14/06/2023
আজ ১৪ই জুন আন্তর্জাতিক রক্তদাতা দিবস। ১৯৯৫ সাল থেকে রক্তদান দিবস ও ২০০৪ সাল থেকে আন্তর্জাতিক রক্তদাতা দিবস পালিত হয়ে আসছে। ২০০৫ সাল থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিশ্বব্যাপি আন্তর্জাতিক রক্তদাতা দিবস পালনের উদ্যোগ নেয়। এর উদ্যোক্তা রাষ্ট্র ছিল আলজেরিয়া।
অগনিত মুমূর্ষু রোগীকে বাঁচিয়ে তুলছেন রক্তদাতাগণ রক্ত দিয়ে। আমাদের দেশে রক্তদান নিয়ে মানুষ তেমনভাবে সচেতন না হলেও ইদানিং মানুষ এ ব্যাপারে সচেতন হচ্ছে। বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, রক্ত দাতাদের সংগঠন মানুষকে রক্তদানে উৎসাহিত করছে ও এর গুরুত্ব বোঝাচ্ছে। এরই ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশে স্বেচ্ছায় রক্তদাতার হার দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। রক্তদান করে যে শুধু মানুষের জীবন বাঁচানো যায়..... বিষয়টি এমন নয়। বরং যিনি রক্তদান করেন তিনি বিভিন্নভাবে উপকৃত হন। তিনি তার রোগ সম্পর্কে জানতে পারেন, তার শরীরে নতুন রক্ত তৈরি হয় ফলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। ইসলামের দৃষ্টিতে রক্তদান একটি মহৎ কাজ। মহান আল্লাহ পাক পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেন, "যে ব্যক্তি কোনো মানুষের প্রাণ রক্ষা করল, সে যেনো সব মানুষের প্রাণ রক্ষা করল।" (সূরা আল মায়িদা, আয়াত ৩২) । এছাড়াও, নবী (স.) ঘোষণা করেছেন, " তোমাদের কেউ তার অন্য ভাইয়ের উপকার করতে সক্ষম হলে, সে যেন তা করে।" ( সহিহ মুসলিম)।
রক্তদানের ইতিহাস: রক্তের বিভিন্ন গ্রুপের ও ট্রান্সফিউশন মেডিসিনের জনক অষ্ট্রিয়ার বিজ্ঞানী টার্ল ল্যান্ডস্টেইনার। তিনি ১৮৬৮ সালের ১৪ই জুন জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯০০ সালে রক্তের গ্রুপ আবিষ্কার করেন এবং এ আবিষ্কারের জন্য ১৯৩০ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান। তার জন্মদিনকে স্মরণীয় করে রাখতেই ১৪ই জুন রক্তদাতা দিবস পালন করা হয়।
রক্ত মানবদেহের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। শরীরে পর্যাপ্ত পরিমাণে রক্ত থাকলে শরীর থাকে সজিব ও সক্রিয়। আর শরীরে রক্তশূন্যতা বা এ্যানিমিয়া দেখা দিলেই শরীর অকেজো ও দুর্বল হয়ে পড়ে। জীবন বাঁচাতে রক্ত এতই গুরুত্বপূর্ণ যে, বলা হয় 'করিলে রক্তদান, বাঁচিবে একটি প্রাণ', 'আপনার রক্ত দিন, একটি জীবন বাঁচান', 'সময় তুমি হার মেনেছ রক্তদানের কাছে, ১০ মিনিট করলে খরচ একটি জীবন বাঁচে।' বাংলাদেশে প্রতিবছর ৫-৭ লক্ষ ব্যাগ রক্ত লাগে যার মাত্র ৩১ শতাংশ পাওয়া যায় স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের মাধ্যমে। বাকী রক্তের চাহিদা পেশাদার রক্তদাতা ও আত্মীয়-স্বজনের নিকট থেকে পূরণ করা হয়।
রক্তদানের যোগ্যতা: সাধারণ কারও বয়স ১৮-৬০ বছরের মধ্যে ও ওজন ৪৫ কেজির বেশি হলেই রক্তদান করতে পারেন। একজন ব্যক্তির শরীরে তার ওজনের প্রতি কেজির জন্য ৬৬ মিলিগ্রাম রক্ত থাকে। এবং ঐ ব্যক্তির শরীরে বিদ্যমান মোট রক্তের ৮-১২% রক্তদান করতে পারেন। তবে, ১০% কে আদর্শ মান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ধরা যাক, একজন ব্যক্তির ওজন ৫০ কেজি। সুতরাং, তার শরীরে মোট রক্ত আছে (৫০*৬৬=৩,৩০০ মিলিগ্রাম)। সুতরাং, ঐ ব্যক্তি ৩,৩০০ মিলিগ্রাম এর ১০% অর্থাৎ ৩৩০ মিলিগ্রাম রক্তদান করতে পারবেন। রক্তদান করার জন্য একজন দাতার শরীর ৫টি রোগ হতে মুক্ত হতে হয়। যথা: হেপাটাইটিস বি, হেপাটাইটিস সি, এইডস, ম্যালেরিয়া, সিফিলিস। রোগের স্কিনিং করার পর দাতার শরীর এসব রোগ মুক্ত হলেই তার শরীর থেকে রক্ত নেয়া যাবে। একইসাথে রোগীর ও দাতার রক্তের গ্রুপ ও ক্রস ম্যাচিং করতে হবে।
যারা রক্ত দিতে পারবে না:
১. রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কম থাকলে। ( পুরুষ ১২ গ্রাম/ডেসিলিটার ও নারী ১১ গ্রাম/ডেসিলিটার)
২. রক্তচাপ ও শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক না থাকলে।
৩. শরীরে কোনো রোগ থাকলে। যেমন: হেপাটাইটিস বি, হেপাটাইটিস সি, ম্যালেরিয়া, এইডস, সিফিলিস, হাঁপানি, এলার্জি , হৃদরোগ বা অন্য কোনো জটিল রোগ থাকলে।
৪. অন্তঃসত্ত্বা নারী, ঋতুস্রাব চলাকালীন ও সন্তান প্রসবের ১বছরের মধ্যে।
৫. ৬ মাসের মধ্যে বড় কোনো অপারেশন হলে। কোনো টিকা বা ভ্যাকসিন নিলে, কেমোথেরাপি নিলে, এন্টিবায়োটিক নিলে।
রক্তদানের উপকারিতা:
রক্তদানে দাতার কোনো ক্ষতি হয় না। বরং নানাবিধ উপকারিতা রয়েছে। যেমন:
১. রক্তদানের ফলে উচ্চ রক্তচাপ কমে ও রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমে ফলে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক এর ঝুঁকি কমে।
২. রক্তদানের সময় শরীরের বিভিন্ন রোগ ব্যাধি টেস্ট করা হয়, ফলে রক্তদাতা তার রোগ ব্যাধি সম্পর্কে জানতে পারে।
৩. রক্তদান দাতার শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
৪. রক্তদানের মাধ্যমে শরীরের আয়রণ দূর হয়, ফলে শরীর সুস্থ থাকে।
৫. বিভিন্ন সংস্থা রক্তদাতার পর একটি ডোনার কার্ড দেয়। যে কোনো সময়ে , জরুরি প্রয়োজনে কার্ড দেখিয়ে ঐ সংস্থা থেকে রক্ত সংগ্রহ করা হয়।
৬. মানবিক, সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে রক্তদান একটি মহৎ কাজ, ধর্মীয়ভাবেও তা স্বীকৃত।
তাই, আমাদের রক্তদানে সচেতন হতে হবে ও পরিচিতদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে তাদের রক্তদানে উৎসাহিত করতে হবে।
লেখা:
সোহেল রানা