06/06/2025
প্রাচীন ডায়েরির রহস্য
এম, এম, ইসলাম
রাত তখন প্রায় দুটো। চারিদিক নিস্তব্ধ, শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার একঘেয়ে ডাক আর দূরের কোনো কুকুরের মাঝে মাঝে ঘেউ ঘেউ শব্দ। আমি আমার পড়ার ঘরে বসে একটা বই পড়ছিলাম, যদিও মনটা ঠিক বইয়ে ছিল না। গত কয়েকদিন ধরে একটা অদ্ভুত অস্থিরতা আমাকে ঘিরে ধরেছে। মনে হচ্ছে যেন কোনো অদৃশ্য শক্তি আমাকে টানছে, কিছু একটা ঘটতে চলেছে। আমার এই অনুভূতিগুলো সাধারণত ভুল হয় না।
হঠাৎ করেই লোডশেডিং হয়ে গেল। গোটা বাড়িটা অন্ধকারে ডুবে গেল। আমি অভ্যাসমতো টেবিলের ড্রয়ার থেকে মোমবাতি আর দেশলাই বের করলাম। মোমবাতি জ্বালিয়ে যেই না বইটা হাতে নেব, অমনি দরজায় একটা মৃদু কড়া নাড়ার শব্দ শুনলাম।
এই মাঝরাতে? কে হতে পারে?
আমার বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। আমাদের এই নিরিবিলি পাড়ায় এত রাতে কারো আসার কথা নয়। তাছাড়া, আমরা শহরের বাইরে একটা প্রায় নির্জন জায়গায় থাকি। কৌতূহল আর ভয়ের একটা মিশ্র অনুভূতি নিয়ে আমি ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম।
"কে?" ক্ষীণ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলাম আমি।
কোনো উত্তর নেই। শুধু আরেকবার কড়া নাড়ার শব্দ। এবার একটু জোরালো।
আমি দরজার হ্যান্ডেলে হাত রাখলাম। একটা ঠান্ডা অনুভূতি যেন আমার আঙুলগুলো বেয়ে সারা শরীরে ছড়িয়ে গেল। দরজাটা খুলতেই বাইরের অন্ধকারটা যেন আরও ঘন হয়ে উঠল। মোমবাতির আলোয় আবছাভাবে দেখলাম, একজন দীর্ঘকায় ব্যক্তি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর মুখটা অন্ধকারে ঢাকা, বোঝা যাচ্ছে না। তাঁর পরনে একটা লম্বা, গাঢ় রঙের পোশাক, যা মাটির সাথে মিশে গেছে।
"কে আপনি? এই মাঝরাতে?" আমার গলা প্রায় কেঁপে গেল।
ব্যক্তিটি কোনো কথা বললেন না। শুধু তাঁর হাতটা আমার দিকে এগিয়ে দিলেন। হাতের তালুতে কী যেন একটা চকচক করছে। মোমবাতির আলোয় ভালো করে দেখে আমি শিউরে উঠলাম। ওটা একটা প্রাচীন, জীর্ণ ডায়েরি!
"এটা আপনার কাছে রাখুন," কণ্ঠস্বরটা নিচু, প্রায় ফিসফিস করে বলার মতো। "সময় হলে এর অর্থ বুঝতে পারবেন।"
তাঁর কথা শেষ হওয়ার আগেই এক ঝলক ঠান্ডা বাতাস বইল এবং তিনি মিলিয়ে গেলেন অন্ধকারে, যেন তিনি কোনোদিনই ছিলেন না। আমি হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। হাতে ধরা ডায়েরিটা বরফের মতো ঠান্ডা লাগছিল। আমি দ্রুত দরজা বন্ধ করে দিলাম, বুকটা তখনো ধুকপুক করছে।
মোমবাতির আলোয় ডায়েরিটা ভালো করে দেখলাম। চামড়ার বাঁধাই, বহু পুরনো। পাতাগুলো হলুদ হয়ে গেছে, কিছু জায়গায় ছেঁড়া। মলাটের উপর একটা অদ্ভুত প্রতীক আঁকা, যা আমি আগে কখনো দেখিনি। ডায়েরিটা খুলতেই একটা অদ্ভুত, অচেনা ভাষায় লেখা কিছু শব্দ চোখে পড়ল। দেখে মনে হচ্ছিল, এটা কোনো প্রাচীন লিপির মতো। আমি যতদূর জানি, আমি এই ভাষাটা শিখিনি।
পরের কয়েকটা দিন আমি কিছুতেই মন বসাতে পারলাম না। ডায়েরিটা আমার মনের মধ্যে গেঁথে ছিল। আমি অনেক চেষ্টা করলাম ভাষাটা বোঝার, কিন্তু পারলাম না। ইন্টারনেট ঘেঁটে অনেক চেষ্টা করেও কোনো লাভ হলো না। এটা কোনো প্রচলিত ভাষা ছিল না।
একদিন বিকেলে আমি বারান্দায় বসেছিলাম। আমার হাতে তখনো সেই ডায়েরিটা। হঠাৎই আমার চোখ গেল একটা পুরনো বইয়ের দিকে, যেটা আমার দাদা ব্যবহার করতেন। বইটা ছিল প্রাচীন লিপি ও সংকেত নিয়ে। আমি কৌতূহলবশত বইটি হাতে নিলাম। পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে হঠাৎ একটা পৃষ্ঠায় আমার চোখ আটকে গেল। অবিশ্বাস্য! ডায়েরির মলাটে আঁকা প্রতীকটা এই বইয়ের একটা পৃষ্ঠাতেও আছে!
আমি দ্রুত পৃষ্ঠাটি পড়তে শুরু করলাম। সেখানে লেখা ছিল, এই প্রতীকটি একটি বিলুপ্ত সভ্যতার ভাষা, যা 'এথিরিয়ান' নামে পরিচিত। এই ভাষার কিছু অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য আছে, যার মধ্যে একটি হলো, এটি কেবল তখনই পাঠযোগ্য হয় যখন পাঠক গভীরভাবে মনোযোগ দেন এবং একটি নির্দিষ্ট মানসিক অবস্থায় থাকেন। বইটিতে এথিরিয়ান ভাষার কিছু মূল অক্ষর এবং তাদের উচ্চারণবিধি দেওয়া ছিল।
আমি উত্তেজিত হয়ে পড়লাম। সঙ্গে সঙ্গে ডায়েরিটা নিয়ে বইটির দেওয়া নির্দেশিকা অনুসরণ করে অক্ষরগুলো মেলানোর চেষ্টা করলাম। প্রথমদিকে কিছুই বুঝতে পারলাম না। কিন্তু ধীরে ধীরে, আমি যখন মনোযোগ দিয়ে অক্ষরগুলোর দিকে তাকাতে শুরু করলাম, তখন অদ্ভুত একটা ঘটনা ঘটল। অক্ষরগুলো যেন নিজেদের মধ্যে নতুন করে বিন্যস্ত হতে শুরু করল! যেন তারা জীবন্ত হয়ে উঠল আমার চোখের সামনে।
আমি বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে দেখলাম, ডায়েরির পাতায় লেখা শব্দগুলো একে একে আমার কাছে স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। আমি পড়তে পারছিলাম! এটা ছিল একটা প্রাচীন গল্প, এক হারিয়ে যাওয়া জগতের কাহিনি। সেই ডায়েরিতে লেখা ছিল এক প্রাচীন সভ্যতার কথা, যারা আমাদের এই পৃথিবীর নিচে এক লুকানো মাত্রায় বাস করত। তারা প্রযুক্তি এবং আধ্যাত্মিকতার এক অদ্ভুত মিশ্রণ ব্যবহার করত।
ডায়েরিটা যত পড়ছিলাম, তত আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না। এটা ছিল এমন এক জগতের বর্ণনা, যা আমাদের কল্পনার বাইরে। তাদের সমাজ, তাদের জীবনযাপন, তাদের বিশ্বাস – সবকিছুই ছিল আমাদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। কিন্তু এর সবচেয়ে অবিশ্বাস্য অংশটি ছিল, ডায়েরিটি একটি সতর্কবার্তা ছিল। সেখানে বলা হয়েছিল যে তাদের জগৎ এবং আমাদের জগতের মধ্যেকার দেয়ালটা ক্রমশ পাতলা হয়ে আসছে। আর যদি সেই দেয়াল সম্পূর্ণভাবে ভেঙে যায়, তাহলে দুটি জগতের মধ্যে এক ভয়ংকর সংঘর্ষ অনিবার্য।
ডায়েরির শেষ পাতায় লেখা ছিল একটি ভবিষ্যৎবাণী: "যখন চাঁদ রক্তের মতো লাল হবে এবং আকাশের নক্ষত্ররা ভুল পথে চলবে, তখনই দুটি জগতের সংগম শুরু হবে।"
আমি ডায়েরিটা বন্ধ করে দিলাম। আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল। মধ্যরাতের সেই আগন্তুক, সেই ডায়েরি, আর সেই ভবিষ্যৎবাণী – সবকিছু মিলে আমার মনে এক গভীর ভয়ের সঞ্চার করল। আমি নিশ্চিত ছিলাম যে আমি কোনো সাধারণ ঘটনা দেখিনি। এটা ছিল এক অবিশ্বাস্য, অলৌকিক অভিজ্ঞতা, যা আমার জীবনকে চিরতরে বদলে দিল। আমি জানতাম না এই ভবিষ্যৎবাণী কবে সত্যি হবে, তাই আমি ভয়ে থাকি, সেই অদ্ভুত দিনের জন্য, যখন দুটি জগৎ এক হয়ে যাবে আর তখন পৃথিবীতে কি ঘটবে!