01/10/2025
একদিন হযরত বাহলুল রহ. বসরার রাস্তায় হাঁটছিলেন। দেখলেন, কয়েকজন বাচ্চা বাদাম-আখরোট নিয়ে খেলছে। একটু দূরে দাঁড়িয়ে এক ছেলেকে কাঁদতে দেখলেন।
বাহলুল রহ. মনে করলেন, হয়তো খেলনার অভাবে সে কাঁদছে। কাছে গিয়ে বললেন, বাবা, তুমি চাইলে আমি তোমার জন্য বাদাম-আখরোট কিনে দিই। তুমিও খেলতে পারবে।
ছেলেটি অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল, আরে বোকা মানুষ! আমরা কি শুধু খেলার জন্যই দুনিয়ায় এসেছি?
বাহলুল রহ. জিজ্ঞেস করলেন, তাহলে কী করার জন্য এসেছো?
ছেলেটি দৃঢ় কণ্ঠে বলল, জ্ঞান অর্জন আর আল্লাহর ইবাদত করার জন্য।
বাহলুল রহ. বিস্মিত হয়ে বললেন, বাহ! এ কথা তুমি কোথা থেকে শিখলে?
ছেলেটি সঙ্গে সঙ্গে কুরআনের আয়াত শুনিয়ে দিল
اَفَحَسِبۡتُمۡ اَنَّمَا خَلَقۡنٰكُمۡ عَبَثًا وَّ اَنَّكُمۡ اِلَیۡنَا لَا تُرۡجَعُوۡنَ
তোমরা কি ভেবেছিলে, আমি তোমাদের অর্থহীনভাবে সৃষ্টি করেছি? এবং তোমাদেরকে আমাদের কাছে ফিরিয়ে আনা হবে না?
বাহলুল রহ. মুগ্ধ হয়ে বললেন, বাবা, তুমি তো জ্ঞানীর মতো কথা বলছো। আমাকেও কিছু উপদেশ দাও।
ছেলেটি সঙ্গে সঙ্গে চারটি কবিতা আবৃত্তি করল।
أَرى الدُّنْيا تُجَهِّزُ بانطِلاقٍ
مُشَمَّرَةً على قَدَمٍ وساقِ
فَلا الدُّنْيا بِباقِيَةٍ لِحَيٍّ
وَلا حَيٌّ على الدُّنْيا بِباقِ
كَأَنَّ المَوْتَ وَالحَدَثانَ فيها
إِلى نَفْسِ الفَتى فَرَسا سِباقِ
فَيا مَغْرورَ بِالدُّنْيا رُوَيْداً
وَمِنها خُذْ لِنَفْسِكَ بِالوِثاقِ
যেগুলোর অর্থ হলো এই—
আমি দেখি দুনিয়া যেন বিদায়ের জন্য প্রস্তুত,
সে তার সব শক্তি ও তৎপরতায় এগিয়ে চলেছে।
না দুনিয়া কোনো জীবিতের জন্য টিকে থাকে,
না কোনো জীবিত দুনিয়ায় স্থায়ী থাকে।
মনে হয় মৃত্যু আর বিপদ—
যেন তরুণের প্রাণের দিকে দৌড় প্রতিযোগিতার দুই ঘোড়া।
হে দুনিয়ার মোহগ্রস্ত মানুষ! একটু থামো,
এই দুনিয়া থেকেই নিজের পরকালের পাথেয় প্রস্তুত করো।
এরপর ছেলেটি আকাশের দিকে মুখ তুলল। দুই হাত তুলে ধরল প্রার্থনার ভঙ্গিতে। চোখ দিয়ে টলমল করে গড়িয়ে পড়ছিল অশ্রুধারা, যা গাল ভিজিয়ে দিচ্ছিল। সে তখন দুটি কবিতা আবৃত্তি করল
يَا مَنْ إِلَيْهِ الْمُبْتَهِلُ
يَا مَنْ عَلَيْهِ الْمُتَّكِلُ
يَا مَنْ إِذَا مَا آمِلٌ
يَرْجُوهُ لَمْ يَخِبِ الْأَمَلُ
যার অর্থ হলো—
হে সেই সত্তা, যাঁর দিকে প্রার্থনাকারীরা হাত তোলে।
হে সেই সত্তা, যার ওপর নির্ভরশীল সকল ভরসাকারী।
হে সেই সত্তা, যখন কোনো আশাবাদী মন কিছু কামনা করে—তাঁর কাছে প্রার্থনা করলে আশা কখনো ব্যর্থ হয় না।
কবিতা পাঠ করার পর হঠাৎ ছেলেটি জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
বাহলুল রহ. বলেন, আমি দ্রুত তার মাথা তুলে কোলে রাখলাম। আমার জামার হাতা দিয়ে মুখে লেগে থাকা মাটি পরিষ্কার করতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পর তার জ্ঞান ফিরল। আমি স্নেহভরে বললাম, বাবা! এত ছোট্ট বয়সে তোমার এত ভয় কেন? এখনো তো তুমি শিশু। এখনো তোমার আমলনামায় কোনো গুনাহও লেখা হয়নি।
ছেলেটি চোখ মুছে ধীর স্বরে উত্তর দিল, হে বাহলুল! আমি আমার ঘরে দেখি, মা যখন চুলায় আগুন জ্বালান, তখন বড় বড় কাঠ সহজে আগুন ধরে না। তাই তিনি আগে ছোট ছোট কাঠ চুলায় দেন—ওগুলো দ্রুত জ্বলে ওঠে, তারপর বড় কাঠগুলো আগুনে ধরে। তখন আমার মনে হয়, যদি কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ও এমনই ফয়সালা করেন! যদি তিনি বলেন—জাহান্নামের আগুন প্রথমে শিশুদের দিয়ে জ্বালানো হোক, তারপর বড়দের পালা আসবে? এই ভয়ে আমার বুক কেঁপে ওঠে...। [তাফসির রুহুল বয়ান, সূরা মুমিনূন : ১১৫]
আল্লাহু আকবার! এমনও এক সময় ছিল—যখন ছোট ছোট বাচ্চারা বসে বসে জাহান্নামের আগুনকে ভয় করত।
#খুতুবাত