04/08/2026
আবুল হাসান: নিঃসঙ্গতার দীপ্ত কবি, যিনি আজও আমাদের সমকাল
৪ আগস্ট বাংলা কবিতার এক উজ্জ্বল অথচ ক্ষণজন্মা নক্ষত্রের জন্মদিন। ১৯৪৭ সালের এই দিনে গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গীপাড়ার বর্ণি গ্রামে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন কবি ও সাংবাদিক আবুল হাসান। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল পিরোজপুর জেলার নাজিরপুর উপজেলার ঝনঝনিয়া গ্রামে। পিতা আলতাফ হোসেন মিয়া ছিলেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা। জন্মনাম ছিল আবুল হোসেন মিয়া, কিন্তু বাংলা সাহিত্য তাঁকে চিরকাল মনে রাখবে আবুল হাসান নামেই।
মাত্র আটাশ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবন। অথচ এই অল্প সময়েই তিনি বাংলা কবিতায় এমন এক স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর নির্মাণ করেন, যা আজও সমান প্রাসঙ্গিক। তাঁর কবিতায় নিঃসঙ্গতা, প্রেম, মৃত্যু, অস্তিত্বের সংকট, ব্যক্তিমানুষের ভাঙন এবং মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর বাংলাদেশের স্বপ্নভঙ্গ এক অনন্য কাব্যভাষায় প্রকাশ পেয়েছে। তাই আবুল হাসান কেবল একজন কবি নন; তিনি এক প্রজন্মের বেদনা, আশা ও আত্মসংকটের শিল্পিত ভাষ্যকার।
ঢাকার আরমানিটোলা সরকারি বিদ্যালয় থেকে ১৯৬৩ সালে এসএসসি এবং বরিশালের বিএম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হন। কিন্তু সাহিত্য ও সাংবাদিকতার টানে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা অসমাপ্ত রেখেই ১৯৬৯ সালে দৈনিক ইত্তেফাক-এর বার্তা বিভাগে যোগ দেন। পরে গণবাংলা ও দৈনিক জনপদ-এ সহকারী সম্পাদক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
সাংবাদিকতা ছিল তাঁর পেশা, কিন্তু কবিতাই ছিল তাঁর আত্মপরিচয়।
১৯৭০ সালে এশীয় কবিতা প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জনের মধ্য দিয়ে তাঁর প্রতিভা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে। স্বাধীনতার পরপরই প্রকাশিত ‘রাজা যায় রাজা আসে’ (১৯৭২), ‘যে তুমি হরণ করো’ (১৯৭৪) এবং মৃত্যুর অল্প আগে প্রকাশিত ‘পৃথক পালঙ্ক’ (১৯৭৫) বাংলা কাব্যের ইতিহাসে স্থায়ী আসন লাভ করেছে। মৃত্যুর পর প্রকাশিত ‘ওরা কয়েকজন’ (কাব্যনাট্য) এবং ‘আবুল হাসান গল্প-সংগ্রহ’ তাঁর বহুমাত্রিক সাহিত্যপ্রতিভার সাক্ষ্য বহন করে।
আবুল হাসানের কবিতার অন্যতম শক্তি তাঁর আত্মজৈবনিক বেদনা। তিনি ব্যক্তিগত নিঃসঙ্গতাকে জাতীয় অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে দিতে পেরেছিলেন। তাঁর বিখ্যাত পঙ্ক্তি—
"ঝিনুক নীরবে সহো, ঝিনুক নীরবে সহে যাও / ভিতরে বিষের বালি, মুখ বুঁজে মুক্তা ফলাও।"
—শুধু ব্যক্তিগত সহিষ্ণুতার কথা বলে না; এটি যেন এক সংগ্রামী জাতিরও প্রতীক, যারা যন্ত্রণা ধারণ করেও সৌন্দর্যের জন্ম দেয়।
আবার ‘কালো কৃষকের গান’-এ তিনি লিখেছেন—
"দুঃখের এক ইঞ্চি জমিও আমি অনাবাদী রাখবো না আর আমার ভেতর।"
এই উচ্চারণ তাঁর কবিসত্তারই পরিচয়—যেখানে দুঃখ পরাজয় নয়; বরং সৃজনের উর্বর ভূমি।
শেষ দিনগুলোর আলো-আঁধারি
জীবনের শেষ পর্যায়ে যক্ষ্মা তাঁকে ক্রমশ গ্রাস করছিল। তাঁর চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশ সরকার তাঁকে বার্লিনে পাঠিয়েছিল—তৎকালীন সময়ে একজন কবির জন্য এমন উদ্যোগ ছিল বিরল এবং রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সাহিত্যিকের প্রতি এক অসাধারণ সম্মান।
কিন্তু সুস্থ হয়ে ওঠার আশাটি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। দেশে ফিরে আবার অসুস্থ হয়ে তিনি পিজি হাসপাতালে (বর্তমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) ভর্তি হন। চিকিৎসকেরা যখন প্রায় আশা ছেড়ে দিয়েছেন, তখনও একজন মানুষ তাঁর পাশে অটল ছিলেন—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক, কবি ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক সুরাইয়া খানম।
সুরাইয়া খানমের স্মৃতিতে আবুল হাসান
লেখক মুহম্মদ জুবায়ের তাঁর স্মৃতিচারণে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য তুলে ধরেছেন। ১৯৭৫ সালের ২৬ নভেম্বর সকালে আবুল হাসানের মৃত্যুসংবাদ শুনে তিনি হাসপাতালে পৌঁছে দেখেন—সুরাইয়া খানম কবির নিথর দেহের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন, গভীর শোক ও অসহায়তায় ভেঙে পড়া এক মানুষ।
সেই মুহূর্তে সুরাইয়া খানমের একমাত্র আকুতি ছিল, কবির শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী যেন তাঁর সমাধি ঢাকায় হয়। তিনি বলেছিলেন, হাসান চেয়েছিলেন রেসকোর্স ময়দানের (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) পাশে শায়িত হতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই ইচ্ছা পূরণ হয়নি; পরিবারের সিদ্ধান্তে তাঁকে গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়।
মুহম্মদ জুবায়ের লিখেছেন, মানুষের জীবনে এমন কিছু দৃশ্য থাকে, যা কখনো বিস্মৃত হয় না। সুরাইয়া খানমের সেই অসহায় মুখ তাঁর কাছে আজও তেমনই এক অবিস্মরণীয় স্মৃতি।
সুরাইয়া খানম: মেধা, সৌন্দর্য ও মানবিকতার এক বিরল সমন্বয়
সুরাইয়া খানম শুধু একজন শিক্ষক ছিলেন না; তিনি ছিলেন কবি, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক এবং সাহিত্যানুরাগী এক অসাধারণ মানুষ। ১৯৭১ সালে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন এবং বিজয়ের পর লন্ডনের ট্রাফালগার স্কয়ারে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলনের গৌরব অর্জন করেন।
মুহম্মদ জুবায়ের তাঁর স্মৃতিচারণে লিখেছেন, সুরাইয়া খানমের মধ্যে মেধা, সৌন্দর্য ও ব্যক্তিত্বের যে সমন্বয় ছিল, তা বিরল। কিন্তু তাঁর সৌন্দর্য নিয়ে যত আলোচনা হয়েছে, শিক্ষক, কবি ও মুক্তিযুদ্ধের কর্মী হিসেবে তাঁর অবদান ততটা আলোচিত হয়নি।
বাংলা কবিতার এক অনন্ত উপস্থিতি
আবুল হাসান চলে গেছেন ১৯৭৫ সালের ২৬ নভেম্বর। কিন্তু তাঁর কবিতা আজও সমান জীবন্ত। আধুনিক বাংলা কবিতায় নিঃসঙ্গতার যে গভীরতম ভাষা তিনি নির্মাণ করেছেন, তা আজও নতুন প্রজন্মকে আলোড়িত করে।
তাঁর কবিতায় ব্যক্তিগত বেদনা কখনো সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়; প্রেম কখনো কেবল ব্যক্তিগত নয়; মৃত্যু কখনো শেষ নয়। তাই তাঁর কাব্য আমাদের শেখায়—দুঃখও সৃজনের শক্তি হতে পারে, নিঃসঙ্গতাও হয়ে উঠতে পারে ইতিহাসের ভাষা।
জন্মদিনে এই অসামান্য কবিকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি। তাঁর কবিতার মতোই তিনি বাংলা সাহিত্যে চিরজাগরুক—
"দুঃখের এক ইঞ্চি জমিও আমি অনাবাদী রাখবো না আর আমার ভেতর।"
বাংলা কবিতার ইতিহাসে এই উচ্চারণ চিরকাল অনুরণিত হবে।
তথ্যসূত্র:
শহিদুল ইসলাম, বাংলাপিডিয়া; মুহম্মদ জুবায়ের, আমাদের সুরাইয়া খানম; আবুল হাসানের প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থসমূহ।