20/02/2026
অধ্যায়ের_সূচনা
পর্বঃ৪৩
সুন্দর একটি নতুন সকালের শুরু!প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য দেখলে মনে হয় ,এই জীবন টাই স্বার্থক!পাখির কিচিরমিচির শব্দে তুশির ঘুম পাতলা হয়ে এলো।চোখমুখ কুচকে পিটপিটিয়ে তাকাতে চাইলো।এবারেও চোখ টা মনের সাথে বেইমানী করে বসলো! দেখে বুঝায় যাচ্ছে,বড় জোর ঘুমিয়েছে ঘন্টা দুয়েক!বহু কষ্টে তুশি চোখের পাতা খুলে চারদিকে তাকিয়ে বুঝার চেষ্টা করলো ,সে আসলে আছে টা কোথায়? মাথায় একটু চাপ দেওয়ার ফলে কালকে রাতের কীর্তিকালাপ খুব সুন্দর করে চোখের সামনে এলইডি স্ক্রিন আকারে জ্বলজ্বল করে উঠলো! চোখ বড় বড় করে সিলিং এর দিকে তাকালো। হুট করে উঠতে চাইলে বুঝতে পারলো সে কারো বাহুবন্ধনে আবদ্ধ! পাশে তাকিয়ে দেখলো মাহিদ তাকে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখে আরামে ঘুমোচ্ছে।মাহিদের মুখের দিকে তাকিয়ে তুশির নিজেকে শীতল মনে হল! ঘোরের মধ্যেই এক হাত মাহিদের গালে রেখে আবেশে তাকিয়ে রইলো।
কি নিস্পাপ!! কেউ বলবেই না কাল রাতে এত পাগলামি করা লোকটা মাহিদ।এখন দেখে তো মনে হয় নিস্পাপ একটা বাচ্চা! ঘোরের মধ্যেই নিজের ঠোঁট দুখানা মাহিদের কপালে ঠেকালো।আস্তে আস্তে দুগালে বেশ সময় নিয়ে চুমু খেল!সকালের এই মিষ্টি অনুভূতি থেকে মাহিদ বাদ থাকলো না।নড়েচড়ে উঠতেই তুশি ছিটকে দূরে চলে গেল।আস্তে করে নামার চেষ্টা করতেই বুঝলো গায়ে একটা সুতাও নেই!কাঁদো কাঁদো চেহারা নিয়ে সে মাহিদের দিকে তাকালো!
মাহিদ চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে দুষ্টু হাসি দিয়ে দুই ভ্রু সমান তালে নাচালো-অথাৎ কি ব্যপার? হাওয়া শেষ? "
তুশি চোখ মুখ খিচে ফেললো। এই বধ লোক এতক্ষণ জেগেই ছিল!ইচ্ছে করেই ঘুমের ভান ধরে ছিল!মাহিদ আচমকাই তুশিকে নিজের দিকে টান দিল।তুশি টাল সামলাতে না পেরে হুমড়ি খেয়ে পড়লো মাহিদের বুকে!মাহিদ এক হাতে কোমড় সমেত জড়িয়ে আরেক হাতে গাঢ়ে হাত দিয়ে মুখ বরাবর টেনে আনলো-
_"কপাল,গাল তো হল!ঠোঁটের টা এখনো বাকি আছে! ফাস্ট ফাস্ট দাও! বিয়ে বাড়িতে অনেক কাজ ,যেতে হবে তো!!"
একে তো টাল হারিয়ে সে সোজা মাহিদের উপরে।দুজনের গায়ে সুতো অবধি নেই।শরীরের অঙ্গপ্রতঙ্গ গুলো একে অপরের সাথে মিলেমিশে আছে।তার উপরে এমন বেলাজ কথাবার্তা! সে ক্ষনে ক্ষনে শুধু ঢোক গিলছে!
বউয়ের এমন নাজেহাল অবস্থা দেখে বেচারা মাহিদের অবস্থা আরো খারাপ-
_"বউ! এমন করে ঢোক গিললে এক্ষুনি না আমার আবার মোড এসে যায়!তাহলে আজকে আর ভাইয়ের বিয়ে এটেন্ড করা লাগবে না!!"
_"অসভ্য লোক!ছাড়ুন আমায়!লাজলজ্জা সব বেঁচে দিয়েছে!!"
