Titop Halder

Call Contact the business

Titop Halder Contact information, map and directions, contact form, opening hours, services, ratings, photos, videos and announcements from Titop Halder, Gopalganj.

যে আপনাকে হিংসে করে, সে আসলে আপনার ছায়াটাকেই অনুসরণ করে। আপনার চলন, আপনার ভাষা, আপনার পথ—সবকিছুর মধ্যেই সে নিজের অজান্তে আপনাকে খুঁজে ফেরে। কারণ, তার চোখে আপনি সেই উচ্চতায়, যেখানে সে পৌঁছাতে চায়; অথচ মেনে নিতে পারে না।
— টিটপ হালদার

মহাভারতের আড়ালে: প্রচলিত কাহিনি, পাঠের ইতিহাস ও নীরবতার রাজনীতিপৌরাণিক আখ্যানের পুনর্পাঠ ও কয়েকটি জরুরি প্রশ্নলেখক: টি...
04/10/2026

মহাভারতের আড়ালে: প্রচলিত কাহিনি, পাঠের ইতিহাস ও নীরবতার রাজনীতি

পৌরাণিক আখ্যানের পুনর্পাঠ ও কয়েকটি জরুরি প্রশ্ন

লেখক: টিটপ হালদার

মহাভারতকে আমরা সাধারণত ধর্ম, যুদ্ধ, বীরত্ব, কর্তব্য ও ন্যায়-অন্যায়ের মহাকাব্য হিসেবে পাঠ করি। কিন্তু এই মহাকাব্যকে শুধু দেবত্বের আলোয় বিচার করলে তার অন্তর্গত সামাজিক দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক কৌশল, ক্ষমতার সম্পর্ক এবং মানুষের নৈতিক সংকটের বহু দিক আড়ালে থেকে যায়।

মহাভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—এখানে ন্যায় ও অন্যায় সব সময় সরল, বিপরীতমুখী দুটি অবস্থান নয়। যুধিষ্ঠিরের সত্যনিষ্ঠা, কর্ণের বন্ধুত্ব, ভীষ্মের প্রতিজ্ঞা, দ্রোণের কর্তব্যবোধ কিংবা কৃষ্ণের যুদ্ধকৌশল—প্রতিটি ক্ষেত্রেই নৈতিকতার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে ক্ষমতা, আনুগত্য, সামাজিক মর্যাদা ও রাজনৈতিক বাস্তবতা।

কিন্তু এই আলোচনার আগে একটি মৌলিক প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন: আজ আমরা যে মহাভারত পড়ি, তার সব কাহিনি কি একই সময়ে রচিত? বহুল প্রচলিত প্রতিটি ঘটনা কি মহাভারতের প্রাচীনতম পুনর্গঠিত পাঠে পাওয়া যায়?

১. মহাভারত কি একক সময়ের রচনা?

মহাভারতকে বুঝতে হলে প্রথমেই তার পাঠ-ইতিহাস সম্পর্কে সচেতন হওয়া দরকার। এটি দীর্ঘকাল ধরে মৌখিক পরিবেশন, রচনা, সংকলন ও পাণ্ডুলিপি-পরম্পরার মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়েছে বলে গবেষকেরা মনে করেন। বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত পাঠের মধ্যে পার্থক্যও রয়েছে।

পুনের ভাণ্ডারকর ওরিয়েন্টাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট প্রায় পাঁচ দশকের গবেষণায় ১,২৫৯টি পাণ্ডুলিপি পর্যালোচনা করে মহাভারতের একটি সমালোচনামূলক সংস্করণ প্রস্তুত করে। ১৯৬৬ সালে এই প্রকল্প সম্পূর্ণ হয়। এই সংস্করণের উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন পাণ্ডুলিপির তুলনামূলক বিচার করে প্রাচীনতর পাঠের একটি গবেষণাভিত্তিক পুনর্গঠন করা।

তবে সমালোচনামূলক সংস্করণকে মহাভারতের একেবারে আদিম বা লেখকের নিজস্ব মূল পাণ্ডুলিপি বলে ধরে নেওয়া যায় না। এটি পাণ্ডুলিপি-তুলনার মাধ্যমে নির্মিত একটি বিদ্বৎসম্মত পাঠ। এর বাইরে থাকা কোনো কাহিনি লোকস্মৃতি, আঞ্চলিক ঐতিহ্য বা পরবর্তী সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

অতএব, কোনো কাহিনি সমালোচনামূলক সংস্করণে নেই—এই তথ্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি শুধু সেই অনুপস্থিতির ভিত্তিতে কাহিনিটিকে অর্থহীন বা সাংস্কৃতিকভাবে অপ্রাসঙ্গিক বলাও যুক্তিসংগত নয়।

২. বর্বরিক: মহাভারতের প্রান্তে থাকা এক জনপ্রিয় চরিত্র

বর্বরিকের কাহিনি আজ ভারতীয় লোকবিশ্বাসে বিশেষ পরিচিত। প্রচলিত আখ্যান অনুসারে, তিনি ভীমের পৌত্র, ঘটোৎকচের পুত্র এবং তিনটি অলৌকিক তিরের অধিকারী। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে দুর্বল পক্ষের হয়ে লড়াই করার প্রতিজ্ঞা তাঁর কাহিনির কেন্দ্রীয় উপাদান।

এই প্রতিজ্ঞার মধ্যে একটি গভীর নৈতিক সমস্যা রয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে যে পক্ষ দুর্বল হবে, বর্বরিক তার পক্ষ নিলে যুদ্ধের ভারসাম্য বদলে যেতে পারে; আবার সেই পরিবর্তনের ফলে অন্য পক্ষ দুর্বল হয়ে পড়লে তাঁর প্রতিজ্ঞা তাঁকে পুনরায় পক্ষ পরিবর্তনের দিকে ঠেলে দিতে পারে। পরবর্তী কাহিনিতে কৃষ্ণের কাছে তাঁর আত্মত্যাগের ঘটনাও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

কিন্তু গবেষণার প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ: বর্বরিক কি মহাভারতের প্রাচীনতর পাঠের চরিত্র, নাকি পরবর্তী পুরাণ ও লোকপরম্পরায় বিকশিত এক জনপ্রিয় মহাকাব্যিক ব্যক্তিত্ব?

ভাণ্ডারকর প্রতিষ্ঠানের সমালোচনামূলক সংস্করণে বর্বরিকের পরিচিত কাহিনি পাওয়া যায় না; তাঁর আখ্যান স্কন্দপুরাণ ও লোকপ্রচলনে বিশেষভাবে পরিচিত। ২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রেও বর্বরিকের এই পাঠগত অনুপস্থিতি এবং লোকধর্মে তাঁর গুরুত্ব আলোচনা করা হয়েছে।

এখানে বর্বরিককে নিয়ে গবেষণার দুটি পৃথক ক্ষেত্র তৈরি হয়: একদিকে মহাভারতের পাঠ-ইতিহাস, অন্যদিকে লোকধর্ম ও সাংস্কৃতিক স্মৃতির ইতিহাস। একটি কাহিনি মূল মহাকাব্যের নির্দিষ্ট পাঠে অনুপস্থিত হলেও সমাজের ধর্মীয় কল্পনা ও নৈতিক চিন্তায় কীভাবে প্রতিষ্ঠা পায়, সেটিও গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

৩. কর্ণ: জন্মপরিচয়, সামাজিক মর্যাদা ও আনুগত্যের সংকট

কর্ণের কাহিনি মহাভারতের অন্যতম জটিল মানবিক আখ্যান। কুন্তীর গর্ভে তাঁর জন্ম, জন্মের পর পরিত্যক্ত হওয়া, অধিরথ ও রাধার কাছে বেড়ে ওঠা এবং পরবর্তীকালে দুর্যোধনের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব—এই ঘটনাগুলো তাঁর চরিত্র নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

কর্ণের জীবনে ব্যক্তিগত যোগ্যতা ও সামাজিক স্বীকৃতির মধ্যে সংঘাত বারবার ফিরে আসে। তিনি অসাধারণ যোদ্ধা, কিন্তু তাঁর জন্মপরিচয় নিয়ে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে অপমান ও অবিশ্বাসের মুখোমুখি করে। দুর্যোধন তাঁকে অঙ্গদেশের রাজা করে সম্মান দেন। সেই সম্মান ও বন্ধুত্বের প্রতি আনুগত্য কর্ণকে এমন এক রাজনৈতিক অবস্থানে স্থাপন করে, যেখানে নিজের জন্মপরিচয় জানার পরও তিনি পাণ্ডবদের পক্ষ গ্রহণ করেন না।

এই কাহিনিকে শুধু দানবীরের মহিমা কিংবা দুর্ভাগ্যগ্রস্ত বীরের ট্র্যাজেডি হিসেবে পড়লে তার সামাজিক মাত্রাটি আড়ালে থেকে যায়। প্রশ্ন তোলা যায়—মানুষের যোগ্যতা বিচার করার ক্ষেত্রে জন্মপরিচয় কতটা প্রভাব বিস্তার করে? সামাজিক স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত একজন মানুষ যখন ক্ষমতাবান ব্যক্তির কাছ থেকে সম্মান পান, তখন সেই সম্মানের প্রতি তাঁর আনুগত্য কি তাঁকে নৈতিক সংকটে ফেলতে পারে?

তবে কর্ণের কাহিনিকে আধুনিক জাতপাত বা শ্রেণিব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি এক করে দেখা উচিত নয়। প্রাচীন সমাজের কাঠামো ও আধুনিক সামাজিক বাস্তবতা এক নয়। বরং পাঠের নির্দিষ্ট ঘটনা, চরিত্রের বক্তব্য এবং আখ্যানের পরিণতি বিচার করে এই তুলনা সতর্কতার সঙ্গে করা প্রয়োজন।

৪. একলব্য: প্রতিভা, শিক্ষা ও কর্তৃত্বের প্রশ্ন

একলব্যের কাহিনি ভারতীয় মহাকাব্যিক ঐতিহ্যে শিক্ষার অধিকার ও সামাজিক বৈষম্য নিয়ে আলোচনার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। দ্রোণাচার্যের কাছে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর একলব্য নিজে নিজে ধনুর্বিদ্যা অনুশীলন করেন। পরে তাঁর দক্ষতা দেখে দ্রোণ তাঁর ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ গুরুদক্ষিণা হিসেবে চান।

এই ঘটনাকে ঘিরে দুটি বিপরীত পাঠ সম্ভব। প্রচলিত ভক্তিমূলক ব্যাখ্যায় একলব্যের আত্মত্যাগকে গুরুভক্তির দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরা হয়। অন্যদিকে সমালোচনামূলক পাঠে প্রশ্ন ওঠে—জ্ঞান ও শিক্ষার ওপর কার অধিকার থাকবে? একজন প্রতিভাবান শিক্ষার্থীকে কেন নিজের অর্জিত দক্ষতার এমন মূল্য দিতে হবে?

