16/08/2026
কৃষির সবুজ সাফল্যের আড়ালে কি লুকিয়ে আছে কোনো অদৃশ্য ঝুঁকি?
আমাদের খাদ্যের প্রতিটি দানার পেছনে রয়েছে একজন কৃষকের শ্রম, ঘাম ও আত্মত্যাগ। কিন্তু সেই কৃষকের হাতেই যদি এমন কোনো উপাদান পৌঁছে যায়, যা তার জীবন ও স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে কৃষির অগ্রগতিকে নতুনভাবে ভাবতে হয়।
এই ঘটনা একটি বাস্তব উদাহরণ হল Paraquat.
Paraquat-এর উচ্চ বিষাক্ততার কারণে বিশ্বের অনেক দেশ এর ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে অথবা কঠোর নিয়ন্ত্রণের আওতায় এনেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, Paraquat বিষক্রিয়া মানবদেহে মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে এবং অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তবুও বাংলাদেশে এখনও Paraquat ব্যবহৃত হচ্ছে। এটি আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে—
এত উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ একটি কীটনাশক ব্যবহারের বাস্তবতায় আমরা কৃষকের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত করতে পারছি?
বাংলাদেশে আগাছা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত নন-সিলেক্টিভ হার্বিসাইডগুলোর মধ্যে Paraquat-এর ব্যবহার অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য। ২০২৪ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু কৃষি অঞ্চলে নন-সিলেক্টিভ পোস্ট-ইমার্জেন্স হার্বিসাইড ব্যবহারের ক্ষেত্রে Paraquat-এর অংশ ছিল প্রায় ৬৭%, যেখানে Glyphosate-এর অংশ ছিল ৩৩%। এই উচ্চ ব্যবহারের হার দেখায় যে, কৃষি উৎপাদনে Paraquat-এর ওপর নির্ভরতা এখনো অনেক বেশি।
সাম্প্রতিক আরেকটি গবেষণায় বাংলাদেশের Paraquat বিষক্রিয়ার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে ২০১৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ১০টি তৃতীয় পর্যায়ের হাসপাতাল থেকে ১,৪২০টি বিষক্রিয়ার ঘটনা শনাক্ত করা হয়েছে এবং বিশ্লেষণ করা রোগীদের মধ্যে মৃত্যুহার ছিল ৪৩.২%।
Paraquat নিষিদ্ধ হবে কি না—এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয়। কোনো রাসায়নিকের ব্যবহার বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নির্ভর করে বৈজ্ঞানিক গবেষণা, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ার ওপর।
কিন্তু একটি বিষয় নিয়ে অপেক্ষা করার সুযোগ নেই—
Paraquat থাকুক বা ভবিষ্যতে বন্ধ হোক, কৃষকের নিরাপত্তা আজ থেকেই নিশ্চিত করতে হবে।
🌱 এই পরিবর্তনে কর্মঢালের ভূমিকা
কর্মঢাল বিশ্বাস করে, কৃষকের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে টেকসই কৃষি সম্ভব নয়। তাই আমাদের কাজ শুধু সচেতনতা তৈরি করা নয়; বরং মাঠপর্যায়ে কৃষকের সক্ষমতা বৃদ্ধি, নিরাপদ চর্চা গড়ে তোলা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের পথ তৈরি করা।
কর্মঢাল কাজ করতে পারে—
🔹 নিরাপদ কীটনাশক ব্যবহারের প্রশিক্ষণ
কৃষকদের সঠিক মাত্রা, মিশ্রণ, স্প্রে করার সময়, বাতাসের দিক, সংরক্ষণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া।
🔹 ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (PPE) ব্যবহারে উৎসাহ ও সহজলভ্যতা
গ্লাভস, মাস্ক, গগলস, বুট ও সুরক্ষা পোশাক ব্যবহারের গুরুত্ব তুলে ধরা এবং সহজলভ্যতার উদ্যোগ নেওয়া।
🔹 Integrated Pest Management (IPM) প্রচার
রাসায়নিক নির্ভরতা কমিয়ে জৈব নিয়ন্ত্রণ, ফেরোমোন ফাঁদ, উপকারী পোকা সংরক্ষণ ও পরিবেশবান্ধব কৃষি পদ্ধতি সম্প্রসারণ।
🔹 ঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশক সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরি
বিষক্রিয়ার লক্ষণ, জরুরি করণীয় এবং ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক সম্পর্কে কৃষক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি।
🔹 কৃষকের অভিজ্ঞতা ও মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ
মাঠের বাস্তব সমস্যা, বিষক্রিয়ার ঘটনা ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ নথিভুক্ত করে গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের কাছে তুলে ধরা।
🔹 নীতিগত পরিবর্তনের পক্ষে সহায়ক ভূমিকা
গবেষক, কৃষি বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে নিরাপদ বিকল্পের প্রসার এবং কৃষকবান্ধব নীতিমালা বাস্তবায়নে সহায়তা করা।
কৃষক শুধু খাদ্য উৎপাদন করেন না—তারা আমাদের খাদ্য ব্যবস্থার ভিত্তি। তাই তাদের জীবন, স্বাস্থ্য ও মর্যাদা রক্ষা করা মানে আমাদের ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তা রক্ষা করা।
উৎপাদনশীল কৃষি তখনই সত্যিকারের সফল হবে, যখন সেই কৃষি কৃষকের জন্যও নিরাপদ হবে।
নিরাপদ কৃষকই নিরাপদ খাদ্য এবং টেকসই কৃষির সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি।