13/08/2025
পরিবেশ বিজ্ঞান একটি অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং বাস্তবমুখী বিষয়, যা পরিবেশ রক্ষা, প্রাকৃতিক সম্পদের সংরক্ষণ, এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশে ২৮ বছর ধরে এই বিষয়টি উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে পড়ানো হলেও এখনো পর্যন্ত বিসিএস ক্যাডারে এটি অন্তর্ভুক্ত নয়। অথচ এর অন্তর্ভুক্তি অত্যন্ত যৌক্তিক এবং প্রয়োজনীয়। নিচে এর পক্ষে কিছু গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি উপস্থাপন করা হলো:
✅ ১. পরিবেশগত সংকট মোকাবেলায় দক্ষ জনবল প্রয়োজন
বাংলাদেশ একটি জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, বায়ু দূষণ ইত্যাদি প্রতিনিয়ত মানুষের জীবন ও জীবিকাকে হুমকির মুখে ফেলছে। এসব সমস্যা মোকাবেলায় পরিবেশ বিজ্ঞান বিষয়ে প্রশিক্ষিত জনবল দরকার, যারা বাস্তবসম্মত নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে দক্ষ হবে।
✅ ২. জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সহায়তা
বাংলাদেশ প্যারিস চুক্তি, SDG (Sustainable Development Goals), ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক পরিবেশ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে পরিবেশ-বিষয়ক দক্ষ কর্মকর্তা নিয়োগ দিতে হবে, যা পরিবেশ বিজ্ঞান পাস করা প্রার্থীরা পূরণ করতে পারবে।
✅ ৩. টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs) অর্জনের জন্য
SDG-এর ১৭টি লক্ষ্যের মধ্যে অন্তত ৮টি সরাসরি পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদ-সংশ্লিষ্ট। যেমন:
SDG 6: বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন
SDG 13: জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা
SDG 14: সামুদ্রিক সম্পদ সংরক্ষণ
SDG 15: স্থলজ সম্পদের ব্যবহার ও সংরক্ষণ
এই লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নে পরিবেশ বিজ্ঞানীরা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন।
✅ ৪. সরকারি নীতিমালায় পরিবেশ বিষয়ক গুরুত্ব
বাংলাদেশের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় যেমন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, পরিবহন মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয় ইত্যাদিতে পরিবেশ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের প্রয়োজন হয়। অথচ এসব জায়গায় এখনো অন্য বিষয়ভিত্তিক ক্যাডাররা নিয়োজিত। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের নিয়োগ দিলে তারা বিষয়ভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে আরও দক্ষ হবেন।
✅ ৫. বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিনের শিক্ষা কার্যক্রমের স্বীকৃতি দেওয়া
১৯৯৭ সালে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হওয়া পরিবেশ বিজ্ঞান বর্তমানে দেশের অনেক পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু আছে। হাজার হাজার শিক্ষার্থী প্রতিবছর এ বিষয়ে গ্র্যাজুয়েশন করছে। কিন্তু বিসিএস ক্যাডারে সুযোগ না থাকায় তারা হতাশ হয় এবং মেধার অপচয় ঘটে।
✅ ৬. পরিবেশ অধিদপ্তর ও অন্যান্য সংস্থায় জনবল সংকট
পরিবেশ অধিদপ্তর, বন বিভাগ, জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ড, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগসহ অনেক সংস্থায় পরিবেশ সংশ্লিষ্ট দক্ষ জনবল প্রয়োজন। কিন্তু বিষয়ভিত্তিক বিসিএস ক্যাডার না থাকায় এই চাহিদা পূরণ হচ্ছে না।
✅ ৭. সবচেয়ে সময়োপযোগী ও ভবিষ্যতমুখী বিষয়
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আগামী দশকগুলোতে পরিবেশ বিজ্ঞান আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। উন্নত দেশগুলোতে এ বিষয়টি সরকারি চাকরিতে অগ্রাধিকার পায়। বাংলাদেশেও সময় এসেছে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখার।
✅ ৮. আন্তঃবিভাগীয় সহযোগিতা বাড়বে
পরিবেশ বিজ্ঞানীরা পরিবেশ, কৃষি, নগর উন্নয়ন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবহন প্রভৃতি ক্ষেত্রে আন্তঃবিভাগীয় কাজ করতে পারে। এতে সরকারের সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সুবিধা হবে।
পরিবেশ বিজ্ঞান বর্তমানে শুধু একটি একাডেমিক ডিসিপ্লিন নয়, বরং একটি জরুরি বাস্তব প্রয়োজন। তাই, পরিবেশ বিজ্ঞানকে বিসিএস ক্যাডারে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত, যাতে পরিবেশ সংরক্ষণ ও টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে সরকার দক্ষ জনবল পায় এবং দেশ ভবিষ্যতের জন্য আরও প্রস্তুত হতে পারে।
মোঃ সাইফুল আলম বাবু
পরিবেশ বিজ্ঞান ডিসিপ্লিন
১৭ ব্যাচ, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়।