15/04/2026
দক্ষতা: আগামীর পৃথিবীর একমাত্র মুদ্রা?
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
১৫ এপ্রিল, ২০২৬
প্রযুক্তির অভাবনীয় উত্থান আর বিশ্ববাজারের দ্রুত পরিবর্তনের ফলে কর্মসংস্থানের সনাতন সংজ্ঞা বদলে যাচ্ছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে আপনার ডিগ্রির চেয়ে আপনার ‘দক্ষতা’ বা স্কিলই এখন সবচেয়ে বড় সম্পদে পরিণত হয়েছে। ২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে বিশ্লেষকরা বলছেন, আগামী দিনগুলোতে টিকে থাকার লড়াইয়ে যারা নিজেদের দক্ষ করে তুলবেন না, তারা শ্রমবাজার থেকে ছিটকে পড়বেন।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (WEF) এবং ২০২৫ সালের গ্লোবাল স্কিলস রিপোর্টের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্ব এক বিশাল কর্মসংস্থান বিপ্লবের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে প্রায় ১৭ কোটি নতুন কাজের সুযোগ তৈরি হবে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, অটোমেশনের প্রভাবে বিলুপ্ত হয়ে যাবে প্রায় ৯ কোটি ২০ লাখ প্রথাগত চাকরি।
পরিবর্তনের নেপথ্যে মূল চালিকাশক্তি
বিশেষজ্ঞদের মতে, মূলত পাঁচটি কারণে কর্মক্ষেত্রে এই ব্যাপক ওলটপালট ঘটছে। প্রথমত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং রোবোটিক্সের অতি-বিপ্লব। দ্বিতীয়ত, বিশ্ববাজারের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা। এর পাশাপাশি জনতাত্ত্বিক পরিবর্তন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ‘সবুজ’ বা টেকসই চাকরির চাহিদা এবং বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল প্রবেশাধিকার এই পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করছে।
চাহিদার শীর্ষে থাকা দক্ষতাগুলো
গবেষণা বলছে, আগামী কয়েক বছরে আমাদের ৩৯ শতাংশ মৌলিক দক্ষতা পুরোপুরি বদলে যাবে। বর্তমানে যে দক্ষতাগুলো সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হচ্ছে তার শীর্ষে রয়েছে এআই এবং বিগ ডেটা। এটি এখন আর কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, বরং প্রতিটি পেশাজীবীর জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর পরেই রয়েছে সাইবার নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তিগত সাক্ষরতা।
তবে যন্ত্রের এই যুগে মানবিক গুণাবলীর গুরুত্ব কমছে না। বরং সৃজনশীল চিন্তা, জটিল সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, নেতৃত্ব এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে মানিয়ে নেওয়ার মতো মানসিক দক্ষতাগুলোর চাহিদা উত্তরোত্তর বাড়ছে। যারা দ্রুত নতুন কিছু শিখতে পারেন এবং পুরনো ভুল জ্ঞান বর্জন করতে পারেন (Unlearn), কর্মক্ষেত্রে তারাই সবচেয়ে সফল হবেন।
বাংলাদেশের অবস্থান: সংকট ও সম্ভাবনা
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এদেশের ৭০ শতাংশ মানুষের বয়স ৩৫-এর নিচে। এই বিশাল তরুণ সমাজই আমাদের মূল শক্তি। তবে আন্তর্জাতিক দক্ষতা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান এখনো ৯৬তম, যা বেশ উদ্বেগের। বিশেষ করে ডেটা সায়েন্স এবং ব্যবসায়িক সূক্ষ্মতায় আমাদের তরুণরা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় অনেক পিছিয়ে।
তবে সম্ভাবনার দুয়ারও বন্ধ নয়। ফ্রিল্যান্সিং বাজার এবং দেশীয় পোশাক শিল্পে এআই-এর ব্যবহার নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মতো সংস্থাগুলো এখন আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে।
ভবিষ্যৎ প্রস্তুতির রূপরেখা
একজন পেশাজীবীকে ‘ফিউচার-রেডি’ হতে হলে ধাপে ধাপে এগোতে হবে। বিশেষজ্ঞরা তিন মাসের একটি প্রাথমিক মেয়াদে এআই লিটারেসি এবং প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং শেখার পরামর্শ দিচ্ছেন। পরবর্তী তিন থেকে ছয় মাসে পাইথন বা ডেটা অ্যানালাইসিসের মতো প্রযুক্তিগত বিষয়ে দক্ষ হতে হবে। আর এক বছরের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় থাকতে হবে আন্তর্জাতিক মানের পোর্টফোলিও তৈরি এবং গ্রিন স্কিলসের ওপর দখল।
উপসংহার
বিখ্যাত দার্শনিক অ্যালভিন টফলার বলেছিলেন, একবিংশ শতাব্দীর নিরক্ষর তারা নয় যারা পড়তে পারে না, বরং তারা যারা শিখতে এবং পুনরায় শিখতে (Relearn) পারে না। ক্যাশিয়ার বা ডেটা এন্ট্রি ক্লার্কের মতো কাজগুলো যখন ইতিহাসের পাতায় নাম লেখাচ্ছে, তখন এআই বিশেষজ্ঞ বা সাস্টেইনেবিলিটি কনসালট্যান্ট হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার এটাই শ্রেষ্ঠ সময়। ভবিষ্যৎ কারো জন্য অপেক্ষা করবে না, তবে যারা প্রস্তুত হবে, ভবিষ্যৎ তাদেরই হবে।