08/01/2026
কঙ্কন ফুল ভালোবাসতো। শিশির মুদ্রিত বকুল ফুল। চিনাইর গ্রামের রাস্তা আর মাদ্রাসার রাস্তার দুই পায়ের ফাঁক গলিয়ে যে রাস্তা চলে গিয়েছিলো রাসূলপুর বাজারের দিকে- তার কিছু দূরে প্রাচীন দালানের মত দাঁড়িয়ে আছে বৃদ্ধ এক বকুল গাছ।
তীব্র শীত উপেক্ষা করে সকাল সকাল আমি বকুল কুড়াতে যেতাম ঐ বৃদ্ধ বকুল গাছের কাছে। কঙ্কন ঐ পথ ধরে শীত ঠেলে মাদ্রাসায় যেত। বকুল হাতে আমি এসে দাঁড়িয়ে থাকতাম পথের মাঝে। আমার সঙ্গে থাকতো আমার ভাঙাচুরা পুরোনো সাইকেল।
কিশোরকালীন প্রেমে হচ্ছে পাগলামির। আমাকেও ছুঁয়ে গেল সে প্রেম। যদি না ই ছুঁয়ে যেত তাহলে কে অমন বকুল কুড়ায়? কে অমন দাঁড়িয়ে থেকে পথ চেয়ে অপেক্ষা করে? ওসব অপেক্ষা কোন ব্যাপার ই ছিলো না। সমস্ত অপেক্ষা স্বার্থক হয়ে যেত কঙ্কন যখন ফুল হাতে পেয়ে হেসে দিতো একগাল, আর মাথা নিচু রেখে বলতো, আপনি খুব পাগল। কেউ এমন করে! মানুষ কি বলবে?
সপ্তাহের বাকিদিন কঙ্কনের দেখা পেলেও শুক্রবার পাওয়া হতো না। মাদ্রাসা থাকে বন্ধ। আমার কাছে ঐ একদিন মনে হত বছর সমান। কথা জমে যেত বুকের কোথাও। আমি তখন চিঠি লিখতাম। ভুল বানানে ভরা কাটাকুটি চিঠি। পড়াশোনা আর কত, বাংলাটা কোনরকম পড়তে পারি। বাবা নামের যে ছাঁয়াটা ছিল সেটা একদিন খোদাতায়ালা নিজের কাছে নিয়া নিলেন। বাধ্য হয়ে সংসারের হালচাল দেখতে হলো। পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে শুরু করলাম রাজমিস্ত্রীর কাজ।
সারাদিন কাজ করি। রাতে কঙ্কনের সাথে মিনিট কার্ড ফুরিয়ে কথা বলি। সময় কেমনে ফুরায়, রাত কেমন করে ফুরায় কিছুই অনুভব হয় না। মনে হয় কথা বলতেই থাকি অনন্তকাল ধরে। এত আদুরে করে কথা বলে কঙ্কন। এত সুন্দর করে হাসে যে- দেখতে আমার বড় ভালো লাগে। মাঝেমধ্যে ইচ্ছে হয় হাসিতে বাঁকা হওয়া ঠোঁট জোড়া একবার ছুঁয়ে দেই। সম্ভব হয় না। রাস্তাঘাটে ঠোঁট ছুঁয়াছুঁয়ি মুটেও কাজের কাজ না। লোকে দেখে ফেললে সর্বনাশ হয়ে যাবে। তবে আমি ঠিক করেছি যখন আমরা বিয়ে করবো; তখন ফুলসজ্জার রাতে আমি ছুঁয়ে দেখবো কঙ্কনের ঠোঁট জোড়া। এত সুন্দর কেন ঐ ঠোঁট জোড়া হায়!
