07/07/2026
চারপাশে শুধু পানি, আর সেই পানির ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল পাথরের স্তম্ভ! হাজার বছর পেরিয়ে গেলেও কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারেনি, কে নির্মাণ করেছিলেন এটি, আর কেনই বা নির্মাণ করা হয়েছিল।
নওগাঁ জেলার পত্নীতলা উপজেলার দিবর দিঘির মাঝখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে দিবর স্তম্ভ বা দিব্যক জয়স্তম্ভ, বাংলাদেশের অন্যতম রহস্যময় ঐতিহাসিক নিদর্শন। চারপাশে শান্ত জলরাশি, আর তার মাঝখানে প্রায় ৩১ ফুট ৮ ইঞ্চি উঁচু অখণ্ড গ্রানাইট পাথরের এই স্তম্ভ আজও ইতিহাসবিদ ও প্রত্নতত্ত্ববিদদের কৌতূহলের কেন্দ্র।
ইতিহাস,
একাদশ শতকে বাংলার ইতিহাসে ঘটে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, “কৈবর্ত বিদ্রোহ”। পাল সাম্রাজ্যের দুর্বল শাসক দ্বিতীয় মহীপাল-এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন কৈবর্ত নেতা দিব্যক (দিব্য)। যুদ্ধে মহীপাল পরাজিত ও নিহত হলে দিব্যক বরেন্দ্র অঞ্চলের শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। ধারণা করা হয়, তখনই এই স্তম্ভ নির্মিত হয়েছিল।
প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, পাল রাজাকে পরাজিত করে বিজয় অর্জনের স্মৃতি অম্লান রাখতে দিব্যক এই বিশাল জয়স্তম্ভ নির্মাণ করেছিলেন।
আবার অন্য একটি মত অনুযায়ী, তাঁর উত্তরসূরি রুদ্রক বা ভীম দিব্যকের স্মৃতিকে অমর করে রাখতে এই স্তম্ভ নির্মাণ করেন।
আরও একটি মত বলছে, দিব্যকের রাজত্ব কালে পাল যুবরাজ রামপাল বরেন্দ্র উদ্ধারের চেষ্টা করে দিব্যক এর নিকট পরাজিত হন। দিব্যক তার এই সাফল্যের স্মৃতি রক্ষার উদ্দেশ্যে দিঘীর মাঝখানে এই স্তম্ভ নির্মাণ করেন।
স্তম্ভটির নির্মাণ উদ্দেশ্য নিয়ে তিনটি ভিন্ন ঐতিহাসিক মত থাকলেও, এর কোনটিই এখন পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়নি। কারন, স্তম্ভটির গায়ে কোনো শিলালিপি নেই। ফলে নির্মাতা বা নির্মাণকাল সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। এই কারণেই দিবর স্তম্ভ আজও ইতিহাসের এক অমীমাংসিত রহস্য হয়ে আছে।
স্থাপত্য,
দিবর দিঘির মাঝখানে স্থাপিত এই স্তম্ভটি একটি অখণ্ড গ্রানাইট পাথর কেটে তৈরি করা হয়েছে, যা বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মধ্যে অত্যন্ত বিরল। স্তম্ভটির মোট উচ্চতা প্রায় ৩১ ফুট ৮ ইঞ্চি। ব্যাস ১০ ফুট ৪ ইঞ্চি। এর একটি অংশ পানির নিচে এবং আরও একটি অংশ মাটির গভীরে রয়েছে। উপরের অংশে রয়েছে খাঁজকাটা অলংকরণ, বৃত্তাকার বলয় এবং মুকুটের মতো শীর্ষভাগ, যা প্রাচীন ভাস্কর্যশিল্পের অসাধারণ নিদর্শন।
স্তম্ভটির কোণের সংখ্যা নিয়েও মতভেদ রয়েছে। কেউ একে আট কোণবিশিষ্ট, আবার প্রত্নতত্ত্ববিদ আলেকজান্ডার কানিংহাম তাঁর জরিপে এটিকে নয় কোণবিশিষ্ট বলে উল্লেখ করেছিলেন।
আরও বিস্ময়ের বিষয় হলো, এত বিশাল গ্রানাইট পাথর কীভাবে সেই সময়ে দিঘির মাঝখানে এনে স্থাপন করা হয়েছিল, তারও কোনো নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যা আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
আজকের দিবর দিঘি,
আজ দিবর দিঘি শুধু একটি প্রত্নস্থল নয়, এটি উত্তরবঙ্গের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র। দিঘির চারপাশে হাঁটার পথ, শানবাঁধানো ঘাট এবং নৌকায় করে স্তম্ভের কাছাকাছি যাওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।
তবে, দিঘিতে মাছ চাষ, পানিদূষণ এবং যথাযথ সংরক্ষণের অভাব ভবিষ্যতে এই অমূল্য ঐতিহ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
হাজার বছরের ইতিহাস বুকে নিয়ে দিবর দিঘির মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এটি শুধু একটি পাথরের স্তম্ভ নয়, এটি বাঙালির শৌর্য, ইতিহাস এবং হারিয়ে যাওয়া এক রাজ্যের নীরব সাক্ষী।
— যশোহরের জলছাপ
#যশোহরেরজলছাপ #যশোহরের_জলছাপ #ইতিহাসেরসন্ধানে #লুকানোইতিহাস #পুরোনোদিনেরকথা #ইতিহাসেরসাক্ষী
#ইতিহাস #দিবরস্তম্ভ #নওগা.