16/06/2026
বাংলাদেশে আয়কর রিটার্নের নতুন নিয়ম: প্রান্তিক ভিত্তিক রিটার্ন জমাদান, কর ছাড় এবং জরিমানার সম্পূর্ণ গাইড
বাংলাদেশের জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) ব্যক্তিপর্যায়ের করদাতাদের জন্য আয়কর কাঠামোতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। কর ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, স্বয়ংক্রিয়, স্বচ্ছ এবং সময়োপযোগী করতে আগামী বাজেট ও আয়কর আইনে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
আপনি যদি বাংলাদেশে একজন টিআইএন (TIN) সার্টিফিকেট ধারী করদাতা হন, তবে নির্দিষ্ট একটি শেষ সময়ের (যেমন ৩০ নভেম্বর) মধ্যে রিটার্ন জমা দেওয়ার চিরাচরিত চাপ এখন আর থাকছে না। নতুন ব্যবস্থায় পুরো অর্থবছরকে চারটি প্রান্তিকে ভাগ করে রিটার্ন দাখিলের জন্য প্রণোদনা ও জরিমানার কাঠামো নির্ধারণ করা হচ্ছে। এই নতুন নিয়মটি সময়মতো রিটার্ন জমাদানকারীদের যেমন বড় আর্থিক ছাড়ের সুযোগ দিচ্ছে, তেমনি যারা দেরি করবেন তাদের জন্য কঠোর জরিমানা ও বিনিয়োগ রেয়াত বাতিলের বিধান এনেছে।
১. চার প্রান্তিকের রিটার্ন ব্যবস্থা এবং সময়সীমা
বর্তমানে ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের রিটার্ন দাখিলের নির্ধারিত সময় ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত থাকলেও প্রতিবছরই সময়সীমা কয়েক দফা বাড়ানো হয়। কিন্তু নতুন নিয়মে করদাতারা বছরের যেকোনো সময় আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ পাবেন। তবে আপনি বছরের কোন সময়ে রিটার্ন জমা দিচ্ছেন, তার ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হবে আপনার কর ছাড় বা জরিমানা।
প্রথম প্রান্তিক জুলাই – সেপ্টেম্বর ৫% বা সর্বোচ্চ ২৫,০০০ টাকা সরাসরি কর ছাড়। কোনো জরিমানা নেই এবং এটিই সর্বোচ্চ সঞ্চয়ের সেরা সময়।
দ্বিতীয় প্রান্তিক অক্টোবর – ডিসেম্বর সাধারণ রিটার্ন দাখিল। কোনো আগাম কর ছাড় মিলবে না。 কোনো আর্থিক জরিমানা নেই, তবে বিনিয়োগজনিত কর রেয়াতের সুবিধা বাতিল হবে।
তৃতীয় প্রান্তিক জানুয়ারি – মার্চ বিনিয়োগজনিত কর রেয়াতের সুবিধা পাবেন না পরিশোধযোগ্য করের ২% অথবা ৩,০০০ টাকা (যেটি বেশি) জরিমানা।
চতুর্থ প্রান্তিক এপ্রিল – জুন বিনিয়োগজনিত কর রেয়াতের সুবিধা পাবেন না পরিশোধযোগ্য করের ৫% অথবা ৫,০০০ টাকা (যেটি বেশি) জরিমানা।
সর্বোচ্চ কর ছাড়ের জন্য বিশেষ টিপস:
আপনার আয়কর রিটার্নটি প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর) জমা দেওয়া সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হবে। এর ফলে আপনার অনুমোদিত বিনিয়োগের ওপর কর রেয়াত যেমন সুরক্ষিত থাকবে, তেমনি আপনি মোট পরিশোধযোগ্য করের ওপর সরাসরি ৫% (সর্বোচ্চ ২৫,০০০ টাকা পর্যন্ত) ছাড় পাবেন। সেপ্টেম্বর পার হয়ে গেলে বিনিয়োগজনিত কর রেয়াত সম্পূর্ণ বাতিল হয়ে যাবে।
২. বিনিয়োগজনিত কর রেয়াতের সুবিধা হ্রাস
এতদিন মধ্যবিত্ত করদাতাদের করের বোঝা কমাতে সঞ্চয়পত্র, জীবনবিমা, ডিপিএস (DPS) সহ বিভিন্ন অনুমোদিত খাতে বিনিয়োগের বিপরীতে বড় অঙ্কের রেয়াত পাওয়ার সুযোগ ছিল। নতুন বাজেটে এই সুযোগটি সংকুচিত করা হয়েছে।
• আগের নিয়ম: বিদ্যমান আইনে মোট অনুমোদিত বিনিয়োগের ১৫ শতাংশ অথবা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের ওপর কর রেয়াতের সুযোগ ছিল।
• প্রস্তাবিত নিয়ম: নতুন প্রস্তাবে এই সীমা কমিয়ে অনুমোদিত বিনিয়োগের ১০ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এর ফলে করদাতাদের আগের বছরের তুলনায় সমপরিমাণ আয়ের ওপর বেশি পরিমাণে নেট ট্যাক্স বা কর পরিশোধ করতে হবে, কারণ কর বাঁচানোর বিনিয়োগের পরিধি অনেকটাই কমে গেছে।
৩. স্বর্ণ ও ডিজিটাল সম্পদ বিক্রির মুনাফায় ১৫% মূলধনি কর (গেইন ট্যাক্স)
প্রচলিত এবং অপ্রচলিত সম্পদ থেকে অর্জিত মুনাফাকে করের আওতায় আনতে সরকার একটি পদক্ষেপ নিয়েছে। বাজেট প্রস্তাবে স্বর্ণালংকার, মূল্যবান ধাতু এবং ডিজিটাল সম্পদ বিক্রির মাধ্যমে অর্জিত আয়কে মূলধনি সম্পদ হিসেবে গণ্য করে তার ওপর ১৫ শতাংশ মূলধনি কর বা গেইন ট্যাক্স আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।
সম্পদ ক্রয়ের সময়ের মূল্য ও বিক্রয়মূল্যের পার্থক্য থেকে অর্জিত নিট মুনাফার ওপর এই ১৫% কর প্রযোজ্য হবে। এই করের আওতায় থাকা সম্পদগুলো হলো:
• স্বর্ণালংকার, স্বর্ণের বার ও রৌপ্য
• মূল্যবান রত্ন ও ধাতব মুদ্রা
• ডিজিটাল মুদ্রা ও ক্রিপ্টো-টোকেন
• চিত্রকর্ম, এন্টিকস এবং ক্লাব সদস্যপদ হস্তান্তরের মাধ্যমে অর্জিত আয়
যদি কোনো করদাতা তার পূর্ববর্তী রিটার্নে প্রদর্শিত কোনো স্বর্ণ বা ডিজিটাল সম্পদ বিক্রি করে মুনাফা অর্জন করেন, তবে সেই অর্জিত মুনাফা কারেন্ট বছরের রিটার্নে দেখাতে হবে এবং তার ওপর ১৫% কর পরিশোধ করতে হবে।
৪. ৭টি সেবায় বিআইএন (BIN) বাধ্যতামূলককরণ
রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং ভ্যাটের (VAT) আওতা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ব্যবসা সনাক্তকরণ নম্বর বা বিআইএন (BIN) বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নিচের ৭টি বাণিজ্যিক সেবায় নিয়োজিত ব্যবসাগুলো এখন আর শুধু টিআইএন (TIN) দিয়ে চালানো যাবে না, তাদের বাধ্যতামূলকভাবে বিআইএন গ্রহণ ও প্রদর্শন করতে হবে:
1. ই-commerce প্ল্যাটফর্ম ও অনলাইন রিটেইল ব্যবসা
2. বুটিক শপ, ফ্যাশন হাউস ও টেইলারিং ব্র্যান্ড
3. মিষ্টির দোকান, বেকারি ও বিশেষায়িত কনফেকশনারি
4. ক্যাটারিং সার্ভিস ও ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি
5. বাণিজ্যিক প্রিন্টিং প্রেস ও প্রকাশনা সংস্থা
6. কমিউনিটি সেন্টার, কনভেনশন হল ও বাণিজ্যিক ভাড়া স্পেস
7. কোচিং সেন্টার, প্রাইভেট এডুকেশনাল কনসালটেন্সি এবং ট্রেনিং ইনস্টিটিউট
৫. ৬০ দিনের মধ্যে অতিরিক্ত কর ফেরত (ট্যাক্স রিফান্ড)
নতুন নিয়মে যেমন করদাতাদের দেরিতে রিটার্ন জমার জন্য জরিমানার কঠোর বিধান রাখা হয়েছে, তেমনি সৎ ও অগ্রিম করদাতাদের জন্য একটি বড় স্বস্তির খবরও রয়েছে। আগে এনবিআর থেকে কর ফেরতের টাকা বা রিফান্ড পেতে মাসের পর মাস ঘুরতে হতো এবং অনেক প্রশাসনিক জটিলতা পোহাতে হতো।
স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার নতুন নিয়মে, করদাতাদের সুবিধার্থে যদি কোনো উৎসে কর কর্তন (AIT) বা অগ্রিম করের কারণে অতিরিক্ত কর পরিশোধিত হয়ে থাকে, তবে তা ৬০ দিনের মধ্যে সরাসরি করদাতার ব্যাংক হিসাবে ফেরত (Refund) দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে। এই উদ্যোগের ফলে করদাতার স্বেচ্ছায় কর পরিপালন নিশ্চিত হবে এবং হয়রানি কমবে।
উপসংহার
এই ব্যাপক পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য হলো কর ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও স্বচ্ছ করা এবং করদাতাদের স্বেচ্ছায় কর পরিপালনে উদ্বুদ্ধ করা। ৬০ দিনের মধ্যে স্বয়ংক্রিয় রিফান্ড এবং প্রথম প্রান্তিকে রিটার্ন জমায় ২৫,০০০ টাকা পর্যন্ত কর ছাড়ের মাধ্যমে সরকার ইতিবাচক সাড়া আশা করছে।
পাশাপাশি, বিনিয়োগের সীমা হ্রাস, ডিজিটাল ও স্বর্ণের ওপর ১৫% গেইন ট্যাক্স এবং দেরিতে জমার ক্ষেত্রে মাল্টি-টায়ার জরিমানার মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি রোধের কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে। তাই আপনার আর্থিক ক্ষতি এড়াতে এবং সর্বোচ্চ কর ছাড়ের সুবিধা নিতে আপনার ক্যালেন্ডারে জুলাই-সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম প্রান্তিকটি চিহ্নিত করে রাখুন এবং সময়মতো সঠিক তথ্য দিয়ে আয়কর রিটার্ন জমা দিন।
Sakib's Corporate Consultancy
Office: 01729-953295
What's App: 01581-601214