08/07/2026
সুপ্রিয় Niaz Ahmed-এর উদ্যোগ ও ব্যবস্থাপনায় গত মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত দুর্দান্ত কিছু মুহূর্ত ঢাকার বিখ্যাত কারওয়ান বাজারে। এখানে দিনের বেলায় বাজার-সদাই করার অভিজ্ঞতা থাকলেও এবারকার ঘোরাঘুরির প্রেক্ষাপট ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন- রাতের পাইকারি বাজারের সৌন্দর্য্য অবলোকন।
দল বেঁধে সারা রাত ঘোরাঘুরি করে যা কিছু বুঝতে পারলাম-
কারওয়ান বাজারের ৫২ গলিতে ৫৩ রকমের ব্যবসা চলে, মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে হাত বদল হয় ৩০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা পর্যন্ত। ক্রেতা-বিক্রেতাকে (নিলামের সময়) লেন-দেনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হয় কয়েক মুহূর্তের মধ্যে; দেরি করলেই সুবর্ণ সুযোগগুলো হাতছাড়া হয়ে যায়। তবে আপনি যত বড় কুতুব-ই হোন না কেন, প্রথম দিন কারওয়ান বাজারে গিয়ে খুব বেশি সুবিধা করতে পারবেন না; অন্তত এক সপ্তাহ ঘোরাঘুরি না করলে সকল অলিগলি চেনা যাবে না, জানতেও পারবেন না- কোনটা কোথায় কত কম দামে পাওয়া যায়?
বাজারকে ঘিরে যাতায়াতের প্রধান রাস্তার যত কাছাকাছি জায়গা থেকে পণ্য কিনবেন, তত কম দামে পাবেন (লোডিং-আনলোডিং খরচের তারতম্যের কারণে এমনটা ঘটে)। আবার একই পণ্যের দাম চেনা মুখ ও অচেনা মুখের জন্য দুই রকম! ওখানে জাত ক্রেতার বেশভূষা (চেহারা) ধারণ করতে চাইলে শার্ট-প্যান্ট ছেড়ে লুঙ্গি-পাঞ্জাবি-গামছা পরিধান করাটা সুবিধাজনক; মুখে দাড়ি থাকলে বাড়তি সুযোগ-সুবিধা মিললেও মিলতে পারে!
যে কোনো দেশীয় মৌসুমী ফলমূল ও শাক-সবজির মৌসুম ফুরিয়ে যাওয়ার পরে যদি খোঁজার চেষ্টা করেন, সেটা কেবল কারওয়ান বাজারেই পেলেও পাওয়া যেতে পারে। এই বাজারে না পাওয়ার অর্থ ইতোমধ্যে ওই মৌসুমী ফল বা সবজি market out!
কারওয়ান বাজারের বিভিন্ন কোনায় অপেক্ষাকৃত ভালো শাক-সবজিগুলো বাছাই হয়ে সরাসরি এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে রওনা (বিদেশে রপ্তানি) হয়ে যায়। অন্যদিকে কয়েকবার হাত-বদল হয়ে স্থানীয় বাজারে ঢোকে ভালো-মন্দের/বড়-ছোট মিশেল পণ্যগুলো। একইভাবে মাছের বাজারে অল্প কিছু নদীর মাছের সঙ্গে পুকুরে চাষের মাছ মিলেমিশে একাকার! নদীতে ধরা সুস্বাদু ইলিশের সঙ্গে একই ডালায় (ঝুড়িতে) মিশে একই দরে বিক্রি হচ্ছে সাগরের গতানুগতিক ইলিশ। কারওয়ান বাজারে না গেলে জানতেই পারতাম না- নদীর ইলিশের চোখ কালো আর সাগরের ইলিশের চোখ লালচে ধরনের হয়।
সবচেয়ে আশঙ্কার কথা- নদী-নালা, খাল-বিলে ভরপুর কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় মাছের বাজারে আধিপত্য বিরাজ করছে ভারত ও মায়ানমার থেকে আমদানিকৃত মাছ (যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেগুলো বিক্রি হয় দেশি মাছের পরিচয়েই)। মজার ব্যাপার হলো- কারওয়ান বাজারে কখনো কখনো কৃষকের (উৎপাদকের) ক্ষেত থেকেও কম দামে পণ্য পাওয়া যায়! এটা তখনি ঘটে- বিক্রেতা যখন কাঙ্খিত ক্রেতা না পেয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাঁর ক্রয়কৃত পণ্য বিক্রি করতে ব্যর্থ হন।
কারওয়ান বাজারের ফুটপাত মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য ভাড়া পাওয়া যায় (প্রতি ২৪ ঘণ্টায় এক জায়গায় অন্তত চার থেকে ছয়বার ভাড়াটিয়া বদল হয়)। পাইকারি বিক্রেতার লক্ষ্য থাকে তাঁর জন্য নির্ধারিত সময়ের প্রথম এক ঘণ্টার মধ্যেই বিনিয়োগকৃত অর্থ উঠিয়ে ফেলা। তারপর বাকি সময়টুকু অপেক্ষাকৃত কম মূল্যে পণ্য ছেড়ে দিয়ে গড় লাভ সুনিশ্চিত করা। তাঁদেরকে সব সময় স্মরণে রাখতে হয়- কাঁচা পণ্য কারো হাতে সোনা, কারো হাতে ছাই! এই সুযোগটাই গ্রহণ করেন কতিপয় ঝানু ক্রেতা। তবে সেজন্য তীর্থের কাকের মতো প্রত্যেক মুহূর্তে চোখ কান খোলা রাখতে হয়।
কারওয়ান বাজার থেকে প্রতিদিন ৫০০ ডিম কিনে সিদ্ধ করে দ্বিগুণ দামে খুচরা বিক্রি করা সম্ভব। এমনকি পাইকারি বাজার থেকে প্রতিদিন ৬,৬৬৬/- টাকার সবজি কিনে খুচরা বিক্রি করতে পারলে সেটা ছয় অঙ্কের বেতনের চাইতেও লাভজনক। এজন্যই বলা হয়- চাকরি করলে সরকারি, ব্যবসা করলে তরকারি!
ছবি ও লেখা সংগৃহীত