আমার এই স্বপ্ন স্বপ্ন হয়েই রয়ে গেল। দূরে শহরের মাঝে কাজ করতে যেতে হলো দুই সাপ্তাহের জন্য। সরাদিন কাজ করি রাতে কঙ্কনের সাথে কথা বলি, কিন্তু মন ভরে না। কঙ্কনকে না দেখতে পেলে মনটা ভরবে কেমন করে? আমি শহরে আসলেও মনটা যেন রেখে এসেছি কঙ্কনের কাছে। আর তো কয়টা দিন, কাজ শেষ হলে ফিরে যাব। একসপ্তাহ গেলো, পরের সাপ্তাহে কঙ্কনের ফোন বন্ধ আসে। একদিন যায়, দুদিন যায়, ফোন আর আসে না। কেন আসে না? মনকে শান্তনা দেই, হয়তো তার ফোন নষ্ট হয়ে গেছে, হয়তো বাসায় সমস্যা। নিশ্চয়ই ফোন দিবে।
কঙ্কন আর ফোন দিলো না। ফোন দিল আমার বন্ধু মতি। ভালো মন্দ জিগ্যেস করার পর মতি বললো, কিরে বাড়িতে আসবি না? কঙ্কনের যে কাল বিয়ে তুই কি জানিস এটা? আমি হাসতে শুরু করলাম। মতির রসিকতা করার স্বভাব আছে জানি। এটাও যে রসিকতা ভেবে নিলাম। বললাম, মজা করিস না, বাড়িতে কাজ শেষ করেই আসতেছি। আসলে একসঙ্গে আড্ডা দিবো। মতি বললো, মজা করছি না আমি, এসব নিয়া আমি মজা করি না। কঙ্কনের বাড়িতে ধুমধামে গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান চলছে।
মাথার উপর আকাশ ভেঙে পড়লো আমার। ট্রেন ধরলাম। স্টেশনে গিয়ে নেমে ঘড়ির দিকে তাকায় দেখি রাত দুইটা। বাড়িতে না গিয়ে সোজা গেলাম কঙ্কনদের বাড়ি। সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। চারদিকে ঝাড়বাতি দিয়ে ভরা। বাড়িটাকে দেখে অচেনা মনে হচ্ছে। কোথাও কেউ নেই। টিনের চালের কুয়াশার জল হামাগুড়ি দিয়ে চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে মাটিতে। কেন এসেছি আমি? কি করবো? কিছুই বুঝতে পারছি না। শুধু কান্না পাচ্ছে, ভীষণ কান্না। কাকে ডাকবো? কঙ্কনের নাম ধরে ডাকলে কী দৌড়ে ঘর থেকে বের হবে কঙ্কন আমার জন্য? হলেও হতে পারে। আমার মত হয়তো সেও অস্থির হয়ে আছে, কিন্তু কাউকে কিছু বলতে পারছে না। কি করবে কঙ্কন আমাকে দেখে! ও কী আমার সাথে চলে আসবে? কিচ্ছু ভাবতে পারছি না। আমর শুধুই কান্না পাচ্ছে, ভীষণ কান্না।
আমি ঘরে ঢুকলাম টিন কেটে। দু হাতে টিন টানতে গিয়ে হাত কেটে গেল। গলগল করে রক্ত বের হচ্ছে হাত থেকে। অথচ ব্যাথা অনুভব হচ্ছে না। বুক যেই রক্তক্ষরণ হচ্ছে, বুকের গভীরে যে ব্যাথা হচ্ছে সে ব্যাথার কাছে এই ব্যাথা হয়তো-বা কিছুই না। সে কারণে শরীরে ব্যাথা হচ্ছে না। টিনর ফাক গলিয়ে সোজা গিয়ে ডুকলাম কঙ্কনের রুমে। ঢুকেই দেখি কঙ্কন বসে আছে। হাতে নতুন মেহেদী, এখনও গা থেকে হলুদের শাড়িটা খোলেনি। আমি নিজেকে আর সামলে রাখতে পারলাম না। ভেউভেউ করে কেঁদে ফেললাম। কঙ্কন একটি কথাও বললো না। পাথরের মত তাকিয়ে রইলো শুধু। চোখ মুছতে মুছতে আমি জিজ্ঞেস করলাম, আমি কি তোমার কেউ আছিলাম না কঙ্কন? এইগুলা কি? তুমি কি কিছু কইবা না? এই বিয়া করতে পারবা না, চলো এক্ষুণী আমার লগে। আমি তোমারে লইয়া পালায় যামু। কঙ্কন আমার হাতখানা সরিয়ে রাখলো তার হাতের উপর থেকে ধীরে। শীতল দৃষ্টিতে তাকালো আমার দিকে। তারপর সেই কঠিন কথাটা বললো, যে কথা আমি কোনদিনও শুনতে চাইনি। "আপনি চলে যান, এই বিয়া আমারে করতে হইবো, আমার বাপ মায়ের সