24/09/2025
“সুখ হারাইলাম, রাতের ঘুম হারাইলাম, শুধু হারাইতে পারলাম না দুঃখ।”
এই একটা লাইনেই আমার পুরো জীবনের সংজ্ঞা লুকিয়ে আছে। সুখ ছিল, কিন্তু অজান্তেই হারিয়ে গেলো। রাতের ঘুম ছিল, কিন্তু তা-ও কেটে গেলো অশান্তির অন্ধকারে। অথচ দুঃখ—যাকে হারানোর জন্য প্রতিদিন যুদ্ধ করেছি, প্রতিদিন কান্নায় ভেসেছি—সে-ই একমাত্র জিনিস আমাকে কখনো ছাড়েনি। মনে হয়, সুখ ছিল অস্থায়ী অতিথি, ঘুম ছিল ক্ষণিকের আরাম, কিন্তু দুঃখ যেন আমার আত্মার ভেতরে গেঁথে থাকা এক অনন্ত ছায়া।
প্রতিদিন ভোর হয়, সূর্য ওঠে, পাখি ডাকে—কিন্তু আমার জীবনে কোনো নতুন সূচনা আসে না। আমার সকাল মানেই আগের দিনের কান্নার পুনরাবৃত্তি। রাত মানেই অন্ধকারের সঙ্গে অন্তহীন যুদ্ধ। আমি অনেক কিছু হারিয়েছি—প্রিয় মানুষ, বিশ্বাস, হাসি, স্বপ্ন—কিন্তু দুঃখটা এখনো বুকের ভেতর অটুট আছে। হয়তো এই দুঃখটাই আমার স্থায়ী সঙ্গী, আমার জীবনের একমাত্র অবিচল সত্য।
একসময় আমি ছিলাম ভীষণ হাসিখুশি মানুষ। ছোট্ট কোনো কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাসতাম। সহজ জিনিসগুলোতেই সুখ খুঁজে নিতাম। কিন্তু এখন হাসি যেন আমাকে ছেড়ে পালিয়েছে। আয়নায় তাকালে দেখি একটা ক্লান্ত, ভাঙাচোরা, চোখের নিচে কালি জমে থাকা মানুষ—যে মানুষটা আমি নিজেই।
কখনো কখনো মনে হয়, জীবনের সব আনন্দ, সব উচ্ছ্বাস, সব রঙ আমি কোথায় যেন ফেলে এসেছি। খুঁজতে গেলে পাই না। অথচ দুঃখ—সে আমাকে প্রতিদিন নতুনভাবে মনে করিয়ে দেয় যে আমি শূন্য হয়ে যাচ্ছি।
একটা সময় ছিলো, আমি কারও সঙ্গে স্বপ্ন বুনতাম। ভবিষ্যতের গল্প করতাম। আজকাল ভবিষ্যৎ শব্দটাই ভয় পাই। কারণ, আমি জানি সামনে সুখ নেই, শুধু অশ্রু জমে আছে
রাত হলো আমার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সময়। সারাদিন মানুষের ভিড়ে আমি যেভাবে হাসির অভিনয় করি, রাতে সেই মুখোশটা খুলে যায়। তখন আমি আর আমি। বিছানায় শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকি, চারপাশের নিস্তব্ধতা আমাকে শ্বাসরুদ্ধ করে তোলে। সবাই ঘুমায়, কিন্তু আমার চোখে ঘুম আসে না। শুধু কান্নার শব্দ বুকের ভেতরে চাপা পড়ে থাকে
কত রাত কেটে গেছে নিঃশব্দে কাঁদতে কাঁদতে। বালিশ ভিজে গেছে অশ্রুতে। অথচ কেউ জানে না, কেউ দেখে না। মানুষ ভাবে আমি শক্ত, আমি নির্লিপ্ত। কিন্তু সত্যিটা হলো—আমি ভেতরে ভেতরে প্রতিদিন মরে যাচ্ছি।
