16/12/2025
প্রশ্নঃ ইয়াহিয়া খান কেন শেখ মুজিবের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেনি?
শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা সংস্থার বেশ বড় একটা ফাইল ইয়াহিয়া খানের কাছে যায়। শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগগুলো ছিল—
১। আগরতলায় গিয়ে ভারতের থেকে অস্ত্র এবং অর্থ সংগ্রহ।
২। ছাত্রলীগের কয়েক হাজার কর্মীকে ভারত থেকে সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে নিয়ে আসা।
৩। সামরিক এবং বেসামরিক বাঙালি আমলাদের নিয়ে ক্যু এর পরিকল্পনা।
৪। ঢাকার ভারতীয় দূতাবাসের সাথে নিয়মিত গোপনে বৈঠক। (২)
সবগুলো অভিযোগই সত্য এবং এত গুরুতর কাজে লিপ্ত থাকার পরও ইয়াহিয়া খান শেখ মুজিবের কথায় বিশ্বাস করেন।
শেখ মুজিব ইয়াহিয়া ও আহসানকে(পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক গর্ভনর) এমনও বলেছিলেন যে তাঁর ছয় দফা কোরআন বা বাইবেল নয় এবং একটি সমঝোতায় পৌছানো খুবই সম্ভব। অধ্যাপক চৌধুরীর সঙ্গে আলোচনা করার সময় শেখ মুজিব দেয়ালে ঝোলানো সোহরাওয়ার্দীর ছবির দিকে তাকিয়ে একদা বলেছিলেন, ‘এই মহান নেতার শিষ্য হয়ে আমি পাকিস্তান ভাঙার কথা কেমন করে ভাবতে পারি?
এ সময় ইয়াহিয়া খান শেখ মুজিবকে পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ঘোষণা করেন।
কিন্তু কিছু দিন পর ইয়াহিয়াকে গোয়েন্দা সংস্থা আরেকটি প্রতিবেদন দেয়। এর সঙ্গে ছিল টেপে ধারণকৃত শেখ মুজিবের কণ্ঠ। সেই টেপে শোনা যায় ভারতীয় দূতাবাসের কর্তাদের মুজিব বলছেন,
❝ আমার লক্ষ্য বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা। নির্বাচন হয়ে গেলে আমি এলএফও ছিঁড়ে টুকরা টুকরা করে ফেলব। নির্বাচনের পর কে আমাকে চ্যালেঞ্জ করবে?❞
ইয়াহিয়া মুজিবের কণ্ঠস্বর শনাক্ত করতে পারলেন। বক্তব্যের সারমর্ম শুনে তিনি হতবুদ্ধি হয়ে পড়েন । পরদিন সকালে অধ্যাপক চৌধুরী তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলে ইয়াহিয়া বলেন, ‘মুজিব যদি বেইমানি করে, আমি তাকে দেখে নেব। (৫)
১৯৭১ সালে মার্চের শুরু থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে অবাঙালিদের আবাসিক এবং ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানে আক্রমণ শুরু হয়। ক্যান্টনমেন্টগুলোতে খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া শুরু করে, নতুন পতাকা উত্তোলন করে, নতুন সংগীত বাজাতে থাকে। শেখ মুজিব নিজেও তার ভারত থেকে প্রশিক্ষিত বাহীনির কুজকাওয়াজ গ্রহন করে এবং নিজের গাড়িতে নতুন পতাকা লাগান।
সর্বশেষ, সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থা জানতে পারে আওয়ামী লীগ ২৬ মার্চ প্রত্যুষে গোটা পূর্ব পাকিস্তানে ভারতের সহায়তায় একটি সশস্ত্র অভ্যুত্থান ঘটাতে যাচ্ছে। সশস্ত্র অভ্যুত্থান অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের নির্ধারিত সময়ের কয়েক ঘণ্টা আগে ২৫ মার্চ গভীর রাতে সেনাবাহিনীর ইউনিটগুলো ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে বের হয়ে আসে, প্রথমে শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করে এবং কয়েক ঘণ্টার মধ্যে প্রাদেশিক রাজধানীতে আওয়ামী লীগের অভ্যুত্থান নস্যাতে বেশ কয়েকটি জায়গায় আগে ভাগে আঘাত হানে। (৬)
*
প্রশ্নঃ ২৫ মার্চ কালো রাতে পাকিস্তানী আর্মি কেন হামলা চালিয়েছিল?
উত্তরঃ ১৯৭১ সালের ২ মার্চ আওয়ামী লীগের ক্যাডারেরা নিউমার্কেট ও বায়তুল মোকাররমের অস্ত্র দোকানগুলো থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট করে। তারা এসব অস্ত্র ট্রাকে করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিয়ে যায়। সেখানে ছাত্ররা একটি উন্মুক্ত ফায়ারিং রেঞ্জে অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। তারা অবাঙালিদের মালিকানাধীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, দোকানপাট ও সিনেমা হল লুট করতো।
এছাড়া তারা ঢাকা শহরে বিহারি, গুজরাটি, মনিপুরী, আসামি সহ সব অবাঙালিদের আবাসিক এলাকায় হামলা করে। মুক্তিপণ আদায়ে ধনী পশ্চিম পাকিস্তানিদের অপহরণ করা হয়। ফলে আতঙ্কিত বহু অবাঙালি সেনানিবাসে আশ্রয় গ্রহন করে।
৩ মার্চ পল্টন ময়দানে এক সমাবেশে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাজাহান সিরাজ ‘স্বাধীনতার ইশতেহার' পাঠ করেন। অনুষ্ঠানে স্বাধীনতার পক্ষে চার ছাত্র নেতা নূরে আলম সিদ্দিকী, শাজাহান সিরাজ, আ স ম আবদুর রব এবং আবদুল কুদ্দুস মাখন শপথ বাক্য পাঠ শেষে ‘জয়বাংলা বাহিনী'র উপ-প্রধান (ডেপুটি চীফ) কামরুল আলম খান খসরু আনুষ্ঠানিকভাবে ‘গান ফায়ার’ করে সশস্ত্র যুদ্ধের ঘোষণা জানান।
একই দিনে ৩ মার্চ আওয়ামী লীগের সশস্ত্র কর্মীদের নেতৃত্বে উন্মত্ত জনতা ঢাকার নবাবপুর, ইসলামপুর ও পাটুয়াটুলির মতো জায়গায় হাজার হাজার অবাঙালির বাড়িঘরে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও হত্যাকাণ্ড চালায়। জিন্নাহ এভিনিউতে অবাঙালি মালিকানাধীন বহু দোকানপাট লুট করা হয়। শহরের উপকণ্ঠে একটি বস্তিতে অবাঙালিদের ৫০টি ঘর পুড়িয়ে দেয়া হয় এবং তাদের অনেকে জীবন্ত দগ্ধ হয়। আওয়ামী লীগ হাইকমান্ডের নির্দেশে ঢাকায় টেলিভিশন ও রেডিও স্টেশনে পাকিস্তানের জাতীয় সঙ্গীতের পরিবর্তে রবীন্দ্রনাথের পূর্ব বাংলা বিরোধী গান ‘আমার সোনার বাংলা' বাজানো হয়।
৬ মার্চ ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগার ভেঙ্গে ৩৪১জন কয়েদী পালিয়ে গিয়ে আওয়ামী লীগের ক্যাডারদের সঙ্গে যোগ দেয়। ককটেল এবং বোমা তৈরির উদ্দেশ্যে ছাত্র লীগের সশস্ত্র ক্যাডাররা ঢাকার সায়েন্স ল্যাবরেটরী ও পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট থেকে রাসায়নিক বিস্ফোরক লুট করে।
১৬ থেকে ২৩ মার্চ জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানের আড়ম্বরপূর্ণ শাসনতান্ত্রিক আলোচনার সময়ও আওয়ামী লীগ তাদের সমান্তরাল সরকারের কার্যক্রম অব্যাহত রাখে এবং ঢাকা ও তার আশপাশের কয়েকটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে দলীয় ক্যাডারদের প্রকাশ্যে প্রশিক্ষণ দেয়। অবাঙালিদের বাড়িঘরে হামলার ঘটনা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়।
একদল দাঙ্গাবাজ ক্যাডার ঢাকায় সেনাবাহিনীর একটি জীপে হামলা চালায় এবং জীপের আরোহী ৬ সৈন্যকে অপহরণ করে। শহরে পুলিশের অস্ত্রাগার থেকে অস্ত্র লুট করা হয়। ঢাকা সেনানিবাসে পাকিস্তানি সৈন্যদের কাছে খাদ্য সরবরাহের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
২২ মার্চ ঢাকা স্টেডিয়ামের পাশে অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্যদের নিয়ে সশস্ত্র সমাবেশ করেন এমএজি ওসমানী। সেখানে একটি প্ল্যাকার্ডে লেখা 'অনেক রক্ত দিয়েছি এবার শোধ নেব।'
২৩ মার্চ চীনা কন্স্যুলেটে লীগের বানানো নতুন পতাকা উত্তোলন করতে গেলে লীগের সঙ্গে তাদের বিরোধ বাধে। চীনারা তাদেরকে এ পতাকা উত্তোলনে বাধা দেয়। আওয়ামী লীগের বিক্ষোভকারীরা বহু স্থানে পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা টুকরো টুকরো করে এবং পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি পায়ের নিচে পিষ্ট করে। ইপিআর ও আনসার বাহিনীর সদস্যরা সপক্ষ ত্যাগ করায় আওয়ামী লীগের ক্যাডারদের শক্তি বৃদ্ধি পায়।
পুরো প্রদেশ সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়৷ ঢাকার বাইরে পরিস্থিতি ছিল আরো ভয়াবহ। নির্বাচনের আগে থেকেই সারা দেশে আওয়ামী লীগের সশস্ত্র কার্যক্রম শুরু হয়। ফটিকছড়িতে নাজিরহাট কলেজের নিউক্লিয়াস কমান্ডার আনোয়ারুল আজিম ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের নিয়ে যুদ্ধের জন্য সশস্ত্র প্রশিক্ষণ শুর করে।
কুষ্টিয়াতে আওয়ামী লীগের ক্যাডারেরা একজন লাহোরের অধিবাসী সরকারি কর্মকর্তা ওয়াকার নাসিম বাটের মাথা কেটে, কাটা মাথা নিয়ে আনন্দ মিছিল করে (ছবিতে)।
খুলনা, চট্রগ্রাম, ময়মনসিংহসহ সারা দেশে বিহারিদের উপর হত্যাযজ্ঞ চলে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে এর ভয়াবহতা ছিল সবচেয়ে বেশি। পাবনা, সিরাজগঞ্জ, রাজশাহী, সৈয়দপুরে হাজার হাজার বিহারিকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। ২৬ই মার্চ বগুড়ার সান্তাহারে মসজিদে আশ্রয় নেয়া ৭০ জন বিহারী মুসলিম নারীকে মসজিদেই ধর্ষন করে মুক্তিযোদ্ধারা!