হওয়ায় এখানকার পরিবেশে আদ্রতার পরিমান অনেক বেশি হওয়ায় মধুর উপর সরাসরি প্রভাব পড়ে বিধায় সুন্দরবনের মধু অনেক পাতলা হয়।
পরিশেষে একটা কথা বলা দরকার, তা হল মধু পাতলা হোক আর ঘন হোক তাতে কোন সমস্যা নাই যদি মধুর গুনাগুন সব ঠিক থাকে।
পোস্টটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ আপনাকে।