22/05/2026
সারচার্জের জায়গায় সম্পদ কর?
বাংলাদেশের আয়কর আইন, ২০২৩ এর ধারা ১৬৫ অনুযায়ী সারচার্জ আরোপের বিধান রয়েছে যেখানে এই ধারায় বলা হয়েছে যে সংসদ কর্তৃক প্রণীত আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট হারে ও প্রকৃতিতে সারচার্জ আরোপ, আদায় ও সংগ্রহ করা হবে এবং ধারা ১৬৫(২) অনুযায়ী আয়করের সাথে সম্পর্কিত সকল বিধান যথাসম্ভব সারচার্জের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে; বর্তমান আইন অনুযায়ী যাদের ঘোষিত সম্পদ ৪ কোটি টাকার বেশি তাদের প্রদেয় করের উপর সর্বোচ্চ ৩৫% পর্যন্ত সারচার্জ প্রযোজ্য হয় তবে NBR এর সাম্প্রতিক প্রস্তাব অনুযায়ী ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেটে বর্তমান সম্পদ সারচার্জের পরিবর্তে একটি নতুন ওয়েলথ ট্যাক্স বা সম্পদ কর চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে যা করদাতার আয়কর রিটার্নে ঘোষিত সম্পদের উপর ভিত্তি করে প্রাথমিকভাবে গণনা করা হবে কারণ সম্পদের বাজার মূল্য নির্ধারণে জটিলতার কারণে প্রথম পর্যায়ে ঘোষিত মূল্য ব্যবহার করা হবে এবং ধীরে ধীরে বাজার মূল্যায়ন ব্যবস্থা উন্নত করা হবে; এই প্রস্তাবিত ওয়েলথ ট্যাক্সের কাঠামো অনুযায়ী ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত সম্পদ করমুক্ত থাকবে, পরবর্তী ২ কোটি টাকা অর্থাৎ ৪ কোটি থেকে ৬ কোটি টাকার মধ্যে ০.২৫ শতাংশ, পরবর্তী ৫ কোটি টাকা অর্থাৎ ৬ কোটি থেকে ১১ কোটি টাকার মধ্যে ০.৫০ শতাংশ, আরও ৫ কোটি টাকা অর্থাৎ ১১ কোটি থেকে ১৬ কোটি টাকার মধ্যে ০.৭৫ শতাংশ এবং ১৬ কোটি টাকার উপরে ১ শতাংশ হার প্রযোজ্য হতে পারে; পরিগণনার পদ্ধতিতে করদাতার মোট ঘোষিত সম্পদের মূল্য নির্ধারণ করা হবে যার মধ্যে জমির ক্ষেত্রে মৌজা রেট বা মৌজা ভিত্তিক সরকারি মূল্যায়ন ব্যবহার করা হবে, ভবনের ক্ষেত্রে PWD রেট বা নির্মাণ খরচ ভিত্তিক মূল্যায়ন প্রযোজ্য হতে পারে, সোনার ক্ষেত্রে বাজার মূল্য ব্যবহারের প্রস্তাব রয়েছে এবং শেয়ারের ক্ষেত্রে ক্রয়মূল্য বা NAV যেটি বেশি সেটি ব্যবহারের প্রস্তাব রয়েছে; NBR এর পরিকল্পনা অনুযায়ী এই ওয়েলথ ট্যাক্স অনলাইন আয়কর রিটার্ন সিস্টেমের সাথে একীভূত করা হবে যাতে সম্পদের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে ধরা পড় ে এবং পৃথক ম্যানুয়াল মূল্যায়নের প্রয়োজন না হয়, তবে মোট কর দায় ব্যক্তির বার্ষিক আয়ের এক তৃতীয়াংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে যাতে অতিরিক্ত বোঝা না হয়; সারচার্জ বা প্রস্তাবিত ওয়েলথ ট্যাক্সের ক্ষেত্রে কিছু সুবিধা ও ছাড় রয়েছে যেমন কৃষি জমি যা ব্যক্তিগত কৃষিকাজে ব্যবহৃত হয় তা সম্পদের হিসাবে অন্তর্ভুক্ত নাও হতে পারে, একই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সম্পদের ভাগবাটোয়ারার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শর্তে ছাড় প্রযোজ্য হতে পারে, প্রাথমিক আবাসন বা