18/11/2022
দুই গ্রামকে আলোয় ফেরাল যে সমিতি
২০০২ সালে মাত্র ৩০ জন সদস্য নিয়ে যাত্রা শুরু করে গড়ুর সমবায় সমিতি তরুণ-বৃদ্ধ, ছাত্র, ব৵বসায়ী, কিষান-কিষানি, শিক্ষক নিয়ে এখন এর সদস্য ৮২ জন। এর মধ্যে নারী ১৬ জন। সমিতির সদস্য নাহিদুর রহমান, আবু রাসেল হুদা তখন সবে স্নাতকে পড়েন। নানা দিবসে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, খেলাধুলা ও বনভোজনের উদ্যোগ নিতেন। সে সময় গ্রামের বিভিন্ন সমস্যা ভাবিয়ে তুলে তাঁদের।
বড়দের সঙ্গে বসে আলোচনা করেন। প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন গ্রামকে নিরক্ষরমুক্ত ও বাল্যবিবাহমুক্ত করার। এরপর নানা বয়সী ৩০ জনকে নিয়ে কমিটি করেন। প্রতি সদস্য মাসিক ১০০ টাকা হারে চাঁদা জমা দেওয়া শুরু করেন। নাহিদের বাবা রাস্তার পাশে সমিতির ঘর বানিয়ে দিয়ে ৩ শতক জমি লিখে দেন সমিতির নামে। এরই মধ্যে বাড়তে থাকে সমিতির সদস্য ও সঞ্চয়। এখন সমিতির নামে প্রায় ২৫ লাখ টাকা সঞ্চয় আছে। গত বছর তারা ১৪ হাজার টাকা আয়কর দেয়।
সঞ্চয় বাড়ার পেছনে আছে জমা টাকার সর্বোত্তম ব্যবহার—এমন মন্তব্য করে গড়ুর গ্রাম ছাত্রকল্যাণ সমিতির সভাপতি সাজ্জাদ রানা প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের আয়ের মূল উৎস হচ্ছে ইজারা নেওয়া ১৭ বিঘা জমি ও ৫টি পুকুর।সরেজমিনে একদিন
গড়ুর গ্রামের সঙ্গেই লাগোয়া সাঁকোয়া গ্রাম। বেশির ভাগ মানুষ কৃষিকাজ করেন। ওই এলাকায় আবাদি জমি আছে প্রায় ২৫০ হেক্টর। একসময় জমিতে শুধু ধান আবাদ হলেও এখন ভুট্টা, আলু ও বিভিন্ন রকম সবজির চাষ হয়।
গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি বাড়ির আঙিনায় ছোটখাটো সবজি বাগান। মাচাংয়ে ঝুলছে লাউ, চিচিঙ্গা, করলা। দোল খাচ্ছে পুঁইশাক আর লাউয়ের লকলকে ডগা। দুই গ্রাম মিলে ছোট–বড় ২০টি পুকুরে মাছের চাষ হয়। মৌসুমে সবজির বীজ ও চারা সরবরাহ করেন সমিতির সদস্যরা। গড়ে উঠেছে পারিবারিক কৃষি খামার।
আছে স্বীকৃতি
২০০৫ সালে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের তালিকাভুক্তির সনদ পায় গড়ুর গ্রাম ছাত্রকল্যাণ সমিতি। ২০০৯ সালে সমবায় অধিদপ্তর থেকে এবং পরের বছর সমাজসেবা অধিদপ্তরে নিবন্ধনভুক্ত হয় সমিতিটি। ২০১০ সালে স্থানীয় সংসদ সদস্য খালিদ মাহমুদ চৌধুরী (বর্তমান নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী) পরিদর্শনে আসেন। সবকিছু দেখেশুনে পাশে থাকার আশ্বাস দেন। তাঁর সহযোগিতায় নির্মিত হয় সমিতির পাকা ঘর।
কাজের স্বীকৃতিও পেয়েছে সমিতিটি। টানা কয়েক বছর ধরে জেলার শ্রেষ্ঠ সমবায়ী প্রতিষ্ঠান হিসেবে সমবায় অধিদপ্তর থেকে সম্মাননা পেয়েছে। করোনাকালীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখায় ২০২০ সালে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় থেকে পেয়েছে ‘শেখ হাসিনা ইয়ুথ ভলান্টিয়ার অ্যাওয়ার্ড’।
১ নভেম্বর সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবু রাসেল হুদা দেশসেরা সফল সংগঠকের পুরস্কার পেয়েছেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় থেকে। ঢাকার ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেলের কাছ থেকে সম্মাননা স্মারক, সনদ ও নগদ অর্থ বুঝে নেন আবু রাসেল।
উপকারভোগী অনেক
গড়ুর গ্রামের বাসিন্দা প্রশান্ত চন্দ্র রায়ের ধানি জমি আছে পাঁচ বিঘা। এবার আমন ধান লাগানোর আগমুহূর্তে তাঁর মা অসুস্থ হয়ে পড়েন। চিকিৎসার টাকা জোগাড় করতে এক বিঘা জমি বিক্রির সিদ্ধান্ত নেন প্রশান্ত। জানতে পেরে সমিতির সদস্যরা প্রশান্তর হাতে তুলে দেন এক লাখ টাকা। জমি আবাদও তিনিই করবেন। তবে ধান উঠলে সমিতিকে ৬ মণ ধান দিতে হবে—এই ছিল শর্ত। মূল টাকা শোধ করার জন্য প্রশান্ত সময় পাবেন এক বছর। জমি বিক্রি করতে হলো না, মায়ের চিকিৎসার টাকাও জোগাড় হলো। যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন প্রশান্ত।
সর্বশেষ বছর তিনেক আগে গ্রামের এক ব্যক্তি তাঁর ১৪ বছর বয়সী মেয়েকে বিয়ের দেওয়ার আয়োজন করেছিলেন। সমিতির সদস্যরা গিয়ে আয়োজন বন্ধ করেছেন। মেয়েটির পড়াশোনা চালু রাখার ব্যবস্থা করেছেন।
সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবু রাসেল হুদা জানান, মৃত ব্যক্তির দাফন ও সৎকারের জন্যও কমিটি আছে তাঁদের। বিয়েশাদির বিষয়েও সমিতির সদস্যরা থাকেন সব আয়োজনে।
ইউপি চেয়ারম্যানের সঙ্গে সমন্বয় করে ১২ কিলোমিটার রাস্তার দুই পাশে ফলদ ও বনজ গাছের চারা লাগান সমিতির সদস্যরা। ২০০৮ সালে শুরু করা সামাজিক বনায়ন সেসব গাছের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৭০-৭৫ লাখ টাকা।
২০১৬ সালে বিদ্যুৎ–সংযোগ দেওয়া শুরু হয় গড়ুর গ্রামে। এরপর বিদ্যুৎ কার্যালয়ে হাজির হন সমিতির সদস্যরা। তাঁদের আরজি ছিল, পাশাপাশি দুটি গ্রাম। যত দিন দুই গ্রামে বিদ্যুৎ–সংযোগ দেওয়ার ব্যবস্থা হবে না, তত দিন গড়ুর গ্রামের মানুষ বিদ্যুৎ–সংযোগ গ্রহণ করবেন না। অগত্যা দুই গ্রামে একসঙ্গে বিদ্যুৎ–সংযোগ দেয় বিদ্যুৎ বিভাগ।
দিনাজপুরে দীর্ঘদিন চাকরিসূত্রে ছিলেন উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা সালেক খোকন। বর্তমানে তিনি টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলায় কর্মরত। তিনি ওই সমিতির কার্যক্রম খুব কাছ থেকে দেখেছেন। গতকাল মুঠোফোনে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ওই সমিতির এ পর্যায়ে আসার পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো একতা। সম্প্রতি তারা পুরস্কার পেয়েছে। কিন্তু পুরস্কারের চেয়েও বড় কথা, তাদের সম্মিলিত উদ্যোগ এবং সুন্দর সমাজ বিনির্মাণের চিন্তা।