02/06/2026
আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ার অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল ‘শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব’ প্রকল্পটিকে। দেশের নতুন প্রজন্মকে তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ করার মহৎ উদ্দেশ্যের কথা বলা হলেও, পর্দার আড়ালে এই প্রকল্প পরিণত হয়েছিল তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের অর্থ লোপাটের এক বিশাল চারণভূমিতে। ৯৩৮ কোটি টাকার এই মেঘা-প্রকল্পে যেভাবে অনিয়ম ও দুর্নীতির উৎসব চলেছে, তা দেশের আইসিটি খাতের ইতিহাসে অন্যতম বড় একটি কেলেঙ্কারি।
নিচে সরকারি অডিট, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন ও জাতীয় গণমাধ্যমের অনুসন্ধানের ভিত্তিতে এই মহাদুর্নীতির বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরা হলো:
🟥 ডিজিটাল স্বপ্নের আড়ালে ৯৩৮ কোটির মহালুটপাট :
২০২১-২২ অর্থবছর থেকে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপে সারা দেশের হাজার হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আইসিটি ল্যাব স্থাপনের জন্য প্রায় ৯৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু সরকারি নিরীক্ষা বিভাগ (অডিট অধিদপ্তর) এবং আইসিটি বিভাগের বিশেষ তদন্ত কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এই বিশাল বাজেটের সিংহভাগ টাকাই সরাসরি অনিয়ম, আত্মসাৎ ও হরিলুটের খপ্পরে পড়েছে।
🟥 ৭০৮ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম ও 'পলক সিন্ডিকেট' :
সরকারি অডিট প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ৯৩৮ কোটি টাকার এই প্রকল্পে প্রায় ৬০০ থেকে ৭০৮ কোটি টাকার ভয়াবহ আর্থিক অনিয়ম ও জালিয়াতি খুঁজে পেয়েছে নিরীক্ষা বিভাগ। এই দুর্নীতির মূল কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন সাবেক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক এবং প্রকল্পের দুই প্রভাবশালী পরিচালক (PD)। অভিযোগ রয়েছে, পিপিআর (PPR) আইন লঙ্ঘন করে বিশেষ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে এবং বড় অঙ্কের পার্সেন্টেজ বা কমিশন সরাসরি তৎকালীন প্রতিমন্ত্রীর জিম্মায় নেওয়ার জন্য শুরুতেই টেন্ডার প্রক্রিয়া ম্যানিপুলেট বা জালিয়াতি করা হয়েছিল।
🟥 বাজারমূল্যের চেয়ে কয়েক গুণ বেশিতে নিম্নমানের সরঞ্জাম ক্রয় :
দরপত্রের মূল শর্ত ভেঙে অত্যন্ত চড়া দামে বাজার থেকে স্ক্র্যাপ বা নিম্নমানের ল্যাপটপ, রাউটার, এলইডি টিভি এবং এলসিডি মনিটর সংগ্রহ করা হয়। মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে (যেমন মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া এবং অন্যান্য জেলাগুলোতে) দেখা গেছে, প্রতিটি ল্যাবে ১৭-১৮টি করে ল্যাপটপ দেওয়া হলেও ল্যাব উদ্বোধনের পর থেকেই অর্ধেকের বেশি ল্যাপটপ ছিল সম্পূর্ণ অচল ও ত্রুটিযুক্ত। ব্র্যান্ডের নাম ব্যবহার করে ভেতরে অত্যন্ত সস্তা ও জোড়াতালির পার্টস ঢুকিয়ে সরকারি কোষাগার থেকে কোটি কোটি টাকা তুলে নেওয়া হয়েছিল।
🟥 কার্টনে বন্দি ‘ডিজিটাল ল্যাব’, ধুলো জমছে কোটি টাকার সম্পদে, বাস্তবে দেশের শত শত স্কুলে এই ল্যাবগুলো উদ্বোধনের পর থেকেই তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এর প্রধান কারণগুলো হলো:
🚩 পর্যাপ্ত আইসিটি শিক্ষকের অভাব: কোনো কোনো স্কুলে কম্পিউটার চালু করার মতো দক্ষ শিক্ষকও নেই।
🚩 বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগের অভাব: প্রত্যন্ত অঞ্চলের বহু স্কুলে ল্যাব তৈরি করা হলেও সেখানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ বা ইন্টারনেট অবকাঠামো নিশ্চিত করা হয়নি।
🚩 তদারকির অভাব: সরঞ্জাম হস্তান্তরের পর কোনো ধরনের রক্ষণাবেক্ষণ বা সার্ভিসিং করা হয়নি।
এর ফলে কোটি কোটি টাকা মূল্যের সরকারি ল্যাপটপ, চার্জার ও রাউটার কার্টনে বন্দি অবস্থায় ধূলিসাৎ ও নষ্ট হচ্ছে। বহু প্রধান শিক্ষক জানিয়েছেন, ল্যাপটপগুলো সচল রাখার কোনো উপায় না থাকায় এবং বেশির ভাগ নষ্ট বের হওয়ায় তারা বাধ্য হয়ে আইসিটি কক্ষে তালা ঝুলিয়ে রেখেছেন।
🟥 ভুয়া ভাউচারে প্রশিক্ষণের টাকা আত্মসাৎ:
প্রকল্পের বড় একটি খাত ছিল শিক্ষকদের আইসিটি প্রশিক্ষণ এবং সচেতনতামূলক সেমিনার। তদন্তে জানা গেছে, মাঠপর্যায়ে কোনো বাস্তব বা মানসম্মত প্রশিক্ষণ প্রদান না করেই কেবল কাগজ-কলমে ভুয়া বিল তৈরি করা হয়েছে। কর্মকর্তাদের আত্মীয়-স্বজন ও দলীয় কর্মীদের নামে প্রশিক্ষণ গ্রহণের ভুয়া তালিকা ও ভাউচার বানিয়ে কোটি কোটি টাকা ব্যাংক থেকে উত্তোলন করে ভাগবাটোয়ারা করে নেওয়া হয়েছে।
゚viralシ