01/08/2015
এই লেখাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ সকলকে পড়ার জন্য অনুরোধ করা হলো.... ইত্তিহাদ
সুদভিত্তিক অর্থব্যবস্থার বিকল্প : মুফতি তাকি উসমানী
মে ২১, ২০১৪ কোরআনের আলো, গবেষনা প্রতিবেদন,
আলোচ্য বিষয় হলো ইসলামে সুদের বিকল্প কি হতে পারে, তা নিয়ে।
সুদী ব্যবস্থার বিকল্প
আরও একটি প্রশ্ন আছে, যেটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যা আজকাল মানুষের মনে জাগ্রত হচ্ছে। প্রশ্নটি হলো, আমরা একথা স্বীকার করি যে, ‘ইন্টারেস্ট’ হারাম। কিন্তু যদি ‘ইন্টারেস্ট’ কে বিলুপ্ত করে দেওয়া হয়, তাহলে এর বিকল্প পদ্ধতিটা কী হবে, যার মাধ্যমে অর্থনীতিকে পরিচালনা করা হবে? কারণ বর্তমানে সমগ্র বিশ্বে অর্থনীতির প্রাণ ‘ইন্টারেস্টে’র উপর প্রতিষ্ঠিত। এর প্রাণটিকে যদি বের করে দেওয়া হয়, তাহলে তো একে পরিচলনা করার মতো দ্বিতীয় কোনো পদ্ধতি চোখে পড়ছে না।
এজন্য মানুষ বলছে, ইন্টারেস্ট’ ছাড়া দ্বিতীয় কোনো ব্যবস্থার অস্তিত্বই নেই। থাকেও যদি, তাহলে তা বাস্তবায়নযোগ্য নয়। তদপুরি কারও কাছে যদি বাস্তবায়নযোগ্য কোনো ব্যবস্থা থাকে, তাহলে তিনি সেটি উপস্থাপন করুন। তিনি বলুন, সেটি কী?
এই প্রশ্নটির উত্তর দীর্ঘ আলোচনা-সাপেক্ষ। এক বৈঠকে একে সহজবোধ্য ও সাধারণ ভাষায় ব্যক্ত করা সহজও নয়। তবে আমি বিষয়টিকে সহজবোধ্য উপায়ে বোঝানোর চেষ্টা করছি, যাতে আপনারা বুঝতে সক্ষম হন।
ইসলাম অপরিহার্য বিষয়াবলীকে নিষিদ্ধ সাব্যস্ত করেনি। সবার আগে এ কথাটি বুঝে নিন যে, আল্লাহ যখন কোনো বস্তুকে হারাম সাব্যস্ত করেছেন, তখন সেটি হারামই। এমতাবস্থায় এটা সম্ভবই নয় যে, সেই বস্তুটি মানুষের জন্য অপরিহার্য হবে এবং মানুষ সেই বস্তুটি ব্যতীত চলতে পারবে না। কারণ সেই বস্তুটি যদি অপরিহার্য হতো, তাহলে আল্লাহ তাকে হারাম সাব্যস্ত করতেনই না। কারণ পবিত্র কুরআনে আল্লাহ পাক বলেন-
আল্লাহ মানুষকে এমন কোনো আদেশ করেন না, যেটি পালন করা তার সাধ্যের অতীত। [সূরা বাকারা : ২৮৬] কাজেই একজন মুমিনের জন্য এতটুকু কথাই যথেষ্ট যে, একটি বিষয়কে আল্লাহ পাক যখন হারাম সাব্যস্ত করেছেন, তাহলে আল্লাহর এই হারাম করাই প্রমাণ করে, এটি মানুষের জন্য অপরিহার্য নয়। এটি ছাড়াও মানুষের পক্ষে চলা সম্ভব। এর মাঝে কোনো অসুবিধা আছে অবশ্যই। একথা বলা যাবে না যে, এটি ছাড়া কাজ চলবে না এবং এটি অপরিহার্য বিষয়।
‘সুদী ঋণে’র বিকল্প ‘হাসান ঋণ’ই নয়