আমি বারবার ভেবেছি—সুখ চলে গেলো, ঘুম চলে গেলো, তাহলে দুঃখও তো চলে যাওয়ার কথা! কিন্তু আসলে দুঃখ ভিন্ন। এটা একবার হৃদয়ে জায়গা নিলে আর যায় না। দুঃখ মানুষের আত্মাকে আঁকড়ে ধরে রাখে। সুখ মানুষকে ভুলিয়ে দেয়, কিন্তু দুঃখ মানুষকে মনে করিয়ে দেয়—তুমি একা, তুমি ভাঙা, তুমি শূন্য।যতবার ভুলতে চেয়েছি, ততবার দুঃখ নতুন কোনো রূপে ফিরে এসেছে। কখনো কোনো পুরোনো গানের সুরে, কখনো কোনো ছবির দিকে তাকিয়ে, আবার কখনো একা হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ মনে পড়ে গেছে হারিয়ে যাওয়া মুহূর্ত। সুখকে আমি ধরে রাখতে পারিনি, কিন্তু দুঃখ আমাকে আঁকড়ে রেখেছে
সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয় স্মৃতি। মানুষ হারায়, সম্পর্ক ভাঙে, সময় চলে যায়—কিন্তু স্মৃতি থেকে যায় বুকের ভেতর কাঁটার মতো। চোখ বন্ধ করলেই ভেসে ওঠে সেই মুহূর্তগুলো, যেগুলো একসময় আমার পৃথিবী ছিলো। এখন সেগুলো শুধু আঘাত দেয়।মাঝে মাঝে মনে হয়, যদি কোনোভাবে স্মৃতিগুলো মুছে ফেলা যেতো! কিন্তু মুছে ফেলা যায় না। যতই ভুলতে চাই, ততই স্পষ্ট হয়ে ফিরে আসে। একসময় যে হাসি আমাকে বাঁচাতো, আজ সেই একই হাসির স্মৃতি আমাকে মেরে ফেলছে
মানুষ ভাবে আমি তাদের মাঝে আছি। কিন্তু আসলে আমি ভেতরে ভেতরে এক অন্ধকারে ডুবে আছি। চারপাশে শত মানুষ থাকলেও আমার মনে হয় আমি একা। তারা দেখে না আমার ব্যথা, শোনে না আমার কান্না। আমি শুধু অভিনয় করি, যেন সবকিছু ঠিক আছে। কিন্তু সত্যি হলো—কিছুই ঠিক নেই।
আমি প্রতিদিন হাসি দিয়ে ঢাকার চেষ্টা করি আমার ভেতরের কান্না। কিন্তু রাতের অন্ধকারে যখন আর অভিনয় করার প্রয়োজন থাকে না, তখন বুকের ভেতর জমে থাকা কান্না ঝরে পড়ে,হয়তো আমি চাইলে সুখকে আবার খুঁজে পেতে পারতাম। কিন্তু আমি জানি, যতবার সুখকে খুঁজেছি, ততবার তা আমার কাছ থেকে পালিয়েছে। তাই এখন দুঃখকে নিয়েই বেঁচে আছি। দুঃখ আমাকে ফাঁকি দেয় না। দুঃখ আমাকে একা ফেলে যায় না। সুখ যেমন অস্থায়ী, দুঃখ তেমন নয়। দুঃখই একমাত্র সত্য—এটাই আমি শিখেছি।একটা সময় ছিলো, আমি কারও ভালোবাসায় ভর করে বেঁচেছিলাম। মনে হতো, এই পৃথিবীটা সুন্দর। সেই মানুষটার জন্য আমি সবকিছু ত্যাগ করতে রাজি ছিলাম। কিন্তু আজ সে নেই। ভালোবাসা নেই। শুধু স্মৃতির যন্ত্রণা আছে।যে মানুষটা একসময় বলেছিলো—“তুমি আমার সব”—সে-ই একদিন আমাকে ছেড়ে চলে গেলো। আমি আজও দাঁড়িয়ে আছি একই জায়গায়, ভাঙা হৃদয় নিয়ে। কিন্তু সে আর ফিরলো না। সুখকে নিয়ে সে চলে গেলো, দুঃখটা শুধু আমাকে দিয়ে গেলো।আজ আমি বুঝেছি—সুখ হারানো যায়, ঘুম হারানো যায়, কিন্তু দুঃখকে হারানো যায় না। দুঃখই আমার একমাত্র অবিচল সঙ্গী। আমি যতদিন বেঁচে আছি, এই দুঃখ আমার সাথে বেঁচে থাকবে।