29/08/2026
আমার মায়ের সঙ্গে আমার শেষ কথাটা ছিল,
"মা, পরে কথা বলি।''
মা বলেছিল,
"আচ্ছা।"
আমি ফোন কেটে দিয়েছিলাম।
তারপর আর ফোন করা হয়নি।
মা-ও করেনি।
এটা শুনলে গল্পটা খুব সাধারণ মনে হবে।
এই শহরে প্রতিদিন হাজার হাজার ছেলেমেয়ে মাকে বলে,
"পরে কথা বলবো।"
তারপর পরে আর আসে না।
আমার নাম সোহেল।
বয়স ত্রিশ।
ঢাকায় থাকি।
বাবা মা থাকতো বগুড়ায়।
আমি বছরে দুইবার বাড়ি যেতাম।
ঈদে।
মা প্রতিবারই বলতো,
"আর কয়দিন থাকবি?"
আমি বলতাম,
"দুই দিন।"
মা বলতো,
''তিন দিন থাক।"
আমি বলতাম,
''অফিস আছে।''
মা তখন মুখটা একটু ছোট করে বলতো,
"অফিসের মানুষ তোকে ছাড়া চলে না?"
আমি হাসতাম।
"না।"
মা-ও হাসতো।
আমরা দুজনেই জানতাম, কথাটা মিথ্যা।
অফিস আমাকে ছাড়া দিব্যি চলতো।
শুধু আমার জীবনটা মা ছাড়া চলতো না।
সেটা আমি বুঝিনি।
মা ফোন করতো প্রতিদিন।
সকাল আটটায়।
প্রথমে বলতো,
"ঘুম থেকে উঠছিস?"
আমি বলতাম,
"হ্যাঁ।"
যদিও অনেক সময় তখনও বিছানায়।
তারপর,
"নাশতা করছিস?"
"হ্যাঁ।"
"কী খাস?"
"রুটি।"
"ডিম আছে?"
"আছে।"
সব মিথ্যা।
মা জানতো।
তবু আর কিছু বলতো না।
তারপর জিজ্ঞেস করতো,
"শরীর ভালো?"
আমি বলতাম,
"ভালো।"
মা বলতো,
"আচ্ছা।"
এভাবেই আমাদের প্রতিদিনের কথাবার্তা চলতো।
একটা আশ্চর্য বিষয় ছিল।
মা কখনো নিজের শরীরের কথা বলতো না।
আমি জিজ্ঞেস করলেও বলতো,
"আমি তো ভালোই আছি।"
এই "ভালো আছি" কথাটার উপর আমাদের পুরো পরিবার দাঁড়িয়ে ছিল।
এক রাতে অফিস থেকে ফিরতে অনেক দেরি হলো।
ফোনে মায়ের পাঁচটা মিসড কল।
আমি বিরক্ত হলাম।
ফোন করলাম।
মা ধরেই বললো,
"কোথায় ছিলি?"
"অফিসে।"
"খাইছিস?"
"না।"
"খেয়ে নে।"
আমি বললাম,
"এতবার ফোন করছো কেন?"
ওপাশে কিছুক্ষণ চুপ।
তারপর বললো,
"কিছু না।"
আমি একটু বিরক্ত হয়ে বললাম,
"কিছু না হলে এতো ফোন করো না।"
মা বললো,
"আচ্ছা।"
আমি বুঝতে পারিনি, ঐ "আচ্ছা" শব্দটার মধ্যে কী ছিল।
পরদিন সকালেও ফোন করলো না।
আমি ভাবলাম, রাগ করেছে।
দুপুরে আমিই ফোন করলাম।
বন্ধ।
সন্ধ্যায় আবার।
বন্ধ।
রাতে বাবার ফোন এলো।
আমি ধরলাম।
বাবা বললো,
"তুই এখনই বাড়ি আয়।"
আমি বললাম,
"কেন?"
বাবা বললো,
"তোর মায়ের শরীরটা খারাপ।"
আমি বললাম,
"কী হয়েছে?"