দ্বিতীয় কাথাটি হলো, কিছু লোক মনে করে, ‘ইন্টারেস্ট’ যাকে পবিত্র কুরআন হারাম সাব্যস্ত করেছে- তার অর্থ হলো, আগামীতে যখন কাউকে ঋণ প্রদান করা হবে, তখন তাকে সুদবিহীন ঋণ দেবে এবং তার জন্য কোনো মুনাফা দাবি করবে না। এর অর্থ দাঁড়ায় যে, যখন ‘ইন্টারেস্ট’ বিলুপ্ত হয়ে যাবে, তখন আমরা সুদবিহীন ঋণ পাব আর সেই ঋণের টাকা দ্বারা আমরা বাড়ি নির্মাণ করব, মিল-কারখানা স্থাপন করব এবং আমাদের নিকট থেকে কেউ ‘ইন্টারেস্ট’ দাবি করবে না। আর এই চিন্তার উপরই ভিত্তি করে মানুষ বলছে, এই পন্থাটি গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ এমন ঋণ কেউ দেবে না।
সুদী ঋণের বিকল্প ১ .‘অংশীদারিত্ব’
মনে রাখবেন, ‘ইন্টারেস্ট’ -এর বিকল্প (অল্টানেটিভ) ‘করজে হাসানা’ নয় যে, আপনি কাউকে এমনিতেই ঋণ দিয়ে দেবেন। বরং তার বিকল্প হলো, ‘অংশীদারিত্ব’। অর্থাৎ কেউ যদি ব্যবসার জন্য ঋণ গ্রহণ করে, তাহলে ঋণদাতা একথা বলতে পারে, আমি তোমার ব্যবসায় অংশীদার হতে চাই। ব্যবসায় যদি তোমার লাভ হয়, তাহলে তার একটি অংশ আমাকে দিতে হবে। আর যদি লোকসান হয়, তাহলে আমি তাতেও তোমার অংশীদার হবো। এভাবে ঋণদাতা এই ব্যবসার লাভ-লোকসানে অংশীদার হয়ে যাবে এবং ব্যবসাটি অংশীদারিত্বের ব্যবসায় পরিণত হবে। এই হলো ‘ইন্টারেস্ট’ এর বিকল্প পদ্ধতি (অল্টানেটিভ সিস্টেম)।
এই অংশীদারিত্বের তাত্ত্বিক দিকটি আমি আপনাদের সম্মুখে আগেও উপস্থাপন করেছি যে, ‘ইন্টারেস্ট’ পদ্ধতিতে সম্পদের অতি সামান্য অংশ ডিপোজিটারদে হাতে যায়। কিন্তু যদি অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কারবার পরিচালনা করা হয় এবং অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে পুঁজি বিনিয়োগ (ফাইন্যান্সিং) করা হয়, তাহলে এই পদ্ধতিতে ব্যবসায় যা মুনাফা হবে, তার একটি যৌক্তিক অংশ বিনিয়োগকারীদের হাতে যাবে। আর এই পদ্ধতিতে সম্পদের বণ্টন (ডিষ্ট্রিবিউশন অপ ওয়েল) উপরের দিকে যাওয়ার পরিবর্তে নিচের দিকে আসবে। কাজেই ইসলাম যে বিকল্প ব্যবস্থা উপস্থাপন করেছে, সেটি হলো, ‘অংশীদারিত্বের ব্যবস্থা’।
কিন্তু এই অংশীদারিত্বের ব্যবস্থা যেহেতু বর্তমান পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত কোথাও চালু হয়নি এবং তার অনুসরণ শুরু হয়নি, তাই তার বরকতও মনুষের সম্মুখে আসছে না। সাম্প্রতিককালে এই ২০-২৫ বছর হলো, মুসলমানদের বিভিন্ন অঞ্চলে এই পদ্ধতিটি চালু করার চেষ্টা চালানো হয়েছে যে, এমন কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত করা হবে, যেটি ‘ইন্টারেস্ট’ পদ্ধতির পরিবর্তে ইসলামি আইন অনুযায়ী পরিচালিত হবে।
আপনাদের জানা থাকার কথা যে, বর্তমানে সারা পৃথিবীতে অন্ততপক্ষে ৮০ থেকে ১০০টি ব্যাংক ও বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান আছে, যেগুলোর দাবি হলো, আমরা ইসলামি নিয়ম-নীতি অনুসারে কারবার পরিচালনা করছি এবং সুদমুক্ত ব্যবসা করছি। আমি একথা বলছি না যে, তাদের এই দাবি শতভাগ সঠিক। বরং হতে পারে, তাতে কিছু ভুল-ত্রুটিও আছে। কিন্তু একথাটি সত্য যে, বর্তমান পৃথিবীতে প্রায় একশ প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংক সুদবিহীন ব্যবস্থার উপর কাজ করছে। উক্ত ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানগুলো অংশীদারিত্ব পদ্ধতির বাস্তবায়ন শুরু করে দিয়েছে। আর যেখানেই অংশীদারিত্বের পদ্ধতিটিকে গ্রহণ করা হয়েছে, সেখানেই তার ভালো সুফল পাওয়া গেছে।
আমরা পাকিস্তানে একটি ব্যাংকে এই পদ্ধতিটি পরীক্ষা করেছি। আমি নিজে উক্ত ব্যাংকের ‘মাযহাবী নেগরান কমিটির (ধর্মীয় তত্ত্বাবধান পরিষদ) একজন সদস্য হওয়ার সুবাদে ব্যাংকটির কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত আছি। এই ব্যাংক ‘অংশীদারিত্ব’ নীতির ভিত্তিতে ডিপোজিটারদেরকে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত মুনাফা প্রদান করেছে। কাজেই এই ‘অংশীদারিত্ব’ পদ্ধতিটিকে যদি ব্যাপকভাবে চালু করা যায়, তাহলে এর ফলাফল আরও ভালো হতে পারে।
‘অংশীদারত্ব’ বাস্তবায়নগত জটিলতা
কিন্তু এই পদ্ধতিতে বাস্তবায়নগত একটি জটিলতাও আছে। তাহলো যেমন এক ব্যক্তি অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে ব্যাংক থেকে বিনিয়োগ নিল। আর অংশীদারিত্ব মানে লাভে ও লোকসানে অংশগ্রহণ। অর্থাৎ যদি ব্যবসায় লাভ হয়, তাতেও অংশীদার হবে এবং যদি লোকসান হয়, তাতেও অংশীদার হবে। কিন্তু আক্ষেপের বিষয় হলো, খোদ আমাদের মুসলিম বিশ্বে অসততা ও অবিশ্বস্ততা এত বেশি ও এত ব্যাপক যে, কোনো ব্যক্তি যদি এই ভিত্তির উপর ব্যাংক থেকে বিনিয়োগ নিতে পারে যে, লাভ হলে লাভ এনে দেব আর লোকসান হলে ব্যাংকও তার অংশীদার হবে, তাহলে বিনিয়োগ গ্রহীতা বিনিয়োগ নিয়ে ব্যাংক থেকে বিদায় নেওয়ার পর আর ফিরে আসবে না। সে ব্যাংককে শুধু লোকসানই দেখাবে এবং মুনাফা দেওয়ার পরিবর্তে উল্টো ব্যাংকের কাছে লোকসানের ভর্তুকি দাবি করবে। অংশীদারিত্ব পদ্ধতির বাস্তাবায়নগত দিকের এটি একটি গুরুতর সমস্যা। কিন্তু এই সমস্যার সম্পর্ক অংশীদারিত্ব সিস্টেমের সঙ্গে নয়। বরং এর সম্পর্ক সেই মানুষের ত্রুটির সঙ্গে, যারা এই ব্যবস্থার অনুসরণ করছে।
তাদের মাঝে উত্তম চরিত্র, সততা ও আমানত নেই। আর একারণেই ‘অংশীদারিত্ব’ পদ্ধতির মাঝে এই ঝুঁকি বিরাজমান যে, মানুষ ব্যাংক থেকে ‘অংশীদারিত্বের চুক্তিকে ঋণ নেবে আর পরে ব্যবসায় লোকসান দেখিয়ে ব্যাংকের মাধ্যমে ডিপোজিটারদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
এই জটিলতার সমাধান
কিন্তু এটি সামাধান-অযোগ্য কোনো সমস্যা নয়। এটি এমন কোনো সমস্যা নয় যে, এর কোনো সমাধান খুঁজে বের করা যাবে না। কোনো রাষ্ট্র যদি ‘অংশীদারিত্ব’ ব্যবস্থাকে গ্রহণ করে নেয়, তাহলে সেই দেশ অনায়াসেই এই সমস্যার সমাধান বের করে নিতে সক্ষম হবে। যার সম্পর্কে প্রকাশিত হবে, বিনিয়োগ গ্রহণের পর সে অসততার পরিচয় দিয়েছে এবং তার একাউন্টস প্রদর্শনে দুর্নীতির আশ্রয় গ্রহণ করেছে, তাহলে সরকার তাকে দীর্ঘ একটি সময়ের জন্য কালো তালিকাভুক্ত করে দেবে এবং ভবিষ্যতে কোনো ব্যাংক তাকে ফাইন্যান্সিং-এর কোনো সুবিধা সরবরাহ করবে না।
এই ব্যবস্থা গ্রহণ করলে মানুষ অসততা প্রদর্শন ও দুর্নীতির আশ্রয় নিতে ভয় পাবে। বর্তমানেও বিভিন্ন ‘জয়েন্ট স্টক কোম্পানী’ কাজ করছে এবং তারা তাদের ব্যালেন্স সীট প্রকাশ করছে। সেই সীটে দুর্নীতিও হচ্ছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা তাতে মুনাফা দেখাচ্ছে। কাজেই ‘অংশীদারিত্ব’ ব্যবস্থাটিকে যদি রাষ্ট্রীয়ভাবে গ্রহণ করে নেওয়া হয়, তাহলে এই সমাধানটিকেও অবলম্বন করা যেতে পারে। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত এই ব্যবস্থাটিকে রাষ্ট্রীয় পর্যায় গ্রহণ করা না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত বেসরকারি পর্যায় এই ব্যবস্থার বাস্তবায়ন খুবই কঠিন কাজ। তবে কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সিলেক্টেড কাথাবার্তার মাধ্যমে ‘অংশীদারিত্ব’ করতে পারে।
দ্বিতীয় বিকল্প পদ্ধতি ‘ইজারা’
তাছাড়া আল্লাহ পাক ইসলামের আদলে আমাদেরকে এমন একটি দ্বীন দান করেছেন, যার মধ্যে ‘মুশারাকা’ বাদেও ব্যাংকিং ও ফাইন্যান্সিং-এর আরও বহু পদ্ধতি আছে। যেমন একটি পদ্ধতি ‘ইজারা’ (লিজিং)। পদ্ধতিটা হলো, এক ব্যক্তি বিনিয়োগের জন্য ব্যাংকে আবেদন জানাল। ব্যাংক তাকে জিজ্ঞেস করল, আপনার কোন কাজে টাকা দরকার? তিনি বললেন, কারখানার জন্য আমার বিদেশ থেকে একটি মেশিন আমদানি করতে হবে। ব্যাংক তাকে টাকা দিল না; বরং নিজেরা মেশিন কিনে ভাড়ার চুক্তিতে তাকে দিয়ে দিল। পরিভাষায় এই কাজটিকে ‘ইজারা’ বা ‘লিজিং’ বলা হয়। কিন্তু আজকাল ফাইন্যান্সিং প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকগুলোতে ‘ফাইন্যান্সিং লিজিং’ এর যে পদ্ধতিটি চালু আছে, তা শরিয়তসম্মত নয়। এর এগ্রিমেন্টে অনেকগুলো ধারা (ক্লজিজ) শরিয়ত পরিপন্থী। তবে একে খুব সহজেই শরিয়তসম্মত বানিয়ে নেওয়া যায়। পাকিস্তানে একাধিক ফাইন্যান্সিং প্রতিষ্ঠান এমন আছে, যেগুলোর লিজিং এগ্রিমেন্ট শরিয়তসম্মত।
তৃতীয় বিকল্প পদ্ধতি ‘মুরাবাহা’
অনুরূপ আরও একটি পদ্ধতি আছে, আপনারা যার নাম শুনে থাকবেন। সেটি হলো, ‘মুরাবাহা ফাইন্যান্সিং’। এটিও অপরের সঙ্গে লেনদেন করার একটি পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে লাভের ভিত্তিতে পণ্যটি বিক্রি করে দেওয়া হয়। মনে করুন, এক ব্যক্তি কাঁচামাল ক্রয়ের জন্য ব্যাংক থেকে ঋণের আবেদন জানাল। কিন্তু ব্যাংক তাকে টাকা না দিয়ে সেই মালটি ক্রয় করে লাভের ভিত্তিতে তার কাছে বিক্রি করল। ইসলামে এই পদ্ধতিও জায়েয।
অনেকে মনে করে, এই পদ্ধতি তো হাত ঘুরিয়ে কান ধরার মতো হয়ে গেল। কারণ এখানে ব্যাংক এক পদ্ধতির পরিবর্তে আরেক পদ্ধতিতে মুনাফা আদায় করে নিল। কিন্তু তাদের এই বক্তব্য সঠিক নয়। কারণ পবিত্র কুরআনে আল্লাহ পাক বলেছেন-
আল্লাহ তাআলা ক্রয়-বিক্রয়কে হালাল আর রিবা হারাম করেছেন। [সূরা বাকারা : ২৭৫] এটি আল্লাহ পাকের সিদ্ধান্ত। কাজেই এখানে মানুষের প্রশ্ন তুলবার কোনোই সুযোগ নেই। তাছাড়া মক্কার মুশরিকরাও এই যুক্তির অবতারণা করত। তারা বলত, ক্রয়-বিক্রয় তো রিবারই মতো। ক্রয় বিক্রয়েও মানুষ মুনাফা অর্জন করে, রিবায়ও মুনাফা অর্জন করে। কাজেই দুয়ের মাঝে পার্থক্যটা কী? পবিত্র কুরআন তাদেরকে একটিই উত্তর দিয়েছিল যে, এটি আমার বিধান যে, রিবা হারাম আর ক্রয়-বিক্রয় হালাল।
এর অর্থ হলো, মুদ্রার বিনিময়ে মুদ্রা নেওয়া যায় না এবং মুদ্রার উপর অতিরিক্ত মুদ্রা নেওয়া যায় না। কিন্তু মধ্যখানে যদি কোনো বস্তু কিংবা ব্যবসাপণ্য এসে পড়ে এবং সেই পণ্য বিক্রি করে মুনাফা করে, তাহলে আমি তাকে হালাল ঘোষণা করলাম। আর মুরাবাহা পদ্ধতিতে মধ্যখানে পণ্য আসছে। এজন্য ইসলামের আইনে এই ক্রয়-বিক্রয় বৈধ।
পছন্দনীয় বিকল্প কোনটি?
কিন্তু এই ‘মুরাবাহা’ ও ‘লিজিং’ কাক্সিক্ষত ও পছন্দনীয় বিকল্প নয় এবং এর দ্বারা সম্পদ বণ্টনের উপর মৌলিক কোনো প্রভাব পড়ে না। পছন্দনীয় বিকল্প হলো ‘মুশারাকা’। কিন্তু আগামীতে যেসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তৈরি করা হবে, তাদের জন্য পরীক্ষামূলক মেয়াদে মুরাবাহা ও লিজিং পদ্ধতির উপর কাজ করার সুযোগ আছে। বর্তমানে কিছু ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশন এসব ভিত্তির উপর কাজ করছে। এ হলো, সুদ ও তদসম্পর্কিত বিষয়ে সাধারণ কথা, যা আমি আপনাদের সম্মুখে উপস্থাপন করলাম।
সুদ সম্পর্কিত আরও একটি মাসআলা আছে, যার প্রতিধ্বনি বারবার কানে আসছে। তাহলো অনেকে বলছে, দারুল হারবে- যেখানে অমুসলিমদের শাসন চলছে, সুদী লেনদেন কোনো সমস্যা নেই। সেসব দেশে অমুসলিম সরকার থেকে সুদ নেওয়া যায়। এ মাসআলাটির উপর সুদীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, চাই দারুল হারব হোক, চাই দারুল ইসলাম, সুদ সবখানেই হারাম। সুদ দারুল ইসলামে যেমন হারাম, তেমনি দারুল হারবেও হারাম; তবে অমুসলিম রাষ্ট্রে মুসলমানরা যেন অবশ্যই ব্যাংকে কারেন্ট একাউন্ট ব্যবহার করে, সেখানে আমানতের উপর কোনো সুদ আসে না।
যদি কেউ ভুলবশত সেভিংস একাউন্ট ব্যবহার করে ফেলে, তাহলে তাতে যে সুদ আসে, পাকিস্তানে তো তারা মানুষদের বলে দেই যে, সুদের অর্থ ব্যাংকেই রেখে দিন। কিন্তু যেসব দেশে এমন অর্থ ইসলামের বিরুদ্ধে ব্যয়িত হয়, সেসব দেশে মুসলমানদের উচিত, সুদের অর্থ ব্যাংক থেকে তুলে সওয়াবের নিয়ত ব্যতীত যাকাত খাওয়ার উপযুক্ত কোনো ব্যক্তিকে দান করে দেওয়া এবং সেই অর্থ নিজের কাজে না লাগানো।
আধুনিক যুগে ইসলামি অর্থনীতির প্রতিষ্ঠান
আমি আরও একটি কাজের কথা বলতে চাই। কাজটি তুলনামূলকভাবে কিছুটা কঠিন মনে হচ্ছে। কিন্তু তথাপি সাধ্যপরিমাণ চেষ্টা করা দরকার। কাজটি হলো, আমরা নিজেরা এমন একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান দাঁড় করাব, যেটি ইসলামি ভিত্তির উপর কাজ করবে। আর যেমনটি আমি এইমাত্র বলেছি যে, ‘মুশারাকা’ ‘মুরাবাহ’ ও ‘লিজিং’ পদ্ধতির পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা প্রস্তুত আছে এবং সেসব ভিত্তির উপর মুসলমানরা নিজস্ব প্রতিষ্ঠান দাঁড় করাতে পারে। এখানকার মুসলমানরা মাশাআল্লাহ এই বিষয়টি বোঝে এবং এর মাঝে স্বয়ং তাদের জন্য সমস্যাবলীর সমাধানও আছে। তাদের উচিত, এখানে বসে ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত করা। আমেরিকায় আমার জানামতে কমপক্ষে হাউজিং-এর সীমা পর্যন্ত দুটি প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান আছে এবং তারা সঠিক ইসলামি ভিত্তির উপর কাজ করছে। তার একটি টরেন্টোতে, অপরটি লসএনজেলস-এ।
এখন এ জাতীয় প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ানো দারকার এবং মুসলমানদেরকে নিজেদের মতো করে এ ধরণের প্রতিষ্ঠান দাঁড় করানো আবশ্যক। কিন্তু তার জন্য বুনিয়াদি শর্ত হলো, কাজটি করতে হবে বিজ্ঞ ফকীহ ও মুফতিদের পরামর্শ অনুপাতে। আপনারা যদি এ কাজে আমার থেকেও সহযোগিতা নিতে চান, আমি আপনাদেরকে সব ধরণের সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত আছি। যেমনটি আমি বলেছি, বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় একশটি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে এবং প্রায় পাঁচ বছর যাবত আমি সেই প্রতিষ্ঠানগুলোতে খেদমতে নিয়োজিত আছি।
মহান আল্লাহ আপনাদেরকেও এই কাজের তাওফিক দান করুন এবং মুসমানদের জন্য ভালো একটি পথ বের করে দিন । আমিন।
ভাষান্তর :মুফতি মুহিউদ্দিন কাশেমী, কলামিস্ট।