03/05/2026
গল্পঃ *আমি, নীল রঙা চুড়ি এবং একটি বালিকা*
চোখে প্রচণ্ড ঘুম। হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল। বিরক্ত হয়ে রিসিভ করলাম।
- হ্যালো?
-কী! এখনো ঘুমাচ্ছো?
- কেন, কী হয়েছে?
-তাড়াতাড়ি ওঠো, রেডি হয়ে বের হও। তোমাকে নিয়ে একটা জায়গায় যাব। এখন ৭টা বাজে। ৭:৩০-এর মধ্যে মোহাম্মদপুর বাস স্ট্যান্ডে থাকো।
-কোথায় যাব? এত অল্প সময়ে কীভাবে রেডি হব? নাস্তা?
-কিছু লাগবে না। তুমি শুধু চলে আসো।
তাড়াহুড়ো করে উঠে ফ্রেশ হলাম। আম্মুকে বললাম, একটা কাজে যাচ্ছি, ফিরতে দেরি হবে।
মোহাম্মদপুর বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আদিবার জন্য অপেক্ষা করছি। কিছুক্ষণ পর সে এসে পৌঁছাল।
-ওঠো গাড়িতে।
ড্রাইভার আমাদের সম্পর্কের কথা জানে। মাঝে মাঝে আদিবা তাকে বকশিস দেয়।
আজ আদিবাকে অন্যরকম লাগছে। নীল শাড়িতে সে যেন আরও বেশি মায়াবী। কানে মিলিয়ে দুল, চুল এক পাশে ঝরিয়ে রেখেছে। মেয়েটার দিকে তাকালেই মন ভালো হয়ে যায়। তবুও মনে হলো, যেন কিছু একটা কম।
-কোথায় যাচ্ছি আমরা?
-মানিকগঞ্জের কাছে একটা গ্রামে। আজ সেখানে মেলা বসেছে। তোমাকে দেখাতে নিয়ে যাচ্ছি।
-বাসায় কী বলে বের হয়েছ?
-বলেছি এক ফ্রেন্ডের জন্মদিন। ফিরতে দেরি হবে।
গাড়ি চলতে লাগল। আমি চুপচাপ আদিবার দিকে তাকিয়ে আছি।
-আজ তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে।
-তাই নাকি? আমি কি আগে সুন্দর ছিলাম না?
-আজ অন্যরকম লাগছে।
-তাই বুঝি! আগে দেখোনি আমাকে?
বলেই সে চিমটি কাটল।
প্রায় ১০:৪৫-এ আমরা পৌঁছালাম। ছোট্ট একটা নদীর পাশে মেলা বসেছে। নাগরদোলা, পুতুলনাচ, বায়োস্কোপ।সব মিলিয়ে এক অন্যরকম পরিবেশ।
আমরা ঘুরে ঘুরে সব দেখছি। আমার মনে হচ্ছে, আমি কোনো মানুষ নয়-এক নীল পরির সঙ্গে হাঁটছি।
-আদিবা, তুমি একটু বসো। আমি আসছি।
-কোথায় যাচ্ছ?
-আসছি, একটু।
আমি দৌড়ে গিয়ে এক দোকান থেকে নীল রঙের চুড়ি কিনলাম।
নদীর পাশে একটা গাছের নিচে বসে আছি আমরা।
-চোখ বন্ধ করো।
-কেন?
-আরে করো না।
সে চোখ বন্ধ করল।
-এবার খোলো।
-ওয়াও! এটা আমার জন্য?
-হ্যাঁ।
আদিবার চোখে এক অন্যরকম উজ্জ্বলতা।
-জানো নাদিম, আমি কখনো তোমার কাছে দামি কিছু চাই না। তোমার দেওয়া ছোট ছোট জিনিসগুলোই আমার কাছে অমূল্য।
সে একটু থামল, তারপর ধীরে বলল।
-আমি স্বপ্ন দেখি, তোমাকে নিয়ে একটা ছোট সংসার হবে। ভালোবাসায় ভরা। সকালে তোমাকে ঘুম থেকে উঠাব, নিজের হাতে রান্না করব। বিকেলে তোমার ফেরার অপেক্ষা করব। রাতে তোমার বুকে মাথা রেখে গল্প করব। আমাদের একটা বেবি হবে...তোমার মতো দেখ।
কথা বলতে বলতে তার চোখে জল এসে গেল।
আমি তার কোলে মাথা রাখলাম।
-পাগলি, কাঁদছ কেন? আমি তো চাই না আমার নীল পরির চোখে জল আসুক।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামল। আমি আদিবার কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছি। সে আমার চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। চোখ ভারী হয়ে এলো।
কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম, বুঝতেই পারিনি।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে আসছে।
আমি আদিবার কোলে মাথা রেখে গল্প করছি।
আদিবা আমার চুলে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে…
চোখ দুটো ধীরে ধীরে ভারী হয়ে আসছে…
সবকিছু যেন ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে…
মেলার শব্দ, নদীর হাওয়া, আদিবার স্পর্শ ।সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত শান্তি…
কখন যে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম, বুঝতেই পারিনি…
হঠাৎ কে যেন আমাকে ডাকছে।
খুব রাগান্বিত স্বরে…
-এই! কতক্ষণ ঘুমাবি? ফোন বাজছে শুনতে পাচ্ছিস না?
চোখ খুলে দেখি…
আম্মু দাঁড়িয়ে আছে সামনে।
-কিরে, কয়টা বাজে দেখেছিস?
এভাবে ঘুমিয়ে থাকিস? ওঠ তাড়াতাড়ি!
আমি হঠাৎ লাফ দিয়ে উঠে বসে পড়লাম!
চারপাশে তাকালাম!
না, কোথাও কোনো মেলা নেই…
নেই সেই নদী…
নেই নীল শাড়ি পরা আদিবা…
আমার হাতে নেই কোনো নীল চুড়ি…
সবকিছুই যেন এক মুহূর্তে হারিয়ে গেছে…
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলাম…
মনে হচ্ছে বুকের ভেতরটা হঠাৎ ফাঁকা হয়ে গেছে…
তাহলে কি সবটাই স্বপ্ন ছিল?
আদিবা…
নীল শাড়ি…
সেই মেলা…
আর এক মুঠো নীল চুড়ি…
সবই কি শুধুই আমার কল্পনা?
চোখের কোণে অজান্তেই জমে উঠলো এক ফোঁটা জল…
হয়তো-
কিছু স্বপ্ন শুধু স্বপ্নই থাকে…
বাস্তব হওয়ার জন্য নয়।
কলমে - Shafiq Ahsan Nadim