তুশির অস্থিরতা মাহিদ ভালোই বুঝতে পারছে।ঘড়িতে বেলা গড়িয়েছে ভালোই। ৮ টা বেজে গেছে সত্যিই উঠতে হবে।তাই আর বউকে না জ্বালিয়ে চাদর সমেত তুশিকে পেছিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়লো। তুশি চেচিয়েও থামাতে পারে নি!!"
__🌸
আজকে অন্যান্য দিনের তুলনায় শাফিন ব্যস্ত সময় পার করছে।যদিও এইসব কাজ সব সময় মাহিদ দেখাশোনা করে তবুও যেহেতু কাল ভাইকে নিজে একটু স্পেচ দিয়েছে তাই সকাল বেলা তাকে আর না গাটিয়ে সব কিছু নিজে দেখাশোনা করছে।এই দিকে বাড়ির অকর্মার ঢেকির কাজে হাত দেওয়ার ব্যাপারটা সকলেই কেমন বাঁকা চোখে দেখে চলেছে!জোবেদা বেগম কোথা থেকে এসে শাফিনের পাশে দাড়ালো।শাফিন তখন দত্তের জিনিস পত্র বের করে গাড়িতে রাখছিল-
_"শাফিন! বাবা দেখতো আজকে কি সূর্য উঠেছে?
মায়ের এমন আজগুবি কথার ধাত শাফিন ঠিকি বুঝতে পেরেছে।তাই দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠল-
_"মা!! উঠে যাবে সূর্য! "
জুবেদা বেগম আড়চোখে ছেলেকে দেখে ঠোঁটে ঠোঁট টিপে হাসলেন -
_"না! আসলে আসেপাশের পরিস্থিতি খুব একটা ভালো না বুঝলি! কখন আবার তুফান ধেয়ে আসে বলা যায় না!!"
শাফিন আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না।হনহন করে বাহিরে চলে গেল।এই দিকে জুবেদা বেগম অট্টহাসিতে ফেঁটে পড়লেন।পিছন থেকে মহিমা বেগম পাশে এসে দাঁড়ালেন-
_"আর কাজ নেই না তোমার? ছেলেটা কে জ্ব্বালাচ্ছ কেন?"
_"আরে আজ একটু সুযোগ পেয়েছি! এমন কর্মীক ছেলেকে তো পাওয়া যায় না!!"
দুই জা একে অপরের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললো। তারপর তাড়া দিয়ে ভিতরের দিকে গেল।এখনো কত কাজ বাকি!
__🌸
_"ব্যাপার কি বল তো? আমাদের বৌমনির কোন খবর নাই কেন?"
তুষিকার কথায় মিষ্টি হাতের চিরুনি চালানো থামালো।তারপর কপাল কুচকে একবার ঘড়ির দিকে তাকালো। ৯টা বাজলো বলে।এবার খানিক তারও চিন্তা হচ্ছে।কিন্তু ভাইয়ের দরজায় কড়া নাড়ার মতন অবস্থার কথাও চিন্তা করা যাচ্ছে না!সে তুষিকার দিকে ফিরে বলল,
_"কি করা যায় বল তো আপু? আমারও চিন্তা হচ্ছে!নিচে না গেলে বাড়ির মানুষ এটাকে ভালো চোখে দেখবেনা!"
তুষিকাও মাথা দোলালো। যদিও তাদের বাড়ির মানুষ সম্পুর্ণ ভিন্ন!তবুও মাহিদের বিয়েটা স্বাভাবিক না তাই সবারই নরমাল হতে সময় লাগছে!সে উঠে দাড়িয়ে বলল,
_"চল!আমরা আগে একবার নিচের পরিস্থিতি দেখে আসি।তারপর কিছু একটা বলে ম্যানেজ করা যাবে!"
মিষ্টি ও ভাবলো এটাই ভাল উপায়।তাই সে চুল গুলো হাত খোপা করে তুষিকার পিছন পিছন নিচের দিকে হাটা ধরলো!
_"বাহ! বাহ! কেয়া বাত হে! উপরে বসে আমরা তোমার চিন্তায় অস্থির হচ্ছি।আর তুমি এখানে কপি বানাচ্ছো?"
পিছন থেকে তুষিকার গলার আওয়াজ শুনে তুশি চমকে উঠলো।তড়িঘড়ি করে পিছন ফিরে ভ্যাবলা মার্কা একটা হাসি দিল।তারপর আমতাআমতা করে বলল,
_"আরে তোমরা? ক-কপি খাবে নাকি? দিব?"
খুব সূক্ষ ভাবে মিষ্টি তুশিকে দেখলো।তুশি যে নার্ভাস সেটা সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে।পাশে খেয়াল করে দেখলো তুশির চুলের পানির কারনে উড়নার পিছন সাইড ভিজে গেছে।আর উড়না তুশি দুই পেচ দিয়ে গুরিয়ে পড়েছে। যার কারনে মুখটা ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না।তবে চুল ভিজার কারনে উড়নাও ভিজে যাচ্ছে।মিষ্টি ইশারায় তুষিকাকে সেটা দেখালো!
তুষিকা দুই ভ্রু নাচিয়ে অবাক হওয়ার ভান করে বলল,
_"আল্লাহ বৌমনি!! তোমার চুল ভিজা কেন? এত সকালে কেন গোসল করেছ?"
মিষ্টি কোনরকমে নিজের হাসি টা আটকে রেখেছে!তুশি তড়িঘড়ি করে তুষিকার মুখ চেপে ধরলো! কাঁদো কাঁদো মুখ নিয়ে বলল,
_"একদম আমার লেকফুল করবে না বলে দিলাম!!"
মিষ্টি আর তুষিকা অট্টহাসি তে ফেঁটে পড়ল।মিষ্টি পিছন থেকে গলা জড়িয়ে বলল,
_"ঠিক আছে করব না যাহ! নাস্তা মনে হয় করিস নি।টেবিলে যা আমি নাস্তা দিচ্ছি!!"
তারপর আর কি! তুশি একটুও কথা বাড়াতে চাইলো না।কারন সে জানে ,যত এখন কথা বাড়াবে এরা ততবেশি তার পিছনে লাগবে।তাই নিজের সেফটি আগে।রিস্ক নেওয়া যাবে না!সে সুন্দর করে হাতের কফি মগ টা নিয়ে ডাইনিং এ বসলো।তুষিকা ঠোঁট টিপে হাসলো।সে আর কিছু না বলে উপরে চলে গেল।আর মিষ্টি তুশিকে খাইয়ে নিজেও খেয়ে নিল।"
দুপুরের আগ সময়ে মোটামোটি সবাই তৈরী। ভ্যানুতে আগেই সবাই পৌঁছে গিয়েছে।শুধু শলকের একটি গাড়ি এখন যাবে।শলকের সাথে বন্ধুরা আর ভাইয়েরা আছে।রিদভিক আগেই যেতে চেয়েছে,শলক জোর করে ধরে রেখেছে।আজকের দিনে ভাইয়ের মন খারাপ করানোর ইচ্ছে নাই বলে এক বাক্যে মেনে নিয়েছে।নাহলে রিদভিক কি আর সবার কথা শোনার পাত্র নাকি?"
অবস্থান এখন ভ্যানুর গেইটে!এই পাশে পাত্রসহ পাত্রের সাঙ্গপাঙ্গ! জোরকদমে পাত্রকে ডাকাতির হাত থেকে বাঁচানো তাদের মূল লক্ষ!অপরপাশে পাত্রির বোনেরা দাঁড়িয়ে। লক্ষ একটাই! যেকোনো মূল্যে নিজেদের দাবি আদায় করা!এক পক্ষ অপর পক্ষের দিকে এমন ভাবে তাকিয়ে আছে,যেন চোখ দিয়েই গিলে ফেলবে।
রিদভিক তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।তবে তার চোখ নির্দিষ্ট এক জায়গায়!মিষ্টির অবস্থা ছেড়ে দে মা কেন্দে বাঁচি!এই লোক তার দিকে এমন করে তাকিয়ে আছে কেন?সে কি করেছে?সে কি এখানে আসতে চেয়েছে নাকি?সে কোন রকমে একটু হাসার চেষ্টা করলো! তাতে লাভ হল কিনা বোঝা গেল না!তবে আজরাইলের গলা ঠিকি শোনা গেল-
_"কি ব্যাপার ছেলের বোন হয়ে তোরা ফিতার ওই পাশে কি করছিস?"
রিদভিকের এমন গমগমে গলা শুনে মিষ্টির গলা শুকিয়ে এল।গলার মধ্যে চৈত্রের খরা দেখা দিয়েছে!এই মুহুর্তে একটু পানি না ফেলে ,এই গলা যেকোন সময় ফেটে দুই ভাগ হয়ে যাবে।তবে ভয়ে নড়তে অবধি পারছেনা!তবে অহশি ভাবেলেশহীন ভাবে তাকিয়ে আছে।পাত্তা দেওয়ার টাইম কোথায়,
_"মেয়েরা হচ্ছে কচু পাতার মত! বুঝলে! যেই পাত্রে রাখা হয় ,সেই পাত্রের রঙ ধারন করে!যেহেতু আমরা আগে ভ্যানুতে আসছি,সেহেতু আমরা এখন মেয়ে পক্ষ!"
এমন উল্টাপাল্টা লজিক শুনে ছেলেরা তাজ্জব বনে গেল!শাফিন তো কিচ্ছুক্ষন হা করে তাকিয়ে ছিল।তারপর দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
_"বাড়ি চল আগে ,তারপর বোঝাবো কচু পাতায় কত ধরনের পোকা থাকে!
তারপর বাকা হেসে বলল,
_"বিশেষ করে জোঁক!!"
এই বিশেষ প্রানীটির নাম শুনে মেয়েদের গা গুলিয়ে এল।অহশি তো পারে না ফিতে ডিঙিয়ে শাফিনের মাথায় একটা ইটের বাড়ি দিতে।নেহাৎ এখানে দাদান আছে!নাহলে আজকে এসপার নাহলে অসপার!"
অনেক বাকবিতন্ডার পর অবশেষে মেয়েদের খুশি করে ফিতে কাটার কেঁচি টা হাতে পাওয়া গেছে।এই যুদ্ধ জয় করতে গিয়েই একেক জন বুকে হাত দিয়ে হাপাচ্ছে।শলকের পাশ থেকে পৃথক বলল,
_"এই মেয়েদের থেকে,সামান্য ফিতে কাটার কেঁচি নিতে আমাদের এই অবস্থা ভাই!আর আপনি ভাই ,বাকি জীবন এদের বোনের সাথে কাটাবেন? আমার তো ভেবেই কিডনি এট্যাক আসতেছে!আপনার জন্য ধৈর্য্য কামনা করছি ভাই!!"
মেয়েরা প্রথমে চোখ গরম করে তাকাতে গিয়েও হেসে ফেলল। তারপর এখানে সরবত আপ্যায়ন সেরে বর নিয়ে সবাই ভিতরের দিকে গেল।মিষ্টি বেখেয়ালি ভাবে হেটে পিছন ঘুরতে গিয়ে খেল এক উষ্ঠা!কোন রকম ককিয়ে পিছন ফিরতেই দেখলো রিদভিক দাঁড়িয়ে! সে চোখ বড় বড় করে তাকালো। কোনো রকমে বিড়বিড় করে বলল-
_"ইন্নালিল্লাহ!!এই আজরাইল এখানে কি করে?"
তারপরে কোন রকমে হেসে পালানোর চেষ্টা করলো।দুই কদম হেটেই থেমে গেল।পিছন থেকে রিদভিক ডেকে উঠলো,
_"দাঁড়াও!!
_"জ্বি ভা-ভাইয়া!
রিদভিক হেটে সামনে এল।তারপর চোখ ঘুরিয়ে বলল,
_"তোমার জন্য কালকে ডক্টর এর কাছে একটা এপ্যায়েন্টমেন্ট নিব!"
মিষ্টি ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল।আশ্চর্য! তার কি কোন অসুখ পড়েছে নাকি? সে কেন ডাক্তার দেখাবে? নেহাত তার এত সাহস নাই কিছু বলার!তাই কোন রকমে বলল
_"কেন ভাইয়া?"
_"দুইটা সমস্যা তোমার!এক ,যেখানে সেখানে উষ্ঠা খাই পড়!আর দুই অকারণে শুধু বিড়বিড় কর!দুইটাই খুবি জটিল সমস্যা!!"তার ডক্টর কনসাল্ট করা খুবই জরুরী!! "
নিজের বক্তব্য শেষ করে আর দাড়ানোর প্রয়োজন মনে করলো না রিদভিক।লম্বা কদম ফেলে ভিতরে চলে গেল।এই দিকে মিষ্টি এখনো হা করে তাকিয়ে আছে!এই লোক কি তাকে কোনভাবে অপমান করলো? করলো মনে হয়? করলেই বা কি? তার কি এত সাহস আছে,ওই আজরাইল কে কিছু বলার!!
সে কাঁদো কাঁদো মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল!!"
চলবে........!
(অনেক দিন পর🙂কেউ কিছু বইলেন না🔪)
Olpo Olpo Golpo Kotha