14/08/2026
এইচএসসি পরীক্ষায় আমি ফেল করেছিলাম। বাংলাদেশের সংকটময় শিক্ষা ব্যবস্থার বহু কালো অধ্যায় আমি সাংবাদিকতা করতে যেয়ে দেখেছি। তবে আজকে একেবারে একজন সাধারণ শিক্ষার্থী হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতা বলি।
২০১১ সালে বায়োলজি পরীক্ষায় ফেল করার পর আমি রীতিমতো বাকশূণ্য হয়ে গেলাম। আমার মন খারাপ হয়নি, কান্না করিনি। কোনো অনুভুতিই কাজ করেনি। আসলে বুঝতেই পারছিলাম না হচ্ছেটা কি! আশেপাশে বন্ধুরা সবাই এ প্লাস। বায়োলজি আমার প্রিয় সাবজেক্ট। সবাই যখন বায়োলজি ফোর্থ সাবজেক্ট করে হায়ার ম্যাথ মেইন সাবজেক্ট করেছিলো আমি তখন ওদের পাত্তা না দিয়ে বায়োলজি মেইন সাবজেক্ট করেছিলাম। শুধু কি তাই?? রেজাল্টের তিন মাস আগে অনেক টাকা খরচ করে মেডিক্যাল ভর্তি কোচিংও করা শুরু করেছি। সারাজীবন আমি স্কুলে ভালো রেজাল্ট করে এসেছি। প্রথম সারির শিক্ষার্থী ছিলাম। একটা মানুষ ফেল কীভাবে করে সেটাই তো আমি জানি না। ওই সময় বাংলাদেশের মফস্বল শহরে উচ্চশিক্ষিত মধ্যবিত্ত একটা পরিবারের মেয়ে, যার পরিবারের সবাই ভালো ফল করা, সে কিনা ফেল করেছে!! এরপর খবর নিলাম, আমি যেই কক্ষে পরীক্ষা দিয়েছিলাম, ওই সারিতে বসা সব শিক্ষার্থী ফেল। কিছু শিক্ষার্থীর তো সব সাবজেক্টে এ প্লাস ছিলো শুধু একটা বিষয় ছাড়া। অনেক আলোচনা করে আমরা ধারণা করলাম হয়তো এটা শিক্ষা বোর্ডের ভুল। খাতা মিসিং বা প্রথম পত্র/দ্বিতীয় পত্র গণনায় কোনো ভুল হতে পারে। আমরা শিক্ষার্থীরা সবাই রাজশাহী বোর্ডে গেলাম। দালালের খপ্পরে পরলাম। বোর্ড চ্যালেঞ্জ করলাম। মামলা করলাম। নানাকিছুর মধ্য দিয়ে যেতে হলো। আশেপাশের মানুষের অপমান আর সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার কথা নাইবা বলি। সৎ মায়ের সংসারে বেড়ে ওঠা একটা মেয়ের সেই বয়সে এমন চাপ, অপমান আর অনিশ্চয়তা অনেকের পক্ষেই সহ্য করা কঠিন। আমার জায়গায় অন্য কেও হলে হয়তো আত্নহত্যা করতো। আমি যেহেতু অন্যের কথা পাত্তা না দেয়া মানুষ, তাই নিজের কাজ করতে থাকলাম। পরের বছর পরীক্ষার জন্য রেজিস্ট্রেশন করি নাই এই আশায় হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে। কিছুই ঠিক হয়নি। বাধ্য হয়ে দুই বছর নষ্ট করে ২০১৩ সালে শুধুমাত্র বায়োলজি পরীক্ষা দিয়ে পাশ করলাম। কিন্তু ততদিনে যা হওয়ার হয়ে গেছে। বন্ধুরা বুয়েট মেডিক্যাল বা পাবলিকে ভর্তি হয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। আমি তখন মাত্র রেডিও টুডেতে চাকরিতে ঢুকেছি। চাকরির পাশাপাশি ভর্তি হলাম একটা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে। নিজের টাকায় অনার্স মাস্টার্স শেষ করলাম। খুব একটা লাভ হয়নি। রেওডিও টুডেতে সাড়ে তিন বছর কাজ করে সময় টিভিতে জয়েন করি। সেখানেও প্রায় চার বছর কাজ করে ডিবিসি নিউজে জয়েন করি। এর বাইরেও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে ফ্রিল্যান্সিং কাজ করেছি। কোনো প্রতিষ্ঠানই আমার সার্টিফিকেট বা ডিগ্রি দেখতে চায়নি। দেশের বড় বড় প্রতিষ্ঠানে আমি মাইক্রোফোন হাতে দাপিয়ে বেড়াই, হট সিটে বসে দেশের সর্বচ্চ পর্যায়ে প্রশ্ন করি। অনেক আত্নবিশ্বাসের সাথেই করি। কেও আমাকে জিজ্ঞেস করে না আমার সিজিপিএ কত? ইন্টারের রেজাল্ট কি? বায়োলজিতে কত পেয়েছিলাম!! সবাই আমার দক্ষতা আর কাজকেই আমার যোগ্যতা হিসেবে দেখে। ফেল করার পর যারা আমাকে অপমান করতো, মিডিয়া কাজ করতাম বলে ‘ভালো মেয়েরা মিডিয়ায় যায়!” বলে গালি দিতো তারাই আমার কাছে তখন চাকরি খোঁজে। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে ভালো ভালো প্রতিষ্ঠানের সাথে কাজ শেষে আমেরিকার ইউনিভার্সিটিতে পরীক্ষা দিয়ে ভর্তি হলাম। ৯৫% মার্কস দিয়ে ডেটা সাইন্সে মাস্টার্স করলাম। আমেরিকায় এখন সরকারি চাকরি করি। প্রায় ভুলে গিয়েছি সেই দিনগুলো। কত কত বছর আগের কথা। তবু জীবনের যেকোনো অর্জনে হাতে নিয়ে আমি ধন্যবাদ দেই ১৭/১৮ বছরের কিশোরীকে যে ফেল করেও থেমে থাকেনি, মানুষ কি বললো সেটা কানে নেয়নি। যে মানুষের কথাকে নিজের ভবিষ্যৎ বানাতে দেয়নি। অনেকদিন ধরে ভাবছিলাম জীবনের এই অভিজ্ঞতা লিখবো। যারা অল্পতেই নিজের জীবন শেষ করতে চান, কোনো কিছুতে অকৃতকার্য হলে ভেঙে পড়েন তাদের জন্য এই লেখা। বিশ্বাস করুন, জীবনে "শেষ" বলে কিছু নেই।
একটি পরীক্ষার ফল আপনার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না। একটি ব্যর্থতা আপনার পরিচয় নয়। মানুষ শেষ পর্যন্ত আপনাকে আপনার কাজ দিয়ে মূল্যায়ন করবে।
তাই চেষ্টা করে যান। পড়ে গেলে আবার উঠুন। ব্যর্থ হলে আবার চেষ্টা করুন। আর সবচেয়ে বড় কথা, চারপাশের নয়েজকে আপনার জীবনের সিদ্ধান্ত নিতে দেবেন না।
-Collected