একমাত্র বাড় ির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত ছাড় দেওয়া হতে পারে এবং সরকারি গেজেটে নোটিফাইড দাতব্য প্রতিষ্ঠানে দান সম্পদ থেকে বাদ দেওয়া হতে পারে; সারচার্জের গ্রহণযোগ্যতার দিক থেকে দেখলে এটি একটি বিতর্কিত বিষয় কারণ একদিকে এটি ধনীদের থেকে বেশি কর আদায় করে সামাজিক ন্যায়বিচার ও সম্পদ পুনর্বন্টনে সহায়তা করে এবং সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধিতে অবদান রাখে যা দরিদ্র সেবা ও অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যবহৃত হতে পারে, কিন্তু অন্যদিকে এটি উচ্চ আয়ের করদাতাদের জন্য অতিরিক্ত বোঝা হিসাবে কাজ করে যা বিনিয়োগে অনাগ্রসতা তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে যখন করদাতারা তাদের সম্পদ বিদেশে স্থানান্তরের কথা বিবেচনা করেন বা নতুন ব্যবসায়িক বিনিয়োগে ঝুঁকি নিতে দ্বিধান্বিত হন; আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে দেখা যায় যে অনেক দেশে সম্পদ কর বা ওয়েলথ ট্যাক্স প্রচলিত রয়েছে যা বাংলাদেশের সারচার্জের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ, তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সারচার্জের হার ও প্রয়োগের সীমা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে কারণ কেউ কেউ মনে করেন যে এটি দ্রুত সম্পদ বৈষম্য কমাতে সহায়ক অপরদিকে কেউ কেউ যুক্তি দেন যে এটি করদাতার আইনি অধিকারে হস্তক্ষেপ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে; NBR এর দৃষ্টিকোণ থেকে সারচার্জ বা ওয়েলথ ট্যাক্স একটি কার্যকর কর আদায়ের হাতিয়ার যা কর ফাঁকি রোধে সহায়তা করে কারণ উচ্চ সম্পদের অধিকারীরা প্রায়শই বিভিন্ন উপায়ে কর এড় ানোর চেষ্টা করেন এবং সারচার্জ তাদের প্রকৃত সম্পদের উপর কর আদায় নিশ্চিত করে; তবে সারচার্জের সফল প্রয়োগের জন্য সম্পদ মূল্যায়নের সঠিক ব্যবস্থা, স্বচ্ছ তথ্য প্রবাহ ও কার্যকর প্রশাসনিক কাঠামো প্রয়োজন যা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জিং হতে পারে কারণ সম্পদের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ, বিশেষ করে অস্থাবর সম্পদ ও গোপন সম্পদ শনাক্তকরণ জটিল প্রক্রিয়া এবং জাতীয় সম্পদ ডাটাবেসের মধ্যে আন্তঃসংযোগের অভাব এই প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তোলে; সামগ্রিকভাবে সারচার্জের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে এর প্রয়োগের ন্যায়সঙ্গততা, হারের যৌক্তিকতা এবং সংগৃহীত অতিরিক্ত রাজস্বের সামাজিক ব্যবহারের উপর যদি এটি সত্যিকার অর্থে দরিদ্র ও অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যবহৃত হয় এবং প্রশাসনিক দুর্নীতি কম থাকে তাহলে এর গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পাবে অন্যথা এটি করদাতাদের মধ্যে বিরক্তি ও অনীহা তৈরি করবে।
“যার সম্পদ বেশি, তার দায়িত্ব বেশি”