04/07/2025
“কাফকাস্ক”: আধুনিক জীবনের দুঃস্বপ্নে কাফকার ছায়া
গতকাল ৩রা জুন ছিল ফ্রানৎস কাফকার একশো একতম প্রয়াণদিবস। বিমা কোম্পানির চাকরি তাঁর জীবিকার উৎস থাকলেও মনেপ্রাণে ছিলেন কেবল লেখক। যদ্দুর জানা যায়, ব্যক্তিজীবনে যথেষ্ট হাস্যরসিক মানুষ থাকলেও তাঁর সাহিত্য বলে ভিন্ন কথা। মাত্র চল্লিশ বছর বয়সে যক্ষ্মারোগের কাছে ধরাশায়ী হয়ে প্রয়াত হওয়া কাফকা মৃত্যুর পর প্রিয় বন্ধুকে সব লেখা ধ্বংসের কথা বলে গেলেও, বন্ধুটি তা করেননি। আমাদের সৌভাগ্য বটে, মিস্টার ম্যাক্স ব্রড বন্ধুর লেখা পুড়িয়ে ফেলেননি। নাহলে নিঃসঙ্গতা, একাকীত্ব ও অস্তিত্ব নিয়ে এত গভীরভাবে আমরা নিজেদের ভেতরটাকেই-বা কীভাবে জানতাম!
চল্লিশের দশকের পর কাফকার সাহিত্যধারা এত বেশি প্রভাব তৈরি করে যে, “Kafkaesque” নামে একটি ধারা উৎপত্তি লাভ করে। কেবল সাহিত্যের ধারা হিসাবেই নয়, এটি হয়ে উঠেছে আধুনিক জীবন ও রাষ্ট্রিক নাগরিক ভোগান্তি তথা সিস্টেমের অপর নাম। কাফকার লেখার মূল উপজীব্য থেকে শব্দটির উৎপত্তি— অথরিটির বিরুদ্ধে ইনডিভিজুয়ালের দ্বন্দ্ব, স্টেট ফাংশনের বিপক্ষে নাগরিকের লড়াই, মানুষের মধ্যকার বিচ্ছিন্নতা ইত্যাদির নিরিখে শব্দটি একটি ‘ধারণা’ হিসাবে ৪০-৫০-এর দশকে বিকাশ লাভ করে পরবর্তীতে সাহিত্য, রাজনীতি ও ব্যুরোক্রেসির পাঠ-প্রয়োগে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
কাফকার সবচেয়ে বিখ্যাত তিনটি উপন্যাস— The Trial, The Castle এবং The Metamorphosis— ধারণাটির প্রকৃষ্ট উদাহরণ—
The Trial-এ আমরা দেখতে পাই, একজন সাধারণ ব্যক্তি— জোসেফকে হঠাৎ করে এক অপরাধে অভিযুক্ত করা হয়, অথচ সে জানেই না, কী তার অপরাধ। বিচার চলে, কিন্তু কোনো ব্যাখ্যা নেই, কোনো বিচারক নেই, কোনো শেষ নেই। ব্যুরোক্রেসির ভয়ংকর অবোধ্য শক্তি কীভাবে সাধারণ মানুষের জীবনে দানব হয়ে হাজির হয় তার উদাহরণ এটি।
The Castle-এর চরিত্রটি দুর্গে ঢুকতে চায়, কিন্তু কখনোই সেখানে পৌঁছাতে পারে না। প্রত্যেকবারই নতুন নিয়ম, নতুন বাধা। যেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন— প্রতিটি টেবিল এক অদৃশ্য ভূত, যে ভয় দেখায়— ভোগান্তি না চাইলে খালুকে ডাকো, নয়তো টাকা দাও।
The Metamorphosis-এ গ্রেগর সামসা এক সকালে জেগে উঠে দেখে সে এক অজানা প্রাণীতে পরিণত হয়েছে, অথচ পরিবার ও সমাজ কেবল তার উপার্জন ক্ষমতা নিয়েই চিন্তিত। পরিচয়হীনতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি সামসাই হলো “কাফকাস্ক”।
ব্যক্তি জীবনের সমস্ত সংকটের একটি মাত্র নাম “কাফকাস্ক”। রাষ্ট্র, বিধান, আমলাতন্ত্রের যাঁতাকলের নাম “কাফকাস্ক”।
আজকের দিনে এটি কেবল সাহিত্যের অনুভূতিই নয়, বাস্তব জীবনেও এই গ্যাঁড়াকলে পিষ্ট হই আমরা। পিজি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যাওয়া, বিআরটিএতে মোটরগাড়ির লাইসেন্স ইস্যু, আদালতে ন্যায়বিচার পাওয়া— কোথাও সুস্পষ্ট নিয়ম নেই, কোনো সাহায্য নেই— আপনি-আমি, আমরা সকলে পার করছি “কাফকাস্ক” এক্সপেরিয়েন্স।
নাগরিক হিসাবে আমরা বুঝে উঠতে পারি না, কেন রাষ্ট্রের নিয়মসমূহ এত জটিল, অদৃশ্য আর আমাদের ভুলটাই-বা কী! সিস্টেমের মুখে থুথু দিতে যেয়ে দেখবেন, সিস্টেমের মুখই হাওয়া। শেষমেষ নিজের অপরাধের কারণ খুঁজে বেড়ানো অথচ কেউ কিছুই বলছে না। ক্ষমতাকাঠামোর অদৃশ্যতা— কে যে মহাপরাক্রমশালী, তা বুঝতে না পারা অথচ সকলেই আমরা সেই সিদ্ধান্তের স্বীকার; আত্মদ্বন্দ্ব ও অপরাধবোধ— আমি কি কোনো ভুল করেছি?; পরিচয়হীনতা, নিঃসঙ্গতা, অর্থহীনতা ও জটিলতা— নিয়ম আছে তবু কেন বিচ্ছিন্নতা নিয়ম থেকে, কেন এসব ব্যাখ্যাতীত ও অসংগঠিত, কিছুই বুঝতে না পারা; আর নিয়ন্ত্রণহীন নিয়ন্ত্রণ— কে আসলে পরিচালনা করছে আমার জীবন, ঈশ্বর তো নয়, তা নিশ্চিত, কে তাহলে?— আধুনিক দুনিয়ায় “কাফকাস্ক”-এর উদাহরণ ভুরি ভুরি।
প্রয়াণের শত-এক বছর পরেও মনে হয়— কাফকা জীবিত, আমাদের ভেতরেই। ব্যক্তি কাফকা অনুপস্থিত কিন্তু “কাফকাস্ক” জীবনের নানা স্তরে উপস্থিত জোরালোভাবে— ঠেলে সরিয়ে ফেলা যায় না। কাফকা কেবল সাহিত্যিক নন— একজন জ্যোতিষ, একজন ভবিষ্যৎদ্রষ্টা, যিনি মানুষের বিচ্ছিন্নতা, একাকীত্ব, হায়ারার্কির নিষ্পেষণ আর আত্মপরিচয়ের সংকট টের পেয়েছিলেন আগেই। আজ তাই, “Kafkaesque” শুধু একটি ভাবধারা নয়, এক সতর্কবার্তা— যেখানে মানুষ হারিয়ে যেতে পারে, নিজের অজান্তেই।
শত-একতম প্রয়াণদিবসের একদিন পর আজ ৪ঠা জুন— শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি, প্রিয় কাফকা, প্রিয় বন্ধু আমাদের।