04/10/2026
মহাভারতের আড়ালে: প্রচলিত কাহিনি, পাঠের ইতিহাস ও নীরবতার রাজনীতি
পৌরাণিক আখ্যানের পুনর্পাঠ ও কয়েকটি জরুরি প্রশ্ন
লেখক: টিটপ হালদার
মহাভারতকে আমরা সাধারণত ধর্ম, যুদ্ধ, বীরত্ব, কর্তব্য ও ন্যায়-অন্যায়ের মহাকাব্য হিসেবে পাঠ করি। কিন্তু এই মহাকাব্যকে শুধু দেবত্বের আলোয় বিচার করলে তার অন্তর্গত সামাজিক দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক কৌশল, ক্ষমতার সম্পর্ক এবং মানুষের নৈতিক সংকটের বহু দিক আড়ালে থেকে যায়।
মহাভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—এখানে ন্যায় ও অন্যায় সব সময় সরল, বিপরীতমুখী দুটি অবস্থান নয়। যুধিষ্ঠিরের সত্যনিষ্ঠা, কর্ণের বন্ধুত্ব, ভীষ্মের প্রতিজ্ঞা, দ্রোণের কর্তব্যবোধ কিংবা কৃষ্ণের যুদ্ধকৌশল—প্রতিটি ক্ষেত্রেই নৈতিকতার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে ক্ষমতা, আনুগত্য, সামাজিক মর্যাদা ও রাজনৈতিক বাস্তবতা।
কিন্তু এই আলোচনার আগে একটি মৌলিক প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন: আজ আমরা যে মহাভারত পড়ি, তার সব কাহিনি কি একই সময়ে রচিত? বহুল প্রচলিত প্রতিটি ঘটনা কি মহাভারতের প্রাচীনতম পুনর্গঠিত পাঠে পাওয়া যায়?
১. মহাভারত কি একক সময়ের রচনা?
মহাভারতকে বুঝতে হলে প্রথমেই তার পাঠ-ইতিহাস সম্পর্কে সচেতন হওয়া দরকার। এটি দীর্ঘকাল ধরে মৌখিক পরিবেশন, রচনা, সংকলন ও পাণ্ডুলিপি-পরম্পরার মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়েছে বলে গবেষকেরা মনে করেন। বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত পাঠের মধ্যে পার্থক্যও রয়েছে।
পুনের ভাণ্ডারকর ওরিয়েন্টাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট প্রায় পাঁচ দশকের গবেষণায় ১,২৫৯টি পাণ্ডুলিপি পর্যালোচনা করে মহাভারতের একটি সমালোচনামূলক সংস্করণ প্রস্তুত করে। ১৯৬৬ সালে এই প্রকল্প সম্পূর্ণ হয়। এই সংস্করণের উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন পাণ্ডুলিপির তুলনামূলক বিচার করে প্রাচীনতর পাঠের একটি গবেষণাভিত্তিক পুনর্গঠন করা।
তবে সমালোচনামূলক সংস্করণকে মহাভারতের একেবারে আদিম বা লেখকের নিজস্ব মূল পাণ্ডুলিপি বলে ধরে নেওয়া যায় না। এটি পাণ্ডুলিপি-তুলনার মাধ্যমে নির্মিত একটি বিদ্বৎসম্মত পাঠ। এর বাইরে থাকা কোনো কাহিনি লোকস্মৃতি, আঞ্চলিক ঐতিহ্য বা পরবর্তী সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
অতএব, কোনো কাহিনি সমালোচনামূলক সংস্করণে নেই—এই তথ্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি শুধু সেই অনুপস্থিতির ভিত্তিতে কাহিনিটিকে অর্থহীন বা সাংস্কৃতিকভাবে অপ্রাসঙ্গিক বলাও যুক্তিসংগত নয়।
২. বর্বরিক: মহাভারতের প্রান্তে থাকা এক জনপ্রিয় চরিত্র
বর্বরিকের কাহিনি আজ ভারতীয় লোকবিশ্বাসে বিশেষ পরিচিত। প্রচলিত আখ্যান অনুসারে, তিনি ভীমের পৌত্র, ঘটোৎকচের পুত্র এবং তিনটি অলৌকিক তিরের অধিকারী। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে দুর্বল পক্ষের হয়ে লড়াই করার প্রতিজ্ঞা তাঁর কাহিনির কেন্দ্রীয় উপাদান।
এই প্রতিজ্ঞার মধ্যে একটি গভীর নৈতিক সমস্যা রয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে যে পক্ষ দুর্বল হবে, বর্বরিক তার পক্ষ নিলে যুদ্ধের ভারসাম্য বদলে যেতে পারে; আবার সেই পরিবর্তনের ফলে অন্য পক্ষ দুর্বল হয়ে পড়লে তাঁর প্রতিজ্ঞা তাঁকে পুনরায় পক্ষ পরিবর্তনের দিকে ঠেলে দিতে পারে। পরবর্তী কাহিনিতে কৃষ্ণের কাছে তাঁর আত্মত্যাগের ঘটনাও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
কিন্তু গবেষণার প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ: বর্বরিক কি মহাভারতের প্রাচীনতর পাঠের চরিত্র, নাকি পরবর্তী পুরাণ ও লোকপরম্পরায় বিকশিত এক জনপ্রিয় মহাকাব্যিক ব্যক্তিত্ব?