এখানে গবেষণার উদ্দেশ্য কোনো চরিত্রকে একমাত্রিকভাবে অপরাধী বা নায়ক ঘোষণা করা নয়। বরং আখ্যানের ক্ষমতার সম্পর্ক, শিক্ষকের কর্তৃত্ব, শিষ্যের অবস্থান এবং অর্জিত জ্ঞানকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রশ্নগুলো বিশ্লেষণ করা।

মহাভারতের মতো বহুমাত্রিক আখ্যানের তাৎপর্য এখানেই—একই ঘটনা ভক্তি, কর্তব্য, সামাজিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ভিন্ন প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারে।

৫. কৃষ্ণের কূটনীতি: নৈতিকতা ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সংঘাত

মহাভারতে কৃষ্ণের ভূমিকা শুধু ধর্মীয় বা অলৌকিক চরিত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি শান্তি প্রতিষ্ঠার দূত, রাজনৈতিক পরামর্শদাতা, কৌশলবিদ এবং যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জুনের সারথি।

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের আগে তাঁর শান্তিপ্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। যুদ্ধ শুরু হলে বিভিন্ন সংকটময় মুহূর্তে তিনি পাণ্ডবদের কৌশলগত পরামর্শ দেন। ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ ও দুর্যোধনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ে দেখা যায়—যুদ্ধের নিয়ম, ন্যায়ের দাবি এবং বিজয়ের বাস্তব প্রয়োজন সব সময় পরস্পরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

এই পরিস্থিতি একটি মৌলিক রাজনৈতিক প্রশ্ন সামনে আনে: ন্যায় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য অর্জনের জন্য কৌশলগত নিয়ম ভাঙা কি গ্রহণযোগ্য হতে পারে?

এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে আমরা কোন নৈতিক মানদণ্ড গ্রহণ করছি, তার ওপর। ফলাফলকেন্দ্রিক বিচার এক ধরনের উত্তর দিতে পারে; কর্তব্য ও নিয়মকেন্দ্রিক বিচার দিতে পারে অন্য উত্তর। মহাভারতের ঘটনাগুলোকে এই দুই দৃষ্টিকোণ থেকে পড়লে কৃষ্ণের কূটনীতি এবং পাণ্ডবদের বিজয়ের নৈতিক মূল্য নিয়ে গভীর আলোচনা সম্ভব হয়।

তবে কৃষ্ণের সব কৌশলকে আধুনিক রাজনৈতিক নীতির সরল উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। আখ্যানের ধর্ম, যুদ্ধনীতি ও রাজনীতির ধারণাগুলো তাদের নিজস্ব ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক প্রেক্ষাপটে বিচার করা জরুরি।

উপসংহার: মহাভারতকে প্রশ্ন করা মানে তার গুরুত্ব অস্বীকার করা নয়

মহাভারতের প্রতি প্রকৃত মনোযোগ কেবল তার কাহিনি মুখস্থ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। এর পাঠ-ইতিহাস, বিভিন্ন সংস্করণ, চরিত্রের নৈতিক দ্বন্দ্ব, সামাজিক ক্ষমতার সম্পর্ক এবং পরবর্তী লোকপরম্পরায় কাহিনির পরিবর্তন—সবই আলোচনার বিষয়।

বর্বরিকের কাহিনি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মূল মহাকাব্যের বাইরে থেকেও কোনো চরিত্র লোকস্মৃতিতে প্রতিষ্ঠা পেতে পারে। কর্ণের জীবন জন্মপরিচয় ও আনুগত্যের দ্বন্দ্ব সামনে আনে। একলব্যের ঘটনা শিক্ষার অধিকার ও কর্তৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলে। কৃষ্ণের কূটনীতি ন্যায় ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সম্পর্ককে জটিল করে তোলে।

গবেষণামূলক পাঠের কাজ হলো এসব প্রশ্নের উত্তর আগে থেকে নির্ধারণ করে দেওয়া নয়; বরং পাঠ, প্রমাণ, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং যুক্তির ভিত্তিতে প্রশ্নগুলোকে স্পষ্ট করা।

মহাভারতকে নতুন করে পড়ার অর্থ তাই শুধু তার অজানা কাহিনি আবিষ্কার করা নয়—বরং পরিচিত কাহিনিগুলোকেও নতুন প্রশ্নের সামনে দাঁড় করানো।

— টিটপ হালদার

তথ্যসূত্র ও আরও পাঠ:

১. Bhandarkar Oriental Research Institute (BORI), The Critical Edition of the Mahabharata—পাণ্ডুলিপিভিত্তিক সমালোচনামূলক সংস্করণের পরিচিতি।

২. The Mahābhārata: Electronic Text of the Critical Edition—সংস্কৃত পাঠের অনলাইন সংগ্রহ।

৩. Pratap Roy, “Barbarik: The Muse of the Subaltern and the Marginal to the Mahābhārata,” Anusandhanvallari, ২০২৪।

৪. The Mahabharata Atlas, “Not in the Text”—সমালোচনামূলক সংস্করণে অনুপস্থিত কিন্তু পরবর্তী ঐতিহ্যে প্রচলিত কাহিনির তুলনামূলক আলোচনা।

20/09/2026

সামনে বড় ঝড়ের সম্ভাবনার কথা শুনলেই আমার বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠে।

আমি বন্যাকে খুব ভয় পাই। কারণ আমি এই দেশের মানুষ। এই দেশের জল, মাটি, বাতাস—এসবকে বই পড়ে নয়, চোখের সামনে দেখেই চিনেছি।

সিডরের মতো ভয়ংকর ঝড় দেখেছি কাছ থেকে। দেখেছি, কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে গাছ উপড়ে পড়ে মানুষের জীবন কেড়ে নেয়। দেখেছি প্রকৃতির সামনে মানুষের অসহায়ত্ব।

রিমালের সময়ও দেখেছি দীর্ঘ সময় ধরে বাতাসের সেই অস্বাভাবিক চাপ। তারপর পরদিন গোনের জল যেভাবে বেড়েছিল, তা অনেকের কাছে যেন ইতিহাস হয়ে থাকবে। যে বাড়িতে ১৯৮৮ সালের বন্যাতেও পানি ওঠেনি, সেই বাড়ির উঠানে হাঁটুসমান পানি দেখেছি।

আমরা দ্বীপের মানুষ—এটাই হয়তো আমাদের বড় সৌভাগ্য। পানি একদিক দিয়ে ওঠে, অন্যদিক দিয়ে নেমে যায়। কিন্তু এই একই পরিস্থিতি যদি হাওর কিংবা দেশের এমন কোনো অঞ্চলে হতো, যেখানে পানি বের হওয়ার পথ কম—তাহলে মানুষকে হয়তো মাসের পর মাস পানির সঙ্গে লড়াই করতে হতো।

তাই নিম্নচাপ, ঘূর্ণিঝড় কিংবা বন্যার খবর শুনলেই ভয় লাগে।

আমার সবচেয়ে বেশি ভয় হয় সেই অসহায় প্রাণীগুলোর জন্য—যারা মানুষের মতো কথা বলতে পারে না, বিপদের খবর বুঝিয়ে বলতে পারে না, আশ্রয়ের জন্য কারও দরজায় গিয়ে দাঁড়াতে পারে না।

একটি গরু, ছাগল, কুকুর, বিড়াল কিংবা পাখি—দুর্যোগের সময় তারাও তো প্রাণী। তাদেরও ভয় হয়। তাদেরও বাঁচতে ইচ্ছে করে।

আর এখানেই আমাদের ধর্মবোধ, মানবিকতা এবং বিবেকের একটি কঠিন পরীক্ষা।

ভগবান যদি সকল জীবের মধ্যে থাকেন, তাহলে দুর্যোগের রাতে একটি অসহায় প্রাণীকে মন্দিরের বারান্দায় আশ্রয় দিলে কি ভগবানের পবিত্রতা নষ্ট হয়—নাকি আমাদের মানবিকতার পবিত্রতা রক্ষা হয়?

বন্যাকবলিত একজন কৃষক, যে সারাজীবন গরু-ছাগল নিয়ে সংসার করেছে, তার কাছে তার পশুগুলো শুধু সম্পদ নয়—তার পরিবারের অংশ।

অথচ আমি নিজের চোখে এমন অন্তত ছয়টি বাস্তব ঘটনা দেখেছি, যেখানে দুর্যোগের সময় মানুষ ও তার গবাদিপশু আশ্রয়ের জন্য মন্দিরের কাছে এলেও ‘পবিত্রতা নষ্ট হবে’—এই আশঙ্কায় তাদের ঢুকতে দেওয়া হয়নি।

আমি কাউকে অপমান করতে চাই না। প্রশ্নটা শুধু রেখে যেতে চাই।

দুর্যোগের সময়ে মানুষের জীবন বাঁচানো যদি ধর্ম হয়, তাহলে একটি প্রাণীর জীবন বাঁচানো কি অধর্ম?

— টিটপ হালদার ( কবি ও সংগঠক)

12/09/2026

আপদামস্তক আমিষজাত উপাদানে গঠিত একটি শরীর নিয়ে ‘আমিষবর্জন’-এর নামে যে ধরনের অতিরঞ্জিত যুক্তি ও প্রচার দেখা যাচ্ছে, তা অনেক ক্ষেত্রেই যুক্তির চেয়ে আবেগনির্ভর বলেই মনে হয়।

মানুষের শরীর নিজেই প্রাণিজগতের একটি জৈবিক শরীর। দাঁত, লালা, খাদ্যনালি, পাকস্থলী, পাচক রস—সবকিছুর স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই খাবার হজম হয়। নিরামিষ খাদ্য মুখে প্রবেশ করার পরও তা মানুষের এই জৈবিক শরীরের মাধ্যমেই প্রক্রিয়াজাত হয়ে শক্তিতে রূপান্তরিত হয়।

তাই নিরামিষ খাওয়া ব্যক্তিগত পছন্দ, ধর্মীয় বিশ্বাস বা নৈতিক অবস্থান হতে পারে—সেটি অবশ্যই সম্মানের বিষয়। কিন্তু তাকে কেন্দ্র করে যখন জীববিজ্ঞানবিরোধী, অসংগত বা হাস্যকর যুক্তি দাঁড় করিয়ে অন্যের খাদ্যাভ্যাসকে হেয় করা হয়, তখন প্রশ্ন তোলাটা জরুরি।

বাগেশ্বর বাবা কিংবা অন্য কোনো ধর্মীয় প্রচারক কি জানেন না যে মানুষের শরীর নিজেই একটি জটিল জৈবিক কাঠামো?

খাদ্যাভ্যাস ব্যক্তির স্বাধীনতা। কেউ নিরামিষ খাবেন, কেউ আমিষ খাবেন—এ নিয়ে কারও ওপর মত চাপিয়ে দেওয়ার কোনো যুক্তিসঙ্গত ভিত্তি নেই।

ধর্মের নামে নিম্নমানের যুক্তি দিয়ে সমাজকে বিভ্রান্ত করা বন্ধ হওয়া উচিত। বিশ্বাস থাকুক, কিন্তু বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্তি ও বাস্তবতার সংঘাত সৃষ্টি করে সমাজের ক্ষতি করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

— টিটপ হালদার
কবি ও সংগঠক

08/09/2026

অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ

08/09/2026

আমরা বসবাস করি চিতার উপর। জগতে যে প্রাণ আছে তার থেকে কয়েকগুণ হয়েছে মৃত্যু!

আজ ২১ আগস্ট। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক ভয়াবহ, রক্তাক্ত ও কলঙ্কিত দিনের স্মৃতি ফিরে আসে আজকের এই দিনে। ২০০৪ সালের ২১...
21/08/2026

আজ ২১ আগস্ট। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক ভয়াবহ, রক্তাক্ত ও কলঙ্কিত দিনের স্মৃতি ফিরে আসে আজকের এই দিনে। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে যে নারকীয় গ্রেনেড হামলা চালানো হয়েছিল, তার মূল লক্ষ্য ছিলেন তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনা। তিনি সেদিন প্রাণে বেঁচে গেলেও আওয়ামী লীগের বহু নেতা-কর্মী নিহত ও শত শত মানুষ আহত হন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক আইভি রহমান।

শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবনে তাঁকে হত্যার উদ্দেশ্যে একাধিক হামলা হয়েছে। বিভিন্ন সরকারি ও রাজনৈতিক সূত্রে এসব হত্যাচেষ্টার সংখ্যা ২০ বা ২১ পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে; সংবাদসূত্রে সংখ্যার হিসাবেও কিছু পার্থক্য রয়েছে। কিন্তু সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও একটি সত্য অস্বীকার করার সুযোগ নেই—তাঁকে লক্ষ্য করে বারবার প্রাণঘাতী হামলা হয়েছে।

এর মধ্যে বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন প্রথম বিএনপি সরকারের সময়ের তিনটি ঘটনা।

প্রথম আঘাত — ১১ সেপ্টেম্বর ১৯৯১

বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই, ১৯৯১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ঢাকার ধানমণ্ডির গ্রিন রোডের একটি উপনির্বাচনকেন্দ্র পরিদর্শনে গিয়ে গুলির মুখে পড়েন শেখ হাসিনা। তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়। প্রাণে বেঁচে যান তিনি।

দ্বিতীয় আঘাত — ২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৯৪

তিন বছর পর আরও ভয়াবহ ঘটনা ঘটে পাবনার ঈশ্বরদীতে। ট্রেনে করে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যাওয়ার সময় শেখ হাসিনাকে বহনকারী ট্রেনের কামরা লক্ষ্য করে একের পর এক গুলি ছোড়া হয়। লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় গুলি; আবারও মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে ফিরে আসেন তিনি।

তৃতীয় আঘাত — ৭ ডিসেম্বর ১৯৯৫

১৯৯৫ সালের ৭ ডিসেম্বর ঢাকার শেখ রাসেল স্কয়ারে আওয়ামী লীগের সমাবেশেও হামলার ঘটনা ঘটে। শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে হামলার সময় তাঁকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়। এ ঘটনাটিও তাঁর ওপর ধারাবাহিক প্রাণনাশের প্রচেষ্টার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

তারপরও থামেনি ষড়যন্ত্র, হামলা ও প্রাণনাশের চেষ্টা। ১৯৯৬, ২০০০, ২০০১, ২০০২—একটির পর একটি ঘটনা সামনে এসেছে। আর শেষ পর্যন্ত ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট সেই ধারাবাহিকতার সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ দেখা যায়—রাজনৈতিক সমাবেশকে পরিণত করা হয় রক্তাক্ত হত্যাক্ষেত্রে।

২১ আগস্ট তাই শুধু একটি তারিখ নয়। এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে সহিংসতার ভয়াবহতার একটি প্রতীক। এটি প্রশ্ন করে—একজন রাজনৈতিক নেতাকে মতের কারণে কতবার মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড় করানো যায়? কতবার একটি রাজনৈতিক সমাবেশকে পরিণত করা যায় হত্যার মঞ্চে?

ইতিহাসের বিচার শেষ হয় না ক্ষমতার পালাবদলে।
রক্তের দাগ মুছে যায় না সময়ের সঙ্গে।
আর হত্যাচেষ্টার ইতিহাসও চাপা পড়ে না রাজনৈতিক স্লোগানের নিচে।

২১ আগস্ট আমাদের মনে করিয়ে দেয়—গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শত্রু শুধু বন্দুক বা গ্রেনেড নয়; সত্যকে আড়াল করার সংস্কৃতিও।

ইতিহাসকে জানতে হবে।
ঘটনাগুলোকে মনে রাখতে হবে।
এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সত্যের দায় পৌঁছে দিতে হবে।

২১ আগস্টের সকল শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।
আহত ও নির্যাতিতদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সমবেদনা।

— টিটপ হালদার

মায়া...
20/08/2026

মায়া...

18/08/2026

আজকাল বিজ্ঞানী হওয়া বোধহয় বেশ সহজ—একটা লোহার কাঠামো বানান, কয়েকটা চাকা-লিভার লাগান, সঙ্গে ‘ক্র্যাঙ্কশ্যাফট’, ‘চেম্বার’ ইত্যাদি বৈজ্ঞানিক শব্দ ছুড়ে দিন, তারপর ঘোষণা করুন—“আমার ইঞ্জিন ৩৬০ ডিগ্রিতে অনবরত ঘুরবে!” এক টন ওজন এক মিটার নিচে নামলে শক্তি পাওয়া যাবে—সেটা ঠিক; কিন্তু একই এক টনকে আবার ওপরে তুলতে শক্তি লাগবে—এটাই পদার্থবিজ্ঞানের সোজা হিসাব। লিভার, গিয়ার কিংবা চেম্বার শক্তি সৃষ্টি করে না; শুধু বল ও গতির সম্পর্ক বদলায়। আর “ওপরে ওঠার সময় ওজন নিজে নিজেই শূন্য হয়ে যাবে”—এই বাক্যটি বললেই মহাকর্ষ ছুটিতে যায় না! বরং বাস্তব যন্ত্রে ঘর্ষণ, তাপ ও অন্যান্য ক্ষতির কারণে শক্তির প্রয়োজন আরও বাড়ে। অতএব প্রোটোটাইপ সত্যিই যদি কোনো বাহ্যিক শক্তি ছাড়াই অনবরত ঘোরে, তাহলে ক্যামেরার সামনে গল্প নয়—ইনপুট-আউটপুট শক্তির পরিমাপসহ পরীক্ষাটি প্রকাশ্যে করলেই হয়।
আর একটা বিষয় আরও জরুরি—বিজ্ঞান দিয়ে কোনো দাবি প্রমাণ করতে না পারলে সেটিকে আসমানী কিতাবের গল্প, অলৌকিক ঘটনা বা ধর্মীয় ব্যাখ্যা দিয়ে বৈজ্ঞানিক সত্য বানানো যায় না। ধর্ম বিশ্বাসের বিষয়, বিজ্ঞান পরীক্ষার বিষয়; দুটোকে গুলিয়ে ফেললে neither ধর্মের মর্যাদা থাকে, না বিজ্ঞানের। কোনো ধর্মগ্রন্থে মহাকর্ষের ইঙ্গিত খুঁজে পাওয়া গেলেও তা দিয়ে একটি ‘Perpetual Motion Machine’ কাজ করে—এমন প্রমাণ হয় না। সত্যিই যদি এই ইঞ্জিন প্রচলিত পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম ভেঙে কাজ করে, তবে সেটি ফেসবুকে বাহবা পাওয়ার মতো ঘটনা নয়—পৃথিবীর বিজ্ঞানকে নতুন করে লিখতে হবে। তাই হুট করে বিজ্ঞানী হওয়ার আগে একটু বিজ্ঞান পড়ুন; দাবি যত বড় হবে, প্রমাণটাও তত বড় হতে হবে। বিজ্ঞানীর আসল পরিচয় আত্মবিশ্বাসী বক্তব্যে নয়—পরীক্ষার টেবিলে।

- টিটপ হালদার (কবি ও সংগঠক)

বাংলাদেশ একটি রাজনৈতিক ফসলবাংলাদেশ কোনো আকস্মিক ভৌগোলিক ঘটনা নয়। এই রাষ্ট্র একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের ফসল। ভাষার অধি...
17/08/2026

বাংলাদেশ একটি রাজনৈতিক ফসল

বাংলাদেশ কোনো আকস্মিক ভৌগোলিক ঘটনা নয়। এই রাষ্ট্র একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের ফসল। ভাষার অধিকার থেকে স্বায়ত্তশাসন, ছয় দফা থেকে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০-এর নির্বাচনী ম্যান্ডেট থেকে মহান মুক্তিযুদ্ধ—একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম।

এই ইতিহাসের কেন্দ্রে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ভূমিকা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী লীগ পাকিস্তানি রাষ্ট্রকাঠামোর ভেতরে বাঙালির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। ১৯৫৫ সালে দলটির নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেওয়াও ছিল তার অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক অভিমুখের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ।

আর আওয়ামী লীগের এই রাজনৈতিক বিকাশের সঙ্গে ছাত্রলীগের ইতিহাসও গভীরভাবে যুক্ত। ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি—আওয়ামী লীগের এক বছর আগে। ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং মুক্তিযুদ্ধের পূর্ববর্তী রাজনৈতিক সংগ্রামে ছাত্রলীগের বহু নেতাকর্মী সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তাই ছাত্রলীগকে কেবল একটি ছাত্রসংগঠন হিসেবে দেখলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ অনুধাবন করা যায় না।

এই জায়গাতেই আমার একটি রাজনৈতিক প্রশ্ন আছে।

আজকের বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে যদি আমরা রাষ্ট্রের জন্মের ইতিহাসকে নতুন করে লিখতে চাই, তাহলে প্রশ্ন করতে হবে—কোন ইতিহাসকে সরিয়ে আমরা কোন ইতিহাস প্রতিষ্ঠা করতে চাই?

৫ আগস্টের পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের মতো ঐতিহাসিক স্থানে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্মৃতির ওপর আঘাতের প্রতীক হয়ে উঠেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত এই স্থানটি কেবল একটি ভবন নয়; এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রজন্মের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। সেই কারণে সেখানে হামলাকে নিছক একটি স্থাপনার ওপর হামলা হিসেবে দেখলে বিষয়টির রাজনৈতিক তাৎপর্য খাটো করা হয়।

আমি এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য করতে চাই। আওয়ামী লীগের সরকারের সমালোচনা করা যাবে, শেখ হাসিনার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা যাবে, আওয়ামী লীগের ভুল-ত্রুটি নিয়ে কঠোর প্রশ্ন তোলা যাবে—এগুলো গণতান্ত্রিক রাজনীতির স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ইতিহাস, বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা এবং মুক্তিযুদ্ধের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসকে একই সঙ্গে মুছে ফেলার চেষ্টা হলে সেটি আর কেবল একটি দলের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বিরোধিতা থাকে না; তখন প্রশ্নটি গিয়ে দাঁড়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পরিচয় ও ঐতিহাসিক স্মৃতির ওপর।

বাংলাদেশের ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী শক্তির অস্তিত্ব ছিল—এটি ইতিহাসেরই অংশ। পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তির ভূমিকা নিয়েও ঐতিহাসিক দলিল রয়েছে। কিন্তু বর্তমানের প্রত্যেক রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে সরাসরি ‘রাজাকার’, ‘আলবদর’ বা মুক্তিযুদ্ধবিরোধী বলে চিহ্নিত করা যেমন রাজনৈতিকভাবে সহজ, তেমনি ইতিহাসের বিচারে দায়িত্বশীল নয়। অভিযোগের জায়গায় দলিল, প্রমাণ ও অনুসন্ধান থাকা দরকার। ইতিহাসকে শক্তিশালী করতে হলে ইতিহাসের ভাষাও শক্ত হতে হয়।

তবু একটি বিষয় স্পষ্ট—বাংলাদেশের রাষ্ট্রজন্মের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্ককে রাজনৈতিক সুবিধার জন্য মুছে ফেলা সম্ভব নয়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানে বিপুল জনসমর্থন অর্জন করেছিল এবং সেই নির্বাচনী ফল পাকিস্তানের ক্ষমতা হস্তান্তর সংকটকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার দিকে নিয়ে যাওয়া রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে ওঠে।

আজ আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দলটির ওপর নিষেধাজ্ঞা এসেছে, সংগঠনটি রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিকভাবে গভীর সংকটে পড়েছে, এবং তার দীর্ঘ রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়েও তীব্র বিতর্ক চলছে।

কিন্তু একটি রাজনৈতিক দলের বর্তমান অবস্থান আর একটি রাষ্ট্রের জন্মের ইতিহাস—এই দুইটিকে এক করে ফেলা উচিত নয়।

আওয়ামী লীগের সমালোচনা হোক। কঠোর সমালোচনা হোক। আওয়ামী লীগের অতীত ও বর্তমানের প্রতিটি সিদ্ধান্ত ইতিহাসের কাঠগড়ায় যাচাই করা হোক। কিন্তু একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে—বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস কোনো একদিনের রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে জন্ম নেয়নি, আবার কোনো একদিনের রাজনৈতিক পতনের সঙ্গে তার মৃত্যু ঘটবে না।

এই রাষ্ট্রের পতাকা লাল-সবুজ। এই রাষ্ট্রের জন্ম মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। এই রাষ্ট্রের সংবিধানের ইতিহাস আছে। এই রাষ্ট্রের শহীদদের ইতিহাস আছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক ভূমিকার ইতিহাস আছে। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস আছে। ছাত্রলীগেরও সেই ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় আছে।

তাই আমার আপত্তি আওয়ামী লীগের সমালোচনায় নয়; আমার আপত্তি ইতিহাস মুছে ফেলার রাজনীতিতে।

কারণ সরকার বদলাতে পারে। দল ক্ষমতা হারাতে পারে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের উত্থান-পতন ঘটতে পারে। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের জন্মের ইতিহাসকে ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে পাল্টানো যায় না।

বাংলাদেশ কারও দখল করা সম্পত্তি নয়। বাংলাদেশ একটি রাজনৈতিক সংগ্রামের অর্জন।

আর সেই সংগ্রামের ইতিহাসে আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অধ্যায় যতই বিতর্কিত করা হোক, যতই আড়াল করা হোক—ইতিহাসের দলিল থেকে সেটি মুছে ফেলা সম্ভব নয়।

ইতিহাসের বিচার শেষ কথা বলে।

— টিটপ হালদার (কবি ও সংগঠক)

শেখ মুজিবের জায়গায় আপনি থাকলে কী করতেন?যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্রের প্রধান আপনি হলে কী করতেন? অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, প্রশাসনিক—...
17/08/2026

শেখ মুজিবের জায়গায় আপনি থাকলে কী করতেন?

যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্রের প্রধান আপনি হলে কী করতেন? অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, প্রশাসনিক—নানা এক্সপেরিমেন্ট চালাতেন নিশ্চয়ই। এটা স্বাভাবিক কাজই।

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি শেখ মুজিব দেশে ফিরে দু’টি কাজ অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে করেন। এক. ফেব্রুয়ারি মাসে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে ভারতে পাঠান। দুই. দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র ৯ মাসের মাথায় সংবিধান প্রণয়ন করেন—যেখানে পাকিস্তানের সংবিধান প্রণয়ন হতে ৯ বছর লেগেছিল।

গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে দেশ স্বাধীন হওয়ার এক বছরের মধ্যেই, ১৯৭৩ সালে, নির্বাচন দেন। নির্বাচনে কারচুপি বা বিবিধ বিষয় এখানে জরুরি আলোচ্য বিষয় মনে করছি না। সে বিষয় নিয়ে অন্যত্র বলা যাবে।

তারপর শুরু হয় দেশজুড়ে ভয়াবহ খরা। ’৭২ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষণা করে—দেশে মাত্র ২ জন কোটিপতি। খরা-পরবর্তী ভয়াবহ বন্যা। যমুনা ৬ বার প্লাবিত হয়। কৃষি ফসল ধ্বংস। পরিণতিতে দুর্ভিক্ষ।

দুর্ভিক্ষ-পরবর্তী সময়ে দেখা যায় দেশে কোটিপতির সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৫০-এর কাছাকাছি। শেখ মুজিবের পরিবার ও আত্মীয়স্বজন দুর্নীতিতে যুক্ত হওয়ার খবর মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়লেও—শেখ মুজিব নিজে দুর্নীতিতে যুক্ত ছিলেন, এমন কোনো তথ্য আমি পাইনি। কিংবা তিনি দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিয়েছিলেন—এমন তথ্যও আমার জানা নেই।

বরং প্রশাসনিকভাবে দুর্নীতি রোধ করতে না পেরে শেখ মুজিব রাজনৈতিকভাবে সেটাকে মোকাবিলা করার চেষ্টা করেছিলেন। সে সময়ের জনসভায় তাঁর সেই বিখ্যাত কথা—“৭ কোটি কম্বল, ৭ কোটি মানুষ। তাহলে আমার কম্বল কোথায়?”

অর্থাৎ জনগণের মধ্যে দুর্নীতিবিরোধী মনোভাব তৈরি করারও চেষ্টা করেছিলেন তিনি।

কৃষক-শ্রমিককে উৎপাদনমুখী কাজে আরও মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে সেনাবাহিনীকে “পিপলস আর্মি” হিসেবে গড়ে তোলার ঘোষণা দিলেন। পরিশেষে এল বাকশাল।

বাকশাল নিয়েও শেখ মুজিবের বক্তব্য ছিল স্পষ্ট। তিনি জনগণের কাছে প্রশ্ন রেখেছিলেন—“আমি জেলে ছিলাম, তোমরা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করোনি?” জনতা সমস্বরে বলেছিল—“হ্যাঁ।” এরপর তিনি ব্যাখ্যা করেন, সোনার বাংলা গড়তে হলে কেন বাকশাল প্রয়োজন।

দুর্ভিক্ষের সময় সুষম বণ্টনের সংকট ছিল—এটা সত্য। কিন্তু এটিই চূড়ান্ত কথা নয়।

একদিকে খরা-বন্যার ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি, অন্যদিকে সরকার আর্থিকভাবে প্রায় দেউলিয়া। খাদ্য কেনার মতো অর্থ নেই। তার ওপর বিদেশি সাহায্য না পাওয়ার পরিণতিতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

বিদেশি সহযোগিতা কেন পাওয়া গেল না—সে বিষয়ে অনুসন্ধান করতে গেলে শীতল যুদ্ধের আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিষয়টিও সামনে আসে। বাংলাদেশ সে সময় কিউবার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের PL-480 খাদ্যসহায়তা ব্যবস্থার সঙ্গে তৎকালীন বৈশ্বিক রাজনৈতিক বাস্তবতার সম্পর্ক ছিল। ফলে বাংলাদেশের খাদ্যসংকট শুধু অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতার গল্প নয়; এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক রাজনীতিও গভীরভাবে জড়িত ছিল।

পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফেরার পথে দিল্লিতে ভারত সরকারের সংবর্ধনা সভায় বঙ্গবন্ধু সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছিলেন। তারপর নানা চড়াই-উৎরাই পার করতে হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিতে পুরোপুরি শিফট করতে পারেননি।

দুর্ভিক্ষের সময় খাদ্য সহায়তার জন্য বাংলাদেশের অন্যতম বড় ভরসা ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু শীতল যুদ্ধের বাস্তবতায় বাংলাদেশের কিউবার সঙ্গে সম্পর্কও সমস্যাকে জটিল করে তোলে। পরিণতিতে খাদ্য সহায়তার সংকট আরও গভীর হয়। আর দুর্ভিক্ষে মানুষের প্রাণহানি ঘটতে থাকে।

তবে দুর্ভিক্ষের একক কারণ হিসেবে বঙ্গবন্ধুকে দায়ী করলে চলবে না। একইভাবে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তাঁর দায়ও অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

এটাই আসলে ইতিহাসের কঠিন জায়গা।

একজন রাষ্ট্রপ্রধানকে বিচার করতে হলে শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সততা দিয়ে বিচার করা যায় না। তাঁকে বিচার করতে হয় তাঁর প্রশাসন, অর্থনীতি, সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক কাঠামো এবং সেই সময়ের আন্তর্জাতিক বাস্তবতা—সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনা করে।

আগামীতে যারা রাষ্ট্র চালানোর স্বপ্ন দেখেন, তাদের অবশ্যই এসব বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে। এটা শেখ মুজিবের পক্ষে বা বিপক্ষে বলার বিষয় নয়। যথাযথ কারণ অনুসন্ধান জরুরি।

’৭২–’৭৫—একটা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে দাঁড় করানোর জন্য সময়টাও খুব বেশি নয়।

রাগে, ক্ষোভে পদত্যাগ করে ক্ষমতা হস্তান্তর করে দেওয়া খুব বেশি সমাধান দিত—এমনটাও মনে হয় না। যদিও অনেকে মনে করেন, শেখ মুজিবের পদত্যাগ করা উচিত ছিল।

আমি এ লেখায় নতুন করে চিন্তার কিছু রসদ জোগানোর চেষ্টা করলাম মাত্র। বাকি আপনারা বিদগ্ধজন তো আছেনই।

তবে একটা প্রশ্ন থেকেই যায়—

আপনারা শেখ মুজিবের জায়গায় থাকলে কী করতেন?

Address

Gopalganj

Telephone

+8801812026109

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Titop Halder posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The Business

Send a message to Titop Halder:

Shortcuts

Share