19/06/2026
নিরাপদ সড়ক কোনো বিলাসিতা নয়।
(ঢাকা-দাউদকান্দি মহাসড়ক ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে কিছু ভাবনা)।
মোঃ কামরুজ্জামান পলাশ
সিইও, সুইফট সলিউশন।
সড়ক নিরাপত্তা শুধুমাত্র একটি পরিবহন বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং সর্বোপরি জাতীয় উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রতি বছর যখন হাজার হাজার মানুষ সড়কে প্রাণ হারায়, তখন কোনো দেশই টেকসই উন্নয়নের দাবি করতে পারে না।
সম্প্রতি আমি ঢাকা থেকে দাউদকান্দি গিয়েছিলাম এবং একই দিনে আবার ঢাকায় ফিরে আসি। সড়ক নিরাপত্তা সচেতনতা ও চালক প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত থাকার কারণে যেকোনো যাত্রায় আমি রাস্তার অবস্থা, চালকদের আচরণ এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার চেষ্টা করি। এই সফর আমাকে একইসঙ্গে উদ্বিগ্ন ও হতাশ করেছে।
ঢাকা-দাউদকান্দি করিডোর দেশের অন্যতম ব্যস্ত সড়কপথ। দিন-রাত অসংখ্য যাত্রীবাহী বাস, ট্রাক, পণ্যবাহী যানবাহন এবং ব্যক্তিগত গাড়ি এই সড়ক ব্যবহার করে। কিন্তু মহাসড়কের অনেক অংশে রাস্তার পৃষ্ঠ ছিল অসমান, ক্ষতিগ্রস্ত এবং অপর্যাপ্তভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা। কোথাও কোথাও বড় বড় গর্ত ও ঢেউয়ের কারণে যানবাহনকে হঠাৎ গতি কমাতে হচ্ছিল। কিছু সময় এমন মনে হচ্ছিল, যেন গাড়িগুলো সড়কে নয়, ঢেউ খেলানো নদীর ওপর চলছে।
একটি মহাসড়কের প্রধান বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত স্থিতিশীলতা, পূর্বানুমানযোগ্যতা এবং নিরাপত্তা। কিন্তু যখন রাস্তার অবস্থা অনিশ্চিত হয়ে যায়, তখন সবচেয়ে দক্ষ চালকও ঝুঁকির মুখে পড়েন।
যাত্রাপথে আমি কয়েকজন পেশাদার চালকের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তাদের একজনের একটি মন্তব্য বাস্তব পরিস্থিতিকে খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরে:
"স্যার, আমি কি গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করব, নাকি রাস্তা নিয়ন্ত্রণ করব?"
এই একটি বাক্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমাদের সড়ক ব্যবস্থার গভীর সংকট।
আমরা সাধারণত সড়ক দুর্ঘটনার জন্য চালকের অসাবধানতা, অতিরিক্ত গতি কিংবা আইন অমান্য করার বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করি। কিন্তু দুর্ঘটনার পেছনে অবকাঠামোগত দুর্বলতার ভূমিকা নিয়ে তুলনামূলকভাবে কম আলোচনা হয়।
একজন দক্ষ চালক অনেক ঝুঁকি এড়াতে পারেন, কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা, অস্পষ্ট লেন মার্কিং, দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থা, হঠাৎ রাস্তার উচ্চতা পরিবর্তন এবং অপর্যাপ্ত সতর্কতামূলক চিহ্নের সঙ্গে লড়াই করা তার পক্ষেও কঠিন।
বিশ্বব্যাপী সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা একটি নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থার তিনটি মূল উপাদান চিহ্নিত করেছেন:
১. নিরাপদ সড়ক
২. নিরাপদ যানবাহন
৩. নিরাপদ সড়ক ব্যবহারকারী
গত এক দশকে বাংলাদেশ সড়ক নির্মাণে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু শুধু বিনিয়োগ করলেই হবে না। নির্মাণের মান, স্থায়িত্ব, রক্ষণাবেক্ষণ এবং জবাবদিহিতা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
এখানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—
• সড়ক নির্মাণ কি আন্তর্জাতিক প্রকৌশল মানদণ্ড অনুসরণ করে করা হচ্ছে?
• নির্মাণকাজের সময় কি যথাযথ মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা হচ্ছে?
• প্রকল্প সম্পন্ন হওয়ার আগে ও পরে কি সড়ক নিরাপত্তা নিরীক্ষা (Safety Audit) করা হচ্ছে?
• নির্ধারিত সময়ের আগেই রাস্তা নষ্ট হয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের কি জবাবদিহিতার আওতায় আনা হচ্ছে?
• রক্ষণাবেক্ষণ বাজেট কি কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে?
এই প্রশ্নগুলোর উদ্দেশ্য কাউকে দোষারোপ করা নয়; বরং নিরাপদ ও টেকসই পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় আলোচনা সৃষ্টি করা।
প্রতিটি সড়ক দুর্ঘটনার আর্থিক ও সামাজিক মূল্য অত্যন্ত বড়। একটি দুর্ঘটনায় একটি পরিবার তাদের উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারাতে পারে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ক্ষতির মুখে পড়ে। স্বাস্থ্যসেবার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। উৎপাদনশীলতা কমে যায় এবং জাতীয় উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, সড়ক দুর্ঘটনার অর্থনৈতিক ক্ষতি একটি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (GDP) উল্লেখযোগ্য অংশের সমান হতে পারে। তাই সড়ক নিরাপত্তায় বিনিয়োগ কোনো ব্যয় নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় বিনিয়োগ।
বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের জন্য সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে নতুনভাবে ভাবার সুযোগ তৈরি হয়েছে। দুর্ঘটনা ঘটার পর শাস্তি ও আইন প্রয়োগের ওপর নির্ভর না করে, দুর্ঘটনা প্রতিরোধের দিকে অধিক গুরুত্ব দিতে হবে।
এক্ষেত্রে কয়েকটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে—
• মহাসড়ক ও প্রধান সড়কগুলোর নিয়মিত স্বাধীন নিরাপত্তা নিরীক্ষা
• সড়ক নির্মাণের মান পর্যবেক্ষণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা
• ঠিকাদার ও তদারকি কর্তৃপক্ষের জবাবদিহিতা বৃদ্ধি
• ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক অংশ দ্রুত শনাক্ত ও মেরামত করা
• সড়ক পর্যবেক্ষণে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি
• চালক প্রশিক্ষণ ও জনসচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা
• পরিবহন, প্রকৌশল, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি করা
আমি পেশাদার চালকদের সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করেছি। আমার অভিজ্ঞতায় অধিকাংশ চালক দুর্ঘটনা ঘটাতে চান না। তারা নিরাপদ সড়ক, স্পষ্ট নিয়ম এবং দায়িত্বশীলভাবে কাজ করার উপযোগী পরিবেশ চান।
সড়ক নিরাপত্তা একটি যৌথ দায়িত্ব। সরকার, প্রকৌশলী, ঠিকাদার, পরিবহন মালিক, চালক, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, গণমাধ্যম এবং সাধারণ নাগরিক—সবারই এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
আজ আমাদের সামনে একটি সহজ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—
আর কত প্রাণ হারালে সড়ক নিরাপত্তা জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচিত হবে?
নিরাপদ সড়ক কোনো বিলাসিতা নয়। এটি একটি আধুনিক ও উন্নত রাষ্ট্রের মৌলিক প্রয়োজন।
বাংলাদেশ যদি তার উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জন করতে চায়, তবে সড়ক নিরাপত্তাকে আর অবহেলা করার সুযোগ নেই। এটিকে জাতীয় উন্নয়নের একটি অপরিহার্য ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
ঢাকা থেকে দাউদকান্দি যাত্রা আমাকে আবারও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে—উন্নয়নের পথ শুধু কত কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে তা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না; বরং সেই রাস্তায় মানুষ কতটা নিরাপদে চলাচল করতে পারছে, সেটিই প্রকৃত উন্নয়নের মানদণ্ড।
সড়ক নিরাপত্তায় একসাথে কাজ করি।
Working Together for Road Safety