13/05/2026
শুরু হোক সচেতনতা: মসজিদে দিরার এবং আজকের দলাদলির ফিতনা
বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম
পবিত্র কুরআনের সূরা আত-তওবার ১০৭ ও ১০৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা এক ভয়াবহ ষড়যন্ত্রের পর্দা ফাঁস করেছেন। মদিনার মুনাফিকরা ইবাদতের নাম করে একটি মসজিদ নির্মাণ করেছিল, যার নাম ছিল 'মসজিদে দিরার'। বাহ্যিকভাবে সেটি ইবাদতখানা মনে হলেও আল্লাহর কাছে তা ছিল ষড়যন্ত্রের আখড়া।
আল্লাহ এই মসজিদের চারটি ভয়াবহ বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন:
১. ضرارًا (ক্ষতিসাধন): সাধারণ মুসলমানদের ধর্মীয় ও সামাজিক ক্ষতি করা।
২. كفرًا (কুফরি): সত্যকে গোপন করে ভ্রান্ত আকিদা ছড়ানো।
৩. تفريقًا بين المؤمنين (মুমিনদের মাঝে বিভেদ): মুসলমানদের ঐক্য নষ্ট করে আলাদা দল বা গোষ্ঠী তৈরি করা।
৪. إرصادًا (ষড়যন্ত্রের ঘাঁটি): ইসলামের দুশমনদের আশ্রয়স্থল বানানো।
⚠️ সমসাময়িক প্রেক্ষাপট ও বিভক্তির রাজনীতি
বর্তমানে আমরা দেখছি, দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ সমাজকে ভেঙে সুনির্দিষ্ট কিছু মতাদর্শ (যেমন: তথাকথিত নব্য সালাফি বা ওহাবি মতবাদ) প্রচারের জন্য আলাদা আলাদা মসজিদ নির্মাণ করা হচ্ছে। যেখানে মূল উদ্দেশ্য ইবাদত নয়, বরং সাধারণ মানুষকে "মুশরিক" বা "বিদয়াতি" ফতোয়া দিয়ে মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করা।
রাসূলুল্লাহ ﷺ যে ঐক্যের শিক্ষা দিয়েছেন, তাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পাড়ায় পাড়ায় বিভেদ সৃষ্টি করা কি সেই 'মসজিদে দিরার'-এর আধুনিক রূপ নয়? যখন একটি মসজিদ কেবল একটি বিশেষ গোষ্ঠীর জন্য নির্দিষ্ট হয়ে যায় এবং সেখান থেকে অন্য মুসলমানদের প্রতি ঘৃণা ছড়ানো হয়, তখন তা আর 'আল্লাহর ঘর' থাকে না, বরং তা দলাদলির কেন্দ্রে পরিণত হয়।
📜 নজদ এবং 'শয়তানি সিং' (قرن الشيطان) সংক্রান্ত হাদিস
রাসূলুল্লাহ ﷺ আজ থেকে চৌদ্দশত বছর আগে এই ফিতনা সম্পর্কে সতর্ক করে গেছেন। সহিহ বুখারির হাদিসে এসেছে:
"রাসূলুল্লাহ ﷺ দোয়া করলেন: হে আল্লাহ! আমাদের শাম (সিরিয়া) ও ইয়ামেনে বরকত দিন। সাহাবিরা বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের 'নজদ' অঞ্চলেও কি? তিনি আবারও আগের দোয়া করলেন। তৃতীয়বার তিনি বললেন: সেখানে (নজদ এলাকায়) ভূমিকম্প এবং ফিতনা হবে এবং সেখান থেকেই 'শয়তানের সিং' (قرন الشيطان) উদিত হবে।"
(সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ১০৩৭)
ইতিহাস সাক্ষী, এই নজদ থেকেই মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাবের উত্থান ঘটেছিল, যার চরমপন্থী মতবাদ ব্যবহার করে হাজার হাজার মুসলমানের রক্তপাত ঘটানো হয়েছে এবং ইসলামের ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ধ্বংস করা হয়েছে। আজকের আধুনিক 'সালাফিজম' সেই নজদি ফিতনারই একটি পরিবর্তিত রূপ, যা উম্মতের ঐক্যকে টুকরো টুকরো করে দিচ্ছে।
💡 আমাদের করণীয়:
১. তাকওয়ার ভিত্তি খুঁজুন: আল্লাহ বলেছেন, সেই মসজিদে নামাজ পড়বেন না যার ভিত্তি তাকওয়ার ওপর নয়। তাই বিভেদ সৃষ্টিকারী কোনো গোষ্ঠীর ফাঁদে পা দেবেন না।
২. ঐক্য বজায় রাখুন: যারা কথায় কথায় মুসলমানদের কাফের বা বিদয়াতি বলে সমাজ থেকে আলাদা হতে চায়, তাদের থেকে দূরে থাকুন।
৩. ইতিহাস জানুন: ইসলামের নামে আসা নব্য চরমপন্থী মতবাদগুলোর শিকড় এবং তাদের পেছনের মদতদাতাদের সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করুন।
আল্লাহ আমাদের এই বিভক্তির ফিতনা থেকে রক্ষা করুন এবং উম্মতে মুহাম্মদীকে পুনরায় একতাবদ্ধ হওয়ার তৌফিক দান করুন। আমিন।