04/07/2026
একদিন খেলতে গিয়ে বন্ধুদের সাথে ঝগড়া হলে বন্ধুরা তাকে বললো- “তুমি যাকে বাবা ডাকো, তিনি তোমার আসল বাবা নন!”
বন্ধুদের মুখে কথাটি শুনে যায়িদ যেন আকাশ থেকে পড়লেন! তিনি ছুটে গেলেন তার মায়ের কাছে। জিজ্ঞেস করলেন, “মা, রাবিয়াহ ইবনে হারাম কি আমার বাবা নন?”
ফাতিমা বিনতে সা’দ বুঝতে পারলেন, যে কথা তিনি এতোদিন ধরে লুকিয়ে রেখেছিলেন এখন সময় এসেছে আসল কথা বলার। তিনি যায়িদকে কাছে টেনে নিয়ে বললেন- “শুনো বাবা…।”
মাত্র কৈশোরে পা দেয়া যায়িদ শুনতে লাগলেন তার জন্মের ইতিহাস।
তার বাবার নাম কিলাব ইবনে মুররাহ। এই ঘরে জন্ম নেন যুহরা ইবনে কিলাব এবং যায়িদ ইবনে কিলাব। কিলাবের মৃত্যুর পর তার মায়ের বিয়ে হয় রাবিয়াহ ইবনে হারামের সাথে। স্ত্রীকে নিয়ে রাবিয়াহ মক্কা ছেড়ে চলে যান সিরিয়ায়। সেখানে বেড়ে ওঠেন যায়িদ।
এতোদিন তিনি জেনে আসছিলেন রাবিয়াহ তার বাবা। কিন্তু, মায়ের মুখে তার আসল বাবার পরিচয় লাভের পর জানতে পারেন- তিনি এমন এক বংশে জন্মগ্রহণ করেছেন যেই বংশ কাবা নির্মাণ করেছে। অর্থাৎ, তিনি ইব্রাহিম আ. এবং ইসমাইল আ. এর বংশধর।
সৎ বাবাকে এতোদিন বাবা ডাকার ফলে প্রথমে যে হীনমন্যতা তৈরি হয়েছিলো, এবার পরিচয় পাবার পর যায়িদ গর্ববোধ করতে লাগলেন। কিশোর যায়িদ সিরিয়া ছেড়ে চলে আসেন মক্কায়। এখানকার কেউ তাকে চিনে না। কারণ মক্কা শাসন করছে বনু খুজাআ নামক গোত্র, যারা জুরহুম গোত্রকে বিতাড়িত করে মক্কার শাসক হয়।
মক্কার শাসক তখন হুলাইল ইবনে হুবশিয়া। যায়িদ মক্কায় আসলে হুলাইলের অধীনে কাজ করেন। তার দক্ষতা, আমানতদারিতা দেখে মক্কার লোকজন তাকে পছন্দ করা শুরু করে। এমনকি মক্কার শাসক নিজেও যায়িদকে পছন্দ করতেন।
তার একমাত্র মেয়ে হুব্বাকে বিয়ে দিতে পাত্র খুঁজতে লাগলেন। কিন্তু, হুলাইলের মনে হলো মক্কার ভেতরের কেউ যোগ্য না। এজন্য তিনি সেই ‘কিশোর আগন্তুক’ যায়িদের সাথেই মেয়েকে বিয়ে দিলেন।
চিন্তা করুন, একটা শহরের গভর্নর, মেয়র তার মেয়েকে বিয়ে দিচ্ছেন তার একজন এমপ্লয়ির সাথে।
আর এই বিয়ে ইতিহাসের মোড় বদলে দেয়!
হুলাইল মেয়েকে বেশিই ভালোবাসতেন। তার কাছে ছেলেরা ছিলো অযোগ্য। এজন্য মৃত্যুর আগে তিনি কাবার চাবি দিয়ে যান মেয়ে হুব্বাকে।
হুব্বা কাবার চাবি পেলেও বাবার মৃত্যুর পর তিনি এক সমস্যায় পড়েন। তিনি মেয়ে মানুষ, কাবা ঘর খুলতে তো পারবেন না। এজন্য চাবিটা দিয়ে দেন তার চাচাতো ভাই আবু গুবশানকে।
আবু গুবশানের একটা বদ অভ্যাস ছিলো। আর এই এক বদ অভ্যাসই কাবার ইতিহাস বদলে দেয়।
একদিন আবু গুবশাণের প্রচন্ড নেশা ধরে। সে কোথাও মদ খুঁজে পাচ্ছিলো না। তখন একজন তাকে বললো, আমি তোমাকে মদ দিতে পারি।
আবু গুবশান মদের জন্য সবকিছু দিতে রাজি। তাকে বলা হলো, তুমি কাবা ঘরের চাবি আমাকে দিয়ে দাও, আমি এই মদের পুরো পেয়ালা তোমাকে দিয়ে দেবো। মদের নেশায় আসক্ত আবু গুবশান রাজি হয়ে যায়!
সেই বুদ্ধিমান লোক কে ছিলো যে কাবা ঘরের চাবির মালিক হন?
তিনি ছিলেন সেই যায়িদ, যিনি সুদূর সিরিয়া থেকে মক্কায় আসেন তার পিতৃপুরুষদের বানানো কাবা ঘর পুনরুদ্ধার করতে।
যায়িদ মক্কায় আসার পর থেকেই কাবা পুনরুদ্ধারের জন্য কাজ শুরু করেন। তার একার পক্ষে তো সম্ভব না, এজন্য তিনি তার চাচা, চাচাতো ভাই সবাইকে মক্কায় আসতে বলেন। তার ভাই যুহরা, চাচা তাইম ইবনে মুররাহ, চাচাতো ভাই মাখজুম, যুমাহ, সাহম সবাইকে একত্রিত করেন।
রাতের বেলা যায়িদ কাবার চাবি পান। সকাল হলেই আবু গাবশানের সম্বিৎ ফিরে। সবাই তাকে বললো, তুমি এ কী করলে? যাও চাবি নিয়ে আসো…।
কিন্তু, যায়িদ সেই চাবি ফিরিয়ে দিতে রাজি হলেন না। এই নিয়ে দেখা দিলো বনু খুজাআর সাথে দ্বন্দ্ব। যায়িদও প্রস্তুত। তিনি তো আগে থেকেই তার বংশের লোকজনকে মক্কায় নিয়ে এসেছেন।
তার বংশের লোকজনই হলো কুরাইশ। কুরাইশ এবং কিনানা গোত্র মিলে বনু খুজাআর সাথে যুদ্ধ হয়। অর্থাৎ যায়িদের নিজের বংশের সাথে শ্বশুরবাড়ির বংশের যুদ্ধ।
দীর্ঘ ৩০০ বছর তারা মক্কা শাসন করলেও এই ‘কিশোর আগন্তুক’ –এর মাস্টারপ্ল্যানের কাছে পরাজিত হয় বনু খুজাআ।
বন্ধুদের সাথে খেলতে গিয়ে যিনি শুনেছিলেন ‘তুমি যাকে বাবা ডাকো, তিনি তোমার আসল বাবা নন’, সেই ছেলেটি কয়েক বছরের মধ্যে হয় মক্কার শাসক।
যায়িদ ছিলো তার ডাকনাম। মক্কার লোকজণের কাছে তিনি ছিলেন আগন্তুক, কিশোর। এজন্য তারা তাকে ডাকে ‘কুসাই’ নামে।
অর্থাৎ সেই যায়িদই হলেন কুসাই ইবনে কিলাব; রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পঞ্চম পূর্বপুরুষ। কুসাইয়ের ছেলে আব্দে মানাফ, আব্দে মানাফের ছেলে হাশিম, হাশিমের ছেলে আব্দুল মুত্তালিব, আব্দুল মুত্তালিবের ছেলে আব্দুল্লাহ, আব্দুল্লাহর ছেলে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
কুসাই ইবনে কিলাবের ভাইয়ের নাম ছিলো যুহরা। এই বংশে জন্মগ্রহণ করেন আমিনা। আর কুসাইয়ের বংশে আব্দুল্লাহ। তারমানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মা-বাবার বংশ গিয়ে মিলিত হয় কিলাব ইবনে মুররাহর সাথে। আর কুসাইয়ের চাচা তাইম ইবনে মুররাহ, এই বংশে জন্মগ্রহণ করেন আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু।
বন্ধুদের কথা যেমন মোটিভেট করে, তেমনি ডিমোটিভেটও করে। চিন্তা করুন, একজন মানুষ বন্ধুদের কাছে অপমানিত হবার শুনার পর কীভাবে ইতিহাস বদলে দেন!
Qarib قريب