28/05/2026
# ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর ঈদুল আজহা: আত্মশুদ্ধি ও খোদাভীতির এক অনন্য উৎসব
**আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।**
**তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম।**
সম্মানিত সুধী,
ত্যাগের মহিমায় মহিমান্বিত ও আত্মশুদ্ধির বার্তা নিয়ে আমাদের মাঝে উদযাপিত হচ্ছে পবিত্র ঈদুল আজহা। মুসলিম মিল্লাতের পিতা হযরত ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) এবং তাঁর পরিবার আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে যে অতুলনীয় ত্যাগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, তারই ধারাবাহিকতায় আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত মুসলিম উম্মাহর জন্য এই দিনটিকে উপহারস্বরূপ নির্ধারণ করেছেন।
আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টির নিমিত্তে পশু কোরবানি করছি। এটি আল্লাহর কত বড় দয়া ও অপার মহিমা যে, কোরবানিটি হচ্ছে একমাত্র তাঁরই নামে, অথচ সেই পশুর গোশত খাওয়া এবং তা অভাবী ও আত্মীয়দের মাঝে বণ্টন করাকে আল্লাহ আমাদের জন্য হালাল ও বরকতময় করেছেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ইরশাদ করেছেন:
> **فَكُلُوا مِنْهَا وَأَطْعِمُوا الْبَائِسَ الْفَقِيرَ**
> "অতঃপর তোমরা তা থেকে আহার করো এবং দুস্থ-দরিদ্রদের আহার করাও।" *(সূরা হাজ্জ, আয়াত: ২৮)*
>
# # # এক মধুর পরীক্ষা ও অলৌকিক ইতিহাস
আজ থেকে হাজার বছর আগে এক কঠিন অথচ মধুর পরীক্ষা নেওয়া হয়েছিল মুসলিম মিল্লাতের পিতা হযরত ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) এর। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর প্রিয় খলিলকে স্বপ্নযোগে নির্দেশ দিলেন, *"হে ইব্রাহিম! তোমার সবচেয়ে প্রিয় বস্তুটিকে আমার নামে কোরবানি করো।"*
আল্লাহর ইচ্ছায় ও আদেশে তিনি যখন তাঁর কলিজার টুকরো সন্তান হযরত ইসমাইল (আলাইহিস সালাম)-কে কোরবানি দিতে উদ্যত হলেন, তখন সমগ্র বিশ্বভূমণ্ডল, ফেরেশতাকুল এবং সমস্ত কুল-কায়িনাত অবাক বিস্ময়ে এই চরম আত্মসমর্পণ অবলোকন করছিল। যখনই ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) তাঁর স্নেহের পুত্রের গলায় ছুরি চালাতে গেলেন, তখন আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জতের কুদরতে জান্নাত থেকে একটি দুম্বা এসে ইসমাইল (আলাইহিস সালাম) এর স্থলাভিষিক্ত হলো। হযরত ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) আল্লাহর পরীক্ষায় পূর্ণরূপে উত্তীর্ণ হলেন।
পবিত্র কোরআনে এই ঐতিহাসিক ঘটনাকে তুলে ধরে আল্লাহ বলেন:
> **فَلَمَّا أَسْلَمَا وَتَلَّهُ لِلْجَبِينِ وَনَادَيْنَاهُ أَن يَا إِبْرَاهِيمُ قَدْ صَدَّقْتَ الرُّؤْইَا ۚ إِنَّا كَذَٰلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ**
> "যখন তারা উভয়েই আনুগত্য প্রকাশ করল এবং ইব্রাহিম তাঁর পুত্রকে উপুড় করে শুইয়ে দিল (জবেহ করার জন্য), তখন আমরা তাকে ডেকে বললাম, হে ইব্রাহিম! তুমি তো স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখালে। নিশ্চয়ই আমরা সৎকর্মশীলদের এভাবেই পুরস্কৃত করে থাকি।" *(সূরা ছাফফাত, আয়াত: ১০৩-১০৫)*
>
# # # কোরবানির প্রকৃত উদ্দেশ্য: লোকদেখানো নয়, তাকওয়া
আজকে আমরা যে পশু কোরবানি করছি, তার আসল সার্থকতা তখনই আসবে যখন আমাদের নিয়ত হবে সম্পূর্ণ খাঁটি ও নিষ্কলুষ। কোরবানি কোনো সামাজিক লৌকিকতা বা প্রতিযোগিতা নয়। আল্লাহর দরবারে পশুর রক্ত বা গোশত পৌঁছায় না, পৌঁছায় কেবল আমাদের অন্তরের অন্তস্তলের 'তাকওয়া' বা খোদাভীতি। মহান আল্লাহ স্পষ্ট করে দিয়েছেন:
> **لَن يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَٰكِن يَنَالُهُ التَّقْوَىٰ مِنكُمْ**
> "আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না এগুলোর গোশত এবং রক্ত, বরং তাঁর কাছে পৌঁছায় তোমাদের ভেতরের তাকওয়া (পরহেজগারি)।" *(সূরা হাজ্জ, আয়াত: ৩৭)*
>
যদি আমাদের কোরবানি একমাত্র আল্লাহকে রাজি-খুশি করার জন্য এবং সঠিক পদ্ধতিতে হয়, তবে এর প্রতিদান অপরিসীম। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কোরবানির পশুর প্রতিটি পশমের বিনিময়ে সওয়াবের সুসংবাদ দিয়েছেন। হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে:
> সাহাবিগণ রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! এই কোরবানিগুলো কী? তিনি বললেন, "তোমাদের পিতা ইব্রাহিম (আ.)-এর সুন্নত।" তারা পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, এতে আমাদের কী সওয়াব রয়েছে? রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, **"পশুর প্রতিটি পশমের বিনিময়ে একটি করে নেকি রয়েছে।"** *(সুনানে ইবনে মাজাহ)*
>
# # # আমাদের করণীয় ও আজকের আহ্বান
আসুন, এই পবিত্র দিনে আমরা আমাদের মনের সব অহংকার, হিংসা, বিদ্বেষ ও লোকদেখানো মানসিকতা কোরবানি করি। আমাদের নিয়তকে করি সহিহ ও একমাত্র আল্লাহর জন্য নিবেদিত। আমরা যেন শুধু পশু জবেহ না করি, বরং আমাদের ভেতরের পশুবৃত্তিকে জবেহ করে প্রকৃত 'ইখলাস' বা নিষ্ঠার অধিকারী হতে পারি।
মহান আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জতের দরবারে বিনীত প্রার্থনা, তিনি যেন আমাদের প্রত্যেকের এই ত্যাগ, কোরবানি এবং ইবাদতকে কবুল ও মঞ্জুর করে নেন। আমাদের জীবনকে তাঁরই সন্তুষ্টির রঙে রাঙিয়ে দিন।
আপনাদের সবাইকে আবারও পবিত্র ঈদুল আজহার আন্তরিক শুভেচ্ছা।
**ঈদ মোবারক!**