বাবা উত্তর দিলো না।
শুধু বললো,
"আয়।"
রাতের বাসে উঠলাম।
সারাটা পথ একটা কথাই মাথায় ঘুরছিল,
"কিছু না হলে এতো ফোন করো না।"
আমি জানতাম না, মানুষের জীবনে কিছু কিছু বাক্য থাকে, যেটা বলার পর আর ফেরত নেওয়া যায় না।
ভোরে বাড়ি পৌঁছালাম।
মা বিছানায়।
চোখ বন্ধ।
আমি পাশে বসতেই মা চোখ খুললো।
আমাকে দেখে হাসলো।
বললো,
"এত সকালে আসছিস কেন?"
আমি মায়ের হাত ধরলাম।
হাতটা অস্বাভাবিক ঠান্ডা।
বললাম,
"তুমি কেমন আছো?"
মা আগের মতোই বললো,
"আমি তো ভালোই আছি।"
আমি হেসে ফেললাম।
"তুমি সবসময় ভালো থাকো কীভাবে?"
মা বললো,
"তুই থাকলে ভালো থাকি।"
আমি আর কিছু বলতে পারিনি।
দুপুরে ডাক্তার এলো।
বাবাকে বাইরে নিয়ে কিছু কথা বললো।
আমি শুনিনি।
শুনতে চাইনি।
আমাদের মধ্যবিত্ত পরিবারে একটা অদ্ভুত অভ্যাস আছে।
বিপদের কথা যতক্ষণ না সরাসরি বলা হচ্ছে, ততক্ষণ আমরা ধরে নিই বিপদ নেই।
আমি ধরে নিলাম, মা ভালো হয়ে যাবে।
পরের কয়েকদিন আমি মায়ের পাশে ছিলাম।
একদিন দুপুরে মা বললো,
"তোর ফোনটা দে।"
আমি দিলাম।
মা ফোনটা হাতে নিয়ে আমার কললিস্ট দেখলো।
তারপর বললো,
"আমি এত ফোন করি?"
আমি বললাম,
"হুম।"
মা একটু লজ্জা পেল।
"বুড়া হয়ে গেছি তো।"
আমি বললাম,
"বুড়া হওয়ার সঙ্গে ফোন করার সম্পর্ক কী?"
মা বললো,
"তুই বিরক্ত হোস।"
আমি বললাম,
"হই না।"
মা তাকিয়ে রইল।
"মিথ্যা বলিস না।"
আমি হেসে বললাম,
"তুমি তো নিজেই সবসময় মিথ্যা বলো।"
মা বললো,
"আমি কী মিথ্যা বলি?"
আমি বললাম,
"আমি তো ভালোই আছি।"
মা হাসলো।
মা এক সপ্তাহ পর কিছুটা সুস্থ হলো।
আমি ঢাকায় ফিরে এলাম।
যাওয়ার সময় মা বললো,
"পরের মাসে আসিস।"
আমি বললাম,
"আসবো।"
মা বললো,
"কয়দিন?"
আমি বললাম,
"তিন দিন।"
মা বললো,
"পাঁচ দিন থাকিস।"
আমি হেসে বললাম,
"দেখা যাবে।"
বাস ছাড়ার সময় জানালা দিয়ে দেখলাম, মা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে।
খুব ছোট দেখাচ্ছিল।
আমি হাত নাড়লাম।
মা-ও নাড়ল।
তারপর বাস চলে গেল।
কয়েকদিন পর মা ফোন করলো।
সেদিন আমার খুব ব্যস্ততা।
মিটিং।
ফাইল।
ক্লায়েন্ট।
ফোন বেজে উঠলো।
স্ক্রিনে, মা।
আমি কেটে দিলাম।
পাঁচ মিনিট পর আবার।
কেটে দিলাম।
তৃতীয়বার বেজে উঠলে ফোনটা সাইলেন্ট করে ব্যাগে রেখে দিলাম।
সন্ধ্যায় মনে হলো ফোন করি।
করিনি।
রাতে মনে হলো কাল করবো।
পরদিন অফিসে ঢুকতেই বাবার ফোন।
আমি ধরলাম না।
আবার করলো।
ধরলাম।
বাবা বললো,
"তোর মা আর নেই।"
আমি বিশ্বাস করিনি।
কারণ মানুষ যখন সবচেয়ে ভয়ংকর সত্যটা শোনে, প্রথম কাজ হিসেবে সে সত্যটাকে অস্বীকার করে।
আমি বললাম,
"কীভাবে?"
