13/05/2026
আলবানীর ভ্রান্তিগুলোর একটি হলো—তিনি নবী ﷺ-কে “ভ্রষ্ট” (ضال) বলে আখ্যায়িত করেছেন।
আলবানী নবী ﷺ-কে “ভ্রষ্ট” বলেছেন, যেমন তিনি নবী-ওলীদের মাধ্যমে তাওয়াসসুলকারীদেরও “ভ্রষ্ট” বলেন।
তিনি বলেনঃ
“আমি বলি, এরা—অর্থাৎ ওলী-সালেহীনদের মাধ্যমে তাওয়াসসুলকারী এবং যারা কিতাব ও সুন্নাহ অনুসরণকে হারাম মনে করে—আমি কোনো সংকোচ ছাড়াই তাদের প্রকৃত নামে ডাকছি; এরা সত্য থেকে ভ্রষ্ট। ইসলামী দৃষ্টিতে এ শব্দ ব্যবহারে কোনো সমস্যা নেই। আমি যখন বলি তারা সত্য থেকে ভ্রষ্ট, তখন আল্লাহ তাআলাই তাঁর নবী সম্পর্কে বলেছেনঃ
﴿وَوَجَدَكَ ضَالًّا فَهَدَى﴾
‘তিনি আপনাকে পথ সম্পর্কে অজ্ঞ পেলেন, অতঃপর হিদায়াত দিলেন।’”
— ফাতাওয়া আল-আলবানী, পৃষ্ঠা ৪৩২
“وَوَجَدَكَ ضَالًّا فَهَدَىٰ” আয়াতের ব্যাখ্যায় মুফাসসিরদের বক্তব্য
আল্লাহ তাআলার বাণীঃ
﴿وَوَجَدَكَ ضَالًّا فَهَدَىٰ﴾
“তিনি আপনাকে অজ্ঞ অবস্থায় পেলেন, অতঃপর হিদায়াত দিলেন।”
এই আয়াতের অর্থ সম্পর্কে মুফাসসিরগণ বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোঃ
১. “ضالًّا” অর্থ নবুওয়াত সম্পর্কে অজ্ঞ বা অনবগত
ইবনে আব্বাস (রা.) ও আতা (রহ.) বলেনঃ
এখানে “ভ্রষ্ট” বলতে উদ্দেশ্য হলো—নবুওয়াতের দায়িত্ব সম্পর্কে অবগত না থাকা। এরপর আল্লাহ তাঁকে নবুওয়াত দান করেন।
ইমাম ওয়াহিদী “আল-বাসীত” গ্রন্থে বলেনঃ
“ইবনে আব্বাস বলেছেনঃ ‘তিনি আপনাকে নবুওয়াত সম্পর্কে অজ্ঞ অবস্থায় পেলেন, অতঃপর নবুওয়াতের মাধ্যমে সর্বোত্তম দ্বীনের দিকে পথ দেখালেন।’”
ইমাম কুরতুবী বলেনঃ
“এখানে ‘ضلال’ অর্থ গাফেল বা অনবগত থাকা। যেমন আল্লাহ বলেনঃ
﴿لَا يَضِلُّ رَبِّي وَلَا يَنسَى﴾
অর্থাৎ ‘আমার প্রতিপালক ভুলেন না, বিস্মৃত হন না।’”
তিনি আরও বলেনঃ
“নবী ﷺ নবুওয়াতের আগে ওহী ও শরীয়তের বিষয়ে অবগত ছিলেন না, পরে আল্লাহ তাঁকে হিদায়াত দিয়েছেন।”
২. শরীয়তের বিধান সম্পর্কে অবগত না থাকা
হাসান বসরী, দাহহাক, ইবনে কাইসান প্রমুখ বলেনঃ
“নবী ﷺ শরীয়তের বিস্তারিত বিধান ও নবুওয়াতের নিদর্শন সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। আল্লাহ তাঁকে তা শিক্ষা দিয়েছেন।”
এর দলিলঃ
﴿وَإِن كُنتَ مِن قَبْلِهِ لَمِنَ الْغَافِلِينَ﴾
“এর আগে আপনি অবশ্যই এ সম্পর্কে অনবগত ছিলেন।”
এবংঃ