ভাণ্ডারকর প্রতিষ্ঠানের সমালোচনামূলক সংস্করণে বর্বরিকের পরিচিত কাহিনি পাওয়া যায় না; তাঁর আখ্যান স্কন্দপুরাণ ও লোকপ্রচলনে বিশেষভাবে পরিচিত। ২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রেও বর্বরিকের এই পাঠগত অনুপস্থিতি এবং লোকধর্মে তাঁর গুরুত্ব আলোচনা করা হয়েছে।
এখানে বর্বরিককে নিয়ে গবেষণার দুটি পৃথক ক্ষেত্র তৈরি হয়: একদিকে মহাভারতের পাঠ-ইতিহাস, অন্যদিকে লোকধর্ম ও সাংস্কৃতিক স্মৃতির ইতিহাস। একটি কাহিনি মূল মহাকাব্যের নির্দিষ্ট পাঠে অনুপস্থিত হলেও সমাজের ধর্মীয় কল্পনা ও নৈতিক চিন্তায় কীভাবে প্রতিষ্ঠা পায়, সেটিও গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
৩. কর্ণ: জন্মপরিচয়, সামাজিক মর্যাদা ও আনুগত্যের সংকট
কর্ণের কাহিনি মহাভারতের অন্যতম জটিল মানবিক আখ্যান। কুন্তীর গর্ভে তাঁর জন্ম, জন্মের পর পরিত্যক্ত হওয়া, অধিরথ ও রাধার কাছে বেড়ে ওঠা এবং পরবর্তীকালে দুর্যোধনের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব—এই ঘটনাগুলো তাঁর চরিত্র নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
কর্ণের জীবনে ব্যক্তিগত যোগ্যতা ও সামাজিক স্বীকৃতির মধ্যে সংঘাত বারবার ফিরে আসে। তিনি অসাধারণ যোদ্ধা, কিন্তু তাঁর জন্মপরিচয় নিয়ে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে অপমান ও অবিশ্বাসের মুখোমুখি করে। দুর্যোধন তাঁকে অঙ্গদেশের রাজা করে সম্মান দেন। সেই সম্মান ও বন্ধুত্বের প্রতি আনুগত্য কর্ণকে এমন এক রাজনৈতিক অবস্থানে স্থাপন করে, যেখানে নিজের জন্মপরিচয় জানার পরও তিনি পাণ্ডবদের পক্ষ গ্রহণ করেন না।
এই কাহিনিকে শুধু দানবীরের মহিমা কিংবা দুর্ভাগ্যগ্রস্ত বীরের ট্র্যাজেডি হিসেবে পড়লে তার সামাজিক মাত্রাটি আড়ালে থেকে যায়। প্রশ্ন তোলা যায়—মানুষের যোগ্যতা বিচার করার ক্ষেত্রে জন্মপরিচয় কতটা প্রভাব বিস্তার করে? সামাজিক স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত একজন মানুষ যখন ক্ষমতাবান ব্যক্তির কাছ থেকে সম্মান পান, তখন সেই সম্মানের প্রতি তাঁর আনুগত্য কি তাঁকে নৈতিক সংকটে ফেলতে পারে?
তবে কর্ণের কাহিনিকে আধুনিক জাতপাত বা শ্রেণিব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি এক করে দেখা উচিত নয়। প্রাচীন সমাজের কাঠামো ও আধুনিক সামাজিক বাস্তবতা এক নয়। বরং পাঠের নির্দিষ্ট ঘটনা, চরিত্রের বক্তব্য এবং আখ্যানের পরিণতি বিচার করে এই তুলনা সতর্কতার সঙ্গে করা প্রয়োজন।
৪. একলব্য: প্রতিভা, শিক্ষা ও কর্তৃত্বের প্রশ্ন
একলব্যের কাহিনি ভারতীয় মহাকাব্যিক ঐতিহ্যে শিক্ষার অধিকার ও সামাজিক বৈষম্য নিয়ে আলোচনার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। দ্রোণাচার্যের কাছে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর একলব্য নিজে নিজে ধনুর্বিদ্যা অনুশীলন করেন। পরে তাঁর দক্ষতা দেখে দ্রোণ তাঁর ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ গুরুদক্ষিণা হিসেবে চান।
এই ঘটনাকে ঘিরে দুটি বিপরীত পাঠ সম্ভব। প্রচলিত ভক্তিমূলক ব্যাখ্যায় একলব্যের আত্মত্যাগকে গুরুভক্তির দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরা হয়। অন্যদিকে সমালোচনামূলক পাঠে প্রশ্ন ওঠে—জ্ঞান ও শিক্ষার ওপর কার অধিকার থাকবে? একজন প্রতিভাবান শিক্ষার্থীকে কেন নিজের অর্জিত দক্ষতার এমন মূল্য দিতে হবে?
এখানে গবেষণার উদ্দেশ্য কোনো চরিত্রকে একমাত্রিকভাবে অপরাধী বা নায়ক ঘোষণা করা নয়। বরং আখ্যানের ক্ষমতার সম্পর্ক, শিক্ষকের কর্তৃত্ব, শিষ্যের অবস্থান এবং অর্জিত জ্ঞানকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রশ্নগুলো বিশ্লেষণ করা।
মহাভারতের মতো বহুমাত্রিক আখ্যানের তাৎপর্য এখানেই—একই ঘটনা ভক্তি, কর্তব্য, সামাজিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ভিন্ন প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারে।
৫. কৃষ্ণের কূটনীতি: নৈতিকতা ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সংঘাত
মহাভারতে কৃষ্ণের ভূমিকা শুধু ধর্মীয় বা অলৌকিক চরিত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি শান্তি প্রতিষ্ঠার দূত, রাজনৈতিক পরামর্শদাতা, কৌশলবিদ এবং যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জুনের সারথি।
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের আগে তাঁর শান্তিপ্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। যুদ্ধ শুরু হলে বিভিন্ন সংকটময় মুহূর্তে তিনি পাণ্ডবদের কৌশলগত পরামর্শ দেন। ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ ও দুর্যোধনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ে দেখা যায়—যুদ্ধের নিয়ম, ন্যায়ের দাবি এবং বিজয়ের বাস্তব প্রয়োজন সব সময় পরস্পরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এই পরিস্থিতি একটি মৌলিক রাজনৈতিক প্রশ্ন সামনে আনে: ন্যায় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য অর্জনের জন্য কৌশলগত নিয়ম ভাঙা কি গ্রহণযোগ্য হতে পারে?
এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে আমরা কোন নৈতিক মানদণ্ড গ্রহণ করছি, তার ওপর। ফলাফলকেন্দ্রিক বিচার এক ধরনের উত্তর দিতে পারে; কর্তব্য ও নিয়মকেন্দ্রিক বিচার দিতে পারে অন্য উত্তর। মহাভারতের ঘটনাগুলোকে এই দুই দৃষ্টিকোণ থেকে পড়লে কৃষ্ণের কূটনীতি এবং পাণ্ডবদের বিজয়ের নৈতিক মূল্য নিয়ে গভীর আলোচনা সম্ভব হয়।
তবে কৃষ্ণের সব কৌশলকে আধুনিক রাজনৈতিক নীতির সরল উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। আখ্যানের ধর্ম, যুদ্ধনীতি ও রাজনীতির ধারণাগুলো তাদের নিজস্ব ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক প্রেক্ষাপটে বিচার করা জরুরি।
উপসংহার: মহাভারতকে প্রশ্ন করা মানে তার গুরুত্ব অস্বীকার করা নয়
মহাভারতের প্রতি প্রকৃত মনোযোগ কেবল তার কাহিনি মুখস্থ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। এর পাঠ-ইতিহাস, বিভিন্ন সংস্করণ, চরিত্রের নৈতিক দ্বন্দ্ব, সামাজিক ক্ষমতার সম্পর্ক এবং পরবর্তী লোকপরম্পরায় কাহিনির পরিবর্তন—সবই আলোচনার বিষয়।
বর্বরিকের কাহিনি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মূল মহাকাব্যের বাইরে থেকেও কোনো চরিত্র লোকস্মৃতিতে প্রতিষ্ঠা পেতে পারে। কর্ণের জীবন জন্মপরিচয় ও আনুগত্যের দ্বন্দ্ব সামনে আনে। একলব্যের ঘটনা শিক্ষার অধিকার ও কর্তৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলে। কৃষ্ণের কূটনীতি ন্যায় ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সম্পর্ককে জটিল করে তোলে।
গবেষণামূলক পাঠের কাজ হলো এসব প্রশ্নের উত্তর আগে থেকে নির্ধারণ করে দেওয়া নয়; বরং পাঠ, প্রমাণ, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং যুক্তির ভিত্তিতে প্রশ্নগুলোকে স্পষ্ট করা।
মহাভারতকে নতুন করে পড়ার অর্থ তাই শুধু তার অজানা কাহিনি আবিষ্কার করা নয়—বরং পরিচিত কাহিনিগুলোকেও নতুন প্রশ্নের সামনে দাঁড় করানো।
— টিটপ হালদার
তথ্যসূত্র ও আরও পাঠ:
১. Bhandarkar Oriental Research Institute (BORI), The Critical Edition of the Mahabharata—পাণ্ডুলিপিভিত্তিক সমালোচনামূলক সংস্করণের পরিচিতি।
২. The Mahābhārata: Electronic Text of the Critical Edition—সংস্কৃত পাঠের অনলাইন সংগ্রহ।
৩. Pratap Roy, “Barbarik: The Muse of the Subaltern and the Marginal to the Mahābhārata,” Anusandhanvallari, ২০২৪।
৪. The Mahabharata Atlas, “Not in the Text”—সমালোচনামূলক সংস্করণে অনুপস্থিত কিন্তু পরবর্তী ঐতিহ্যে প্রচলিত কাহিনির তুলনামূলক আলোচনা।