25/05/2026
বাংলাদেশের অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তার মূল চালিকাশক্তি আমাদের প্রান্তিক কৃষকেরা। অথচ, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO)-এর মতে, কৃষিখাত বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ পেশা হওয়া সত্ত্বেও এ দেশের অনানুষ্ঠানিক কৃষিশ্রমিকেরা এখনো সুনির্দিষ্ট ও প্রাতিষ্ঠানিক 'Occupational Safety and Health (OSH)' কাঠামোর বাইরে রয়ে গেছেন।
এমনকি ২০০১ সালে গৃহীত ILO Convention No. 184 (Safety and Health in Agriculture) অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কৃষকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিতের তাগিদ দিলেও, আমাদের মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র ভিন্ন।
এই প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতা দূর করতে এবং কৃষকদের জন্য একটি নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতেই সামাজিক উদ্যোগ ‘কর্মঢাল’-এর মাঠপর্যায়ের প্রথম যাত্রা শুরু হচ্ছে।
আমরা বিশ্বাস করি—পেশাগত সুরক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি প্রতিটি কৃষকের মৌলিক অধিকার।
মাঠপর্যায়ে কাজের ক্ষেত্রে একজন কৃষককে প্রতিদিন যে সমস্ত বহুমাত্রিক (Multi-layered) ঝুঁকির মুখোমুখি হতে হয়:
১. রাসায়নিক ও বিষাক্ততা (Chemical Hazards): পর্যাপ্ত সুরক্ষা সামগ্রী (PPE) ছাড়া কীটনাশক ব্যবহারের ফলে দীর্ঘমেয়াদি ফুসফুসের জটিলতা, ক্রনিক কিডনি ডিজিজ (CKD) ও স্নায়বিক ক্ষতি।
২. যান্ত্রিক দুর্ঘটনা (Mechanical Hazards): আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি (থ্রেশার, পাওয়ার টিলার) অসচেতনভাবে ব্যবহারের কারণে অঙ্গহানি ও স্থায়ী পঙ্গুত্ব।
৩. শারীরিক ও দীর্ঘস্থায়ী ক্ষয় (Ergonomic Risks): ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাদা-পানিতে একই ভঙ্গিতে ঝুঁকে কাজ করায় মেরুদণ্ড, হাঁটু ও পেশির স্থায়ী বিকলতা।
৪. পরিবেশগত বিপর্যয় (Environmental Risks): জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তীব্র দাবদাহে হিটস্ট্রোক এবং খোলা মাঠে আকস্মিক বজ্রপাতের ঝুঁকি।
৫. জরুরি চিকিৎসার অভাব: মাঠে কাজ করার সময় সাপে কাটা, রক্তপাত বা বিষক্রিয়ার মতো জরুরি মুহূর্তে তাৎক্ষণিক প্রাথমিক চিকিৎসার (First Aid) অনুপস্থিতি।
এই বহুস্তরীয় ঝুঁকিগুলো কেবল ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যহানি ঘটায় না, বরং গ্রামীণ অর্থনীতিতে দারিদ্র্যের চক্র টিকিয়ে রাখে এবং জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG 2: খাদ্য নিরাপত্তা, SDG 3: সুস্বাস্থ্য এবং SDG 8: শোভন কর্মপরিবেশ) অর্জনে বাধা সৃষ্টি করে।
'কর্মঢাল' মাঠপর্যায়ে একটি টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি 'নিরাপত্তা সংস্কৃতি' (Safety Culture) গড়ে তুলতে যে কাজ করবে:
১. আচরণগত পরিবর্তন (BCC Sessions): নিরাপদ কীটনাশক প্রয়োগ, আধুনিক যন্ত্রপাতি পরিচালনা ও দুর্যোগে স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়ে মাঠভিত্তিক প্রশিক্ষণ।
২. সহজলভ্য সেফটি গিয়ার (Safety Gear): কৃষকদের উপযোগী স্বল্পমূল্যের বিশেষ মাস্ক, গ্লাভস, গামবুট ও সুরক্ষা চশমা সরবরাহ।
৩. ফার্স্ট এইড রেসপন্স: সাপে কাটা, হিটস্ট্রোক বা মাঠপর্যায়ের জরুরি দুর্ঘটনায় তাৎক্ষণিক প্রাথমিক চিকিৎসার হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ।
৪. কোলাবোরেটিভ নেটওয়ার্ক: স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তা, তরুণ সমাজ এবং উন্নয়ন খাতের অংশীজনদের সাথে নিয়ে একটি সমন্বিত সাপোর্ট সিস্টেম গঠন।
আমরা এমন একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি, যেখানে শ্রম শুধু উৎপাদনের মাধ্যম হবে না, বরং নিশ্চিত করবে শ্রমিকের মানবিক মর্যাদা ও টেকসই স্বাস্থ্য সুরক্ষা।
আজ কর্মঢাল নিরাপদ কর্মপরিবেশের যে বীজ বপন করছে, তা একদিন সমগ্র অনানুষ্ঠানিক খাতকে সুরক্ষার ছায়ায় আগলে রাখবে। কৃষকের নিরাপদ জীবন ও সামাজিক রূপান্তরের এই যৌথ আন্দোলনে শামিল হোন আপনিও।
"কৃষকের সুরক্ষায় পাশে থাকুন, কর্মঢালের সাথে থাকুন।"
ধন্যবাদ। 🌱