26/10/2025
#গ্রেফতার কি এবং গ্রেফতার হলে করনীয় কি?
যা আমাদের দেশের একটা কমন প্রক্রিয়া।
♦গ্রেফতারঃ বাংলাদেশ প্রেক্ষিত।
বাংলাদেশের মানুষ পুলিশের যে কার্য্যক্রমের সাথে সব চাইতে বেশী পরিচিত সেটা হচ্ছে ‘গ্রেফতার’!আসুন একটু জেনে রাখি এই সম্পর্কীত করনীয় কিছু বিষয়।
আপনি কোন অপরাধ না করলে, বা অপরাধটি করেছেন এই মর্মে যুক্তিসঙ্গত অভিযোগ না পেলে বা বিশ্বাস না করলে পুলিশ আপনাকে সেই অপরাধের জন্য গ্রেফতার করতে পারেনা। তবে আমাদের জেনে রাখা ভাল এখানে ‘অপরাধ’ বলতে আইনের চোখে যা অপরাধ কেবল সেগুলি বোঝানো হচ্ছে, সামাজিক বা ধর্মীয় দৃষ্টিতে যা অপরাধ তা নয়। আইনের চোখে যা অপরাধ নয়, সেসব আপনি পুলিশের সামনে বসে করলেও পুলিশ অন্ততঃ সে কারনে আপনাকে গ্রেফতারে করতে পারবে না।
★তো পুলিশ চাইলেই কি যে কোন অপরাধের জন্য আপনাকে গ্রেফতার করতে পারে?
-না তা পারেনা, বাংলাদেশের সব আইন দুই ভাগে বিভক্ত, প্রথম ভাগে আছে এক ধরনের অপরাধ যা করলে বা করার অভিযোগে আপনাকে গ্রেফতার করার জন্য পুলিশের কোর্টের আদেশ লাগবে না, পুলিশ আপনাকে যেখানে পাবে সেখানেই পত্রপাঠ গ্রেফতার করতে পারবে (এই ধরনের অপরাধগুলিকে বলা হয় ‘আমলযোগ্য অপরাধ’, ইংলিশে ‘cognizable offence’), বাকী অপরাধগুলির জন্য আপনাকে গ্রেফতার করতে চাইলে পুলিশের ওয়ারেন্ট (কোর্টের আদেশ) লাগবে (এই ধরনের অপরাধ গুলিকে বলা হয় ‘অ-আমলযোগ্য অপরাধ’, ইংলিশে ‘non cognizable offence’’), আপনি যদি অ-আমলযোগ্য অপরাধে অভিযুক্ত হন, তাহলে যে পর্যন্ত কোর্ট ওয়ারেন্ট ইস্যু না করছে, লেজে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়াতে পারেন, ইচ্ছা হলে থানায় যেয়ে পুলিশের সাথে চা-কফিও খেয়ে আসতে পারেন, পুলিশ আর যাই করুক অন্তত সেই অপরাধের জন্য আপনাকে গ্রেফতার করতে পারবে না।
★এখন প্রশ্ন হলো কিভাবে জানবেন কোন অপরাধ আমলযোগ্য আর কোনটা তা নয়?
-চলুন চলে যাই মূল কথায়ঃ আপনারা কি জানেন যে গ্রেফতার করলে হাত-পা বাধতেই হবে এমন কোন আইন নেই? হাত-পা বাধার বা আইনের ভাষায় বলতে গেলে ‘দৈহিক ভাবে আটক’ করার কথা তখনই আসে যখন কাউকে গ্রেফতারের আদেশ দেয়ার পরও সে কথা বা কাজের মাধ্যমে গ্রেফতারের আদেশের প্রতি আত্মসমর্পন না করে বরং তাতে বাধা দেয়।
★তো গ্রেফতারের আদেশ পেলে আপনি কি বলে আত্মসমর্পন করবেন?
-সহজ কিছু, যা খুব সহজেই সবাই বুঝতে পারবে এমন কিছু বলুন, ‘ওকে শব্দটা ব্যবহার করতে পারেন’ কিংবা ‘আই সারেন্ডার’ ও বলতে পারেন।
★কি রকম কাজের মাধ্যমে আত্মসমর্পন করা বোঝায়?
-হাত উপরে তুলে সারেন্ডারের ভঙ্গি করতে পারেন, পুলিশ যদি ভ্যান নিয়ে গ্রেফতার করতে বের হয়, সেখানে উঠে বসতে পারেন।(যদিও আমরা এরকম অবস্থায় পালিয়ে বেড়াই বেশির ভাগ সময়ই)
🎯গ্রেফতার করার ক্ষমতার সাথে সাথে আইন পুলিশকে আরেক ভয়ংকর যে ক্ষমতা দিয়েছে, কেউ গ্রেফতার করতে বাধা দিলে বা গ্রেফতার এড়ানোর জন্য পালানোর চেষ্টা করলে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করার জন্য ‘যে কোন প্রকার পদক্ষেপ’ নিতে পারে।
জ্বী, আপনি যদি গ্রেফতার এড়ানোর জন্য পুলিশের সাথে ধস্তাধস্তি শুরু করেন বা দৌড়ে পালাতে চান, তাহলে বাংলাদেশের পুলিশ আইনসঙ্গত ভাবেই আপনাকে ইচ্ছামত পেটাতে পারে, এমনকি গুলিও করতে পারে, এটুকু শুনে এই ব্যাপারে পুলিশের ক্ষমতার দৌড় এখনো বুঝতে পারলেন না? তাহলে শুনুন, আপনার বিরুদ্ধে যদি মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন দন্ড হবে এমন কোন অপরাধের অভিযোগ থাকে, তাহলে আপনার ‘বিরোধের’ কারনে ‘গ্রেফতার কার্য্যকর’ করতে যেয়ে পুলিশ আপনাকে মেরে ফেললেও পুলিশের আইনগতভাবে কিছুই হবেনা।তাই একটু সাবধান!
★আচ্ছা আরেকটা কথা মনে করিয়ে রাখি, কাউকে গ্রেফতার করার জন্য পুলিশ আপনার গৃহে বা প্রতিষ্ঠানে ঢুকে তল্লাশী করতে চাইতে পারে, আপনি যদি তখন দরজা জানালা বন্ধ করে বসে থাকেন, তাহলে পুলিশ আইন সঙ্গত ভাবেই আপনার দরজা জানালা ভেঙ্গে প্রবেশ করার আইনগত ক্ষমতা রাখে।তাই যখনই তল্লাশি জন্য পুলিশ যাবেন তাদেরকে তা যথাযথ নিয়ম মেনে করতে দিন।বাকিটা আইনজীবী নিয়োগ দিয়ে আইনি প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন করুন।আর এই জন্য লোকমুখে শোনা আইনজীবী নিয়োগ দিলেও কিছুটা যাচাই বাছাই করে তারপর নিয়োগ দিন।
এরপর আসুন আরেকটু খুটিনাটি জানি- গ্রেফতার করার পর পুলিশ আপনাকে তল্লাশী করতে পারে, কিন্তু ধরলেই তল্লাশী করতে পারে বা তল্লাশী করতে হবে এমন কোন আইন নেই, পুলিশ যদি জামিনের বিধান নেই এমন কোন ওয়ারেন্টে কাউকে গ্রেফতার করে বা জামিনের বিধান আছে কিন্তু সে জামিনদার দিতে পারবে না এমন কাউকে গ্রেফতার করে, তাহলে পুলিশ চাইলে, আমি আবার বলছি ‘চাইলে’ তাকে তল্লাশী করতে পারে (মনে রাখা ভাল আমি গ্রেফতারের পর তল্লাশীর কথা বলছি, রাস্তায় সিএনজি থামিয়ে আপনাকে গ্রেফতার না করে তল্লাশীর কথা বলছি না)।
★কোন মেয়েকে তল্লাশী করতে হলে যে আরেক মেয়েকে দিয়ে কঠোর ভদ্রতার মধ্যে দিয়ে করতে হবে সেটা বলা হয়েছে, তবে পুরুষদের তল্লাশীর ক্ষেত্রে কোন প্রকার শালীনতা বজায় রাখার কথা বলা হয়নি।
🎯 পুলিশ এরেস্ট করলেই ঘাবড়ে যাবার কিছু নেই, এরেস্টের ২৪ ঘন্টার মধ্যে পুলিশ আপনাকে কোর্টে উপস্থিত করতে বাধ্য, অনেকে আছেন এরেস্ট করলে একেবারে ভেঙ্গে পড়েন, এত ভেঙ্গে পড়ার কিছু নেই, এরেস্ট হওয়া মানেই অপরাধ প্রমান হয়ে যাওয়া নয়।
আরেকটা কথা, প্রথম দিন যখন কোর্টে দাড়াবেন, আগে থেকে পরিচয় না থাকলে কারো রেফারেন্সে কোন উকিলকে জামিন চাওয়ার জন্য ওকালতনামা দিতে যাবেন না, একবার পাওয়ার দিয়ে দিলে অনেক উকিল আর সেই ক্লায়েন্ট ছাড়তে চায়না, ছাড়াতে গেলে সেই উকিলকে অনেক টাকা দিতে হয়, পুরাই ‘কমলি ছোড়তি নেহি’ অবস্থা! আপনার পরিবারের নিয়োজিত উকিলের জন্য অপেক্ষা করুন, আর কোর্টে হাজিরার একেবারে প্রথম দিন জামিন নাও হতে পারে এই মানসিক প্রস্তুতি রাখুন।
আদতে আমাদের দেশে সচরাচর যা হয়, গ্রেফতারের পর অনেক সময় কিছু অসাধু লোক বিভিন্ন প্রকার ভয়ভীতি দেখিয়ে অভিযুক্তের পরিবার হতে বিশাল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়, অথচ এতে এত ভয়-ভীতির কিছু নেই।কারন হাজতে না খাইয়ে রাখে না, কষ্ট হবে তবে না খেয়ে মারা যাবে না, অসাধু লোকদের টাকা না খাইয়ে পরবর্তী যথাযথ আইনগত ব্যবস্থার জন্য সেই টাকা সঞ্চয় করে রাখুন, উপকৃত হবেন।আর সঠিক ও বিশ্বস্ত আইনজীবীদের শরণাপন্ন হোন।
#আইনজীবী