27/02/2026
পুরানো সেই রাজকুমারী সুন্দরবনের ছায়া
সুন্দরবনের গভীরতায় আমরা এসেছিলাম অ্যাডভেঞ্চারের খোঁজে। আমি, রাহুল, আর আমার চার বন্ধু – অর্জুন, প্রিয়া, সোহম আর মিতা। বাংলাদেশের এই বিশাল ম্যানগ্রোভ জঙ্গলটা সবসময়ই রহস্যময় লাগত আমার কাছে। রয়েল বেঙ্গল টাইগারের গর্জন, নদীর কাদামাখা তীর, আর ঘন অন্ধকার – সব মিলিয়ে একটা অদ্ভুত আকর্ষণ। আমরা লঞ্চে চড়ে ঢুকলাম জঙ্গলের ভেতরে, গাইডের সাথে। কিন্তু কে জানত, এই ভ্রমণটা আমার জীবনের সবচেয়ে রোমান্টিক এবং ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা হয়ে উঠবে?
প্রথম দিনটা ছিল দারুণ। আমরা নদী পেরিয়ে একটা ছোট দ্বীপে নামলাম। গাইড বলল, "এখানে একটা পুরনো রাজবাড়ী আছে, পরিত্যক্ত। রাজা প্রতাপ সিংহের প্রাসাদ, ব্রিটিশ আমলে তৈরি। এখন শুধু ধ্বংসস্তূপ।" আমরা হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছালাম সেখানে। বাড়িটা ছিল বিশাল – ভাঙা দেয়াল, লতাপাতায় ঢাকা পিলার, আর জানালায় ঝুলে থাকা পুরনো পর্দার ছেঁড়া টুকরো। সূর্যের আলো ফিল্টার হয়ে ঢুকছিল ভেতরে, যেন কোনো পুরনো ছবির ফ্রেম।
হঠাৎ আমার চোখ পড়ল একটা জানালায়। সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল একটা মেয়ে। অসম্ভব সুন্দরী – লম্বা কালো চুল, ফর্সা মুখ, আর চোখ দুটো যেন গভীর কুয়ো। সে পরে ছিল একটা পুরনো শাড়ি, লাল-সোনালি। আমি থমকে দাঁড়ালাম। "কে ও?" আমি ফিসফিস করে বললাম। বন্ধুরা দেখল না, তারা এগিয়ে গেল। কিন্তু আমি পারলাম না চোখ সরাতে। সে হাসল, যেন আমাকে ডাকছে। আমি না জেনেই এগিয়ে গেলাম।
দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম। জঙ্গলের ভেতরে ঢুকে পড়লাম, লতাপাতা ঠেলে। চারদিকে ঘন অন্ধকার, নদীর শব্দ, আর দূরে কোথাও একটা প্রাণীর গর্জন। কিন্তু আমি ভয় পেলাম না। কারণ সে ছিল সামনে। "আমার নাম লীলা," সে বলল, তার কণ্ঠস্বর মধুর, যেন বাতাসে মিশে যাচ্ছে। "আমি এই প্রাসাদের রাজকুমারী। বহু বছর ধরে অপেক্ষা করছি তোমার মতো কারোর জন্য।"
আমরা হাঁটতে লাগলাম জঙ্গলের গভীরে। সে আমার হাত ধরল, তার স্পর্শ ঠান্ডা কিন্তু আরামদায়ক। আমরা একটা ছোট নদীর তীরে বসলাম। চাঁদের আলো পড়ছিল জলে, চারদিকে ফায়ারফ্লাইয়ের ঝলকানি। সে বলল তার গল্প – কীভাবে তার বাবা রাজা প্রতাপ সিংহকে শত্রুরা মেরেছে, কীভাবে সে একা রয়ে গেছে এই প্রাসাদে। আমি তার চোখে চোখ রেখে বললাম, "আমি তোমাকে নিয়ে যাব এখান থেকে। আমরা একসাথে থাকব।" সে হাসল, আর আমাকে চুমু খেল। সেই চুমুতে ছিল অদ্ভুত মিষ্টতা, যেন সময় থেমে গেছে। আমরা নাচলাম জঙ্গলের মাঝে, তার চুল আমার মুখে লাগছিল, তার হাসি আমার হৃদয়ে। এটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে রোমান্টিক মুহূর্ত – ভালোবাসা, যেন কোনো স্বপ্ন। আমি তার আঙ্গুল থেকে একটা আংটি নিয়ে পরালাম নিজের আঙ্গুলে, প্রতিশ্রুতি হিসেবে। "এটা আমাদের বন্ধন," সে বলল।
কিন্তু হঠাৎ সবকিছু অন্ধকার হয়ে গেল। আমার মাথা ঘুরতে লাগল, চোখ বুজে এল। আমি পড়ে গেলাম মাটিতে।
যখন চোখ খুললাম, আমি ছিলাম হাসপাতালের বিছানায়। চারদিকে বন্ধুরা – অর্জুন চিন্তিত মুখে বলল, "দোস্ত, তুই জঙ্গলে হারিয়ে গিয়েছিলি। আমরা তোকে খুঁজে পেলাম অজ্ঞান অবস্থায়। কী হয়েছে?" আমি উঠে বসার চেষ্টা করলাম। "লীলা... সে কোথায়?" বন্ধুরা অবাক হয়ে তাকাল। "কোন লীলা? তুই একা ছিলি।"
আমি হাতটা দেখলাম। আমার আঙ্গুলে সেই আংটি – পুরনো সোনার, লাল পাথরের। কিন্তু কীভাবে? আমি চিৎকার করে উঠলাম। গাইড এসে বলল, "ওই রাজবাড়ীতে একটা কাহিনি আছে। রাজা প্রতাপের মেয়ে লীলা, বহু বছর আগে মারা গেছে। শোনা যায়, সে এখনো প্রাসাদে ঘুরে বেড়ায়, একা। যারা তাকে দেখে, তারা... ফিরে আসে না স্বাভাবিকভাবে।"
আমার শরীর কাঁপছে। সেই রাতে হাসপাতালে শুনলাম দূরে কোথাও টাইগারের গর্জন। কিন্তু সেটা গর্জন না, যেন লীলার হাসি। আংটিটা আমার আঙ্গুলে আটকে আছে, যেন কখনো খুলবে না। আমি জানি, সে ফিরে আসবে। এটা ভালোবাসা না, এটা অভিশাপ। সুন্দরবনের ছায়ায় লুকিয়ে আছে সেই রহস্য, যা আমাকে চিরকালের জন্য বেঁধে রেখেছে।