বাবা বললো,
"ঘুমের মধ্যে।"
মায়ের জানাজায় অনেক মানুষ এসেছিল।
আমি সবার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম।
মানুষজন আমাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিল।
কেউ বলছিল,
"শক্ত হও।"
কেউ বলছিল,
"সবাইকে একদিন যেতে হয়।"
কেউ বলছিল,
"মা হারানোর কষ্ট কেউ বোঝে না।"
আমি কারও কথা শুনছিলাম না।
শুধু মনে হচ্ছিল
মা আমাকে শেষবার ফোন করেছিল।
আমি ধরিনি।
তার আগের দিন ফোন করেছিল।
আমি বিরক্ত হয়েছিলাম।
তারও আগে বলেছিল,
"তুই থাকলে ভালো থাকি।"
আমি তখন হাসছিলাম।
মা মারা যাওয়ার কয়েকদিন পর মায়ের ফোনটা হাতে নিলাম।
কললিস্টটা চেক করলাম।
তারপর একটা জিনিস দেখলাম।
মা শুধু আমাকে ফোন করেনি।
আমি ফোন না ধরলে
বাবাকে ফোন করেছে।
বাবা না ধরলে
আমার মামাকে।
মামা না ধরলে
পাশের বাড়ির খালাকে।
কেন?
আমি বুঝতে পারছিলাম না।
সেদিন রাতে আমি মায়ের ঘরে একা শুয়েছিলাম।
মায়ের বালিশে এখনও তার গন্ধ।
আলমারির উপর আমার ছোটবেলার ছবি।
আমি ছবিটা হাতে নিলাম।
ছবিতে আমি স্কুলের পোশাকে।
মা পাশে দাঁড়িয়ে।
আমি মায়ের হাত ধরে আছি।
হঠাৎ মনে হলো
ছবিটা উল্টে দেখি।
পেছনে মা লিখেছিল-
"এই ছেলেটা একদিন বড় হবে। তখন আমার সাথে গল্প করবে।"
তার নিচে আরেকটা লাইন-
"আল্লাহ যেন ততদিন আমাকে রাখেন।"
আমি প্রথমবার হাউমাউ করে কেঁদে ফেললাম।
তারপর কেটে গেছে অনেক বছর।
ততদিনে আমি বিয়ে করেছি।
ছেলের বাবা হয়েছি।
আমি এখনো মাঝে মাঝে মাকে ফোন করি।
জানি, কল ঢুকবে না।
তবু করি।
একদিন আমার ছেলে আমাকে বললো,
"আব্বু, তুমি দাদীকে ফোন করো কেন?"
আমি বললাম,
"অভ্যাস।"
সে বললো,
"দাদী তো মারা গেছে।"
আমি বললাম,
"জানি।"
সে আবার বললো,
"তাহলে?"
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললাম,
"কিছু মানুষ মারা যাওয়ার পরও আমাদের জীবনে থেকে যায়।"
সে বুঝলো না।
ঐ বয়সে আমিও বুঝিনি।
এখন আমি একটা কাজ করি।
সারাদিন ফোনটা হাতে রাখি।
যে মানুষই ফোন করুক; ধরি।
বন্ধু।
আত্মীয়।
অপরিচিত নম্বর।
কেউ যদি বলে,
"ব্যস্ত?"
আমি বলি,
"না।"
যদি বলে,
"পরে কথা বলবো?"
আমি বলি,
"না, এখনই বলো।"
কারণ আমি জানি
মানুষের জীবনে "পরে" বলে কোনো নিশ্চিত সময় নেই।
পরে মানে হতে পারে
এক ঘণ্টা পর।
এক মাস পর।
দশ বছর পর।
আবার কখনো; কোনোদিন না।
আর আজও, মাঝরাতে কখনো কখনো ফোনের স্ক্রিনে মায়ের নামটা দেখে মনে হয় ফোনটা বেজে উঠেছে।
আমি জানি সেটা সত্যি নয়।
তবু নামটার দিকে তাকিয়ে থাকি।
তারপর খুব আস্তে বলি,
"মা, আজ আমি ব্যস্ত না।"
ঘর নীরব থাকে।
কেউ উত্তর দেয় না।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়
সেই নীরবতার মধ্যেই আমি যেন মায়ের পুরোনো গলাটা শুনতে পাই-
"আমি তো ভালোই আছি।"
সোহেল ভাই