﴿مَا كُنتَ تَدْرِي مَا الْكِتَابُ وَلَا الْإِيمَانُ﴾
“আপনি জানতেন না কিতাব কী, ঈমান কী।”
৩. “আপনি ভ্রষ্ট জাতির মধ্যে ছিলেন”
কালবী, ফেরাআ ও সুদ্দী বলেনঃ
“অর্থ হলো—আপনি এমন এক জাতির মধ্যে ছিলেন যারা পথভ্রষ্ট ছিল, অতঃপর আল্লাহ তাদেরকে আপনার মাধ্যমে হিদায়াত দিয়েছেন।”
৪. “ضلال” অর্থ সত্যের সন্ধানে গভীর অনুসন্ধান
কুশাইরী, জুনাইদ ও আলী ইবনে ঈসা বলেনঃ
এখানে “ضلال” অর্থ বিভ্রান্তি নয়; বরং সত্যের সন্ধানে গভীর অনুসন্ধান ও চিন্তামগ্নতা।
নবী ﷺ হেরা গুহায় নির্জনে ইবাদত করতেন এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের সঠিক পথ খুঁজতেন, অতঃপর আল্লাহ তাঁকে ইসলামের দিকে হিদায়াত দেন।
৫. সফরের সময় রাস্তা হারিয়ে ফেলা
সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যিব (রহ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে—
নবী ﷺ এক সফরে তাঁর চাচা আবু তালিবের সঙ্গে ছিলেন। রাতে শয়তান উটের লাগাম ঘুরিয়ে পথভ্রষ্ট করতে চেয়েছিল, পরে জিবরীল (আ.) এসে তাঁকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনেন।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
মুফাসসিরদের কেউই বলেননি যে এখানে “ضال” দ্বারা কুফর বা ঈমানহীনতা বোঝানো হয়েছে।
কাজী ইয়ায (রহ.) বলেনঃ
“আমি কোনো মুফাসসিরকে এ কথা বলতে দেখিনি যে এখানে ঈমান থেকে ভ্রষ্টতা বোঝানো হয়েছে।”
ইমাম কাস্তাল্লানী বলেনঃ
“আলেমগণ একমত যে, নবী ﷺ জীবনের এক মুহূর্তের জন্যও পথভ্রষ্ট হননি।”
উপসংহার
সুতরাং,
﴿وَوَجَدَكَ ضَالًّا فَهَدَىٰ﴾
আয়াতের অর্থ এ নয় যে নবী ﷺ পূর্বে কাফির বা পথভ্রষ্ট ছিলেন, পরে আল্লাহ তাঁকে হিদায়াত দিয়েছেন—নাউযুবিল্লাহ।
বরং নবী ﷺ নবুওয়াতের আগে ওহী ও শরীয়তের বিস্তারিত বিষয়ে অবগত ছিলেন না; পরে আল্লাহ তাঁকে ওহী ও নবুওয়াত দান করেছেন।
নবী ﷺ-এর ইসমত (পাপ ও কুফর থেকে সংরক্ষিত থাকা) নবুওয়াতের আগে ও পরে উভয় অবস্থাতেই প্রতিষ্ঠিত ও মুসলিম উম্মাহর আকীদার অংশ।
অতএব, নবী ﷺ সম্পর্কে এমন ধারণা করা যে তিনি কুফর বা বিভ্রান্তির মধ্যে ছিলেন—এটি গুরুতর ভুল ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্য। মুসলমানদের উচিত এ ধরনের বক্তব্য থেকে সতর্ক থাকা।
— দারুল ইফতা মিসর (মিশরীয় ফতোয়া বোর্ড