16/06/2026
আলু রপ্তানি দিয়ে শুরু হতে পারে আপনার রপ্তানি ব্যবসা!
একটা দেশ আছে, আকারে আমাদের চেয়ে ছোট, আলু ফলায় আমাদের প্রায় অর্ধেক। অথচ সেই আলু বেচে তারা বছরে আয় করে ১.৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
দেশটার নাম নেদারল্যান্ডস। আর তাদের এই গল্পের ভেতরেই লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের জন্য বিশাল একটা ইঙ্গিত।
প্রথমে আমাদের শক্তির জায়গাটা বুঝুন। বাংলাদেশ আলু প্রোডাকশনে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর একটি। গত অর্থবছরে দেশে রেকর্ড উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১.২ কোটি টন আলু - যা আমাদের নিজেদের চাহিদার চেয়ে প্রায় ৪৪ লাখ টন বেশি।
ভাবুন একবার - চাহিদা মিটিয়েও হাতে থাকছে লাখ লাখ টন উদ্বৃত্ত।
বেশিরভাগ দেশ এই সমস্যাটা পেলে খুশিতে লাফাত, কারণ এটাই তো রপ্তানির কাঁচামাল, রেডি।
আর রপ্তানি যে হচ্ছে না, তা না। গত অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রায় ৬২ হাজার টন আলু রপ্তানি করেছে, মূল্য প্রায় ১.৪ কোটি ডলার - যা তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
এই আলু এখন যাচ্ছে নেপাল, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কা, দুবাই আর বাহরাইনে; রাশিয়ার বাজারেও ঢোকার চেষ্টা চলছে। শুরুটা দারুণ।
এবার আসল সম্ভাবনার ছবিটা দেখুন। এত বিশাল উৎপাদনের পরও আমরা মোট আলুর শূন্য দশমিক ছয় শতাংশেরও কম রপ্তানি করি। মানে রপ্তানির পুরো মাঠটাই এখনো প্রায় খালি, খেলা সবে শুরু। আর বিশ্ববাজারের আকারটা শুনলে বুঝবেন এই মাঠ কত বড় - শুধু ফ্রোজেন ও প্রসেসড আলুর (যেমন ফ্রাই) আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ২০২৪ সালে ছিল ১৩.৬ বিলিয়ন ডলার।
কাঁচা আলুর চেয়ে প্রসেসড আলুর বাজার কয়েকগুণ বড়। এখানেই অন্য দেশগুলোর কাছ থেকে শেখার আছে - আর তারা যা করেছে, তা আমরাও পারি।ফিরে আসি নেদারল্যান্ডসে। ২০২৪ সালে তাদের আলু রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ১.৪ বিলিয়ন ডলারে - বিশ্বের এক নম্বর। অথচ তারা এটা করেছে বেশি জমিতে চাষ করে না, বরং স্মার্ট উপায়ে চাষ করে; প্রতি হেক্টরে তাদের ফলন বিশ্ব গড়ের অনেক ওপরে, আর তাদের প্রসেসড আলু পৌঁছায় ১৫০টি দেশে। ছোট একটা দেশ, শুধু বুদ্ধি আর কোয়ালিটি দিয়ে আলুকে বানিয়েছে বিলিয়ন ডলারের শিল্প।
আর বেলজিয়ামের গল্পটা আরও অনুপ্রেরণার। তারা আজ বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফ্রোজেন আলু (ফ্রাই) রপ্তানিকারক - তাদের প্রসেসড আলুর পণ্য যায় ১৫০টিরও বেশি দেশে। অথচ এই গল্প তারা শুরু করেছিল সাধারণ আলুকে শুধু ফ্রাই, চিপস আর ফ্লেক্সে রূপান্তর করে। কাঁচা আলু না বেচে, তাতে ভ্যালু যোগ করে।
এখান থেকেই বাংলাদেশের রোডম্যাপ পরিষ্কার হয়ে যায়। কাঁচামাল আমাদের আছে, উদ্বৃত্ত আছে, বিশ্ববাজার বিশাল আর বাড়ছে - বিশেষ করে এশিয়া আর আফ্রিকায় আলুর চাহিদা ক্রমশ বাড়ছে। এখন দরকার দুটো স্মার্ট স্টেপ।
এক, রপ্তানির জন্য আলাদা জাত - কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ইতিমধ্যেই গ্রানোলা, সানতানা, কুমারির মতো রপ্তানি-উপযোগী জাত চাষের পরামর্শ দিচ্ছে।
দুই, প্রসেসিং - সেই একই আলু থেকে চিপস, ফ্লেক্স, ফ্রাই বানিয়ে নেদারল্যান্ডস-বেলজিয়ামের পথে হাঁটা।
আর এটা শুধু স্বপ্ন না, শুরুও হয়ে গেছে - শুধু বগুড়া জেলাই ২০২৫-২৬ মৌসুমে ১০ হাজার টন আলু রপ্তানির লক্ষ্য নিয়েছে। একটা জেলা যদি পারে, পুরো দেশ কী পারে - একবার ভাবুন।
আমাদের মাটিতে যে আলু ফলে, তা পৃথিবীর সেরা দেশগুলোর চেয়ে কম কিছু না। শুধু দরকার সেই আলুকে কাঁচা পণ্য থেকে ব্র্যান্ডেড পণ্যে বদলে দেওয়ার সাহস আর বুদ্ধি। সুযোগটা মাটির নিচেই পড়ে আছে - তোলার অপেক্ষায়।