25/01/2026
কিছু মানুষের ব্যক্তিত্বকে আমার বড় ভালোলাগে। আমার পরিচিত এক ভদ্রমহিলাকে দেখি সকাল হলেই সুন্দর পোশাক পরে মর্নিং ওয়াকে যান। ফিরে এসে নিজের হারমোনিয়াম নিয়ে রেওয়াজে বসেন। তারপর নিজের সেভেন সিটার গাড়ি চালিয়ে বেরিয়ে যান ওঁর বিজনেসের কাজে। ভদ্রমহিলার বয়েস প্রায় ষাট ছুঁইছুঁই। যদিও ফিটনেসে পঁচিশকে হার মানাবেন। সর্বদা অ্যাক্টিভ মহিলা। পড়ার যে কোনও অনুষ্ঠানে উনি অংশগ্রহণ করেন। খুব মিশুকে মানুষ। সকলের মধ্যে থেকেও ভদ্রমহিলা নিজেকে বেশ রহস্যের মধ্যে ঘিরে রেখেছেন।হঠাৎই গল্প করতে করতে বললেন, আমি কিন্তু একা ছিলাম না। ধীরে ধীরে নিজেকে একা করে নিয়েছি। আমার বাড়িতে বাবা-মা, ভাই-বোন সবাই ছিল, সকলেই আমায় এত ভালবাসত যে আমি আদরের ঠেলায় অতিষ্ঠ হয়ে থাকতাম। তখন চাকরি করতাম। অফিস থেকে ফিরলে সবাই নিজের নিজের সমস্যা বলত, আমি আপ্রাণ চেষ্টা করতাম মেটাতে। সবাই খুশি থাকত।
একদিন অসময়ে বাড়ি ঢুকে শুনতে পেলাম, আমার নিজের মা ভাই-বোনদের শেখাচ্ছে, ও ফিরলে আমি চা, স্ন্যাক্সটা দেব আর তোরা তখন গিয়ে টাকা-জিনিস চেয়ে নিবি। ঢুকলেই চাইবি না। চা খেতে খেতে মুড ভালো থাকবে তখন চাইবি। বাবা অসন্তোষের সুরে বলছে, মাইনে তো কম পায় না, সব টাকাটাই তো আমার হাতে দেওয়া উচিত ছিল। মা বলল, কে জানে নিজের বিয়ের কথা ভাবছে কি না? আমার বোন বেশ রাগত গলায় বলল, ওর একটা দায়িত্ব আছে আমাদের প্রতি, বিয়ে করে চলে যাবে মানে? ইয়ার্কি নাকি? বোন তখন কলেজে পড়ে। ভাই চাকরির চেষ্টা চালাচ্ছিল। বাবা ছোট একটা দোকান চালাত। জানি না সেদিন আমার কী হলো! খুব একলা হতে ইচ্ছে হলো। পরিবারের ওই উষ্ণতটা আর অনুভব করতে ইচ্ছে হচ্ছিল না। ট্রান্সফার নিয়ে চলে গেলাম অন্যত্র। বাড়িতে নির্দিষ্ট সময় টাকা পাঠিয়ে দিতাম। যাতে কারোর কোনো সমস্যা না হয়। গতবছর রিটায়ার করেছি। নিজের বিজনেস খুলেছি একটা। ফ্ল্যাট,গাড়ি সব কিনেছি। কিন্তু পরিবারে থাকতে আর মন চায়নি। জানো, আমরা হয়তো অনেকেই মানি না, কিন্তু বাবা-মাও যে সন্তান নিঃস্বার্থভাবে করে তাকেই ইউজ করে নেয় আজীবন। ভাই-বোন দুজনেই যখন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তখনও কিছুই দেয়নি বাড়িতে। আমিই চালাই সবটুকু।
আমি বললাম, বিয়ে করলেন না কেন? উনি হেসে বললেন, ওই যে বললাম পারিবারিক উষ্ণতা পেতে আর ইচ্ছে করেনি।
কত মানুষের মনে কত রকমভাবে আঘাত লাগে বাইরে থেকে বোঝাই যায় না। অমন মিশুকে, গান-বাজনায় মেতে থাকা মানুষের মনের কুঠুরিতে যে এমন অন্ধকার বাসা বেঁধে আছে বুঝতেও পারিনি।
উনি হেসে বললেন, তুমি লেখো তো, মানুষের মন বোঝো বলেই বলতে ইচ্ছে করল। সকলকে বলি না। ইচ্ছেটাই করে না।
আমি বললাম, আপনাকে আমার খুব ভালো লাগে। উনি বললেন, সব শুনে স্বার্থপর মনে হয়নি?
আমি বললাম, মনে হলো আপনি একটা ফুলগাছ। ফুল বিলিয়ে দিলেও ফুল উৎপাদনের ক্ষমতাটাকে নিজের জন্যই বাঁচিয়ে রেখেছেন। এটুকু আপনার একান্ত অহঙ্কার।
উনি আনমনে বললেন, হয়তো তাই। পরক্ষণেই বললেন, আচ্ছা অবজ্ঞাও কি ধীরে ধীরে মানুষকে মেরে দিতে পারে? আমায় উত্তর দেওয়ার সুযোগ না দিয়েই বললেন, আমিও সেদিনের পর থেকে অবজ্ঞা করেছি সবকিছুকে। নিজেই মেরে ফেলেছি পারিবারিক সম্পর্কটাকে।
আমি কথা ঘুরিয়ে বললাম, আপনি কী সুন্দর ড্রাইভ করেন। আমি আর শিখতে পারলাম না জানেন। উনি হেসে বললেন, লক্ষ্যটা স্থির রেখো পেরে যাবে।
কী অদ্ভুত ব্যক্তিত্ব! কী মারাত্মক মনের জোর ভদ্রমহিলার। কী অটুট সিদ্ধান্ত। জীবন বড় রহস্যময়।
゚viralfbreelsfypシ゚viral ゚viralシfypシ゚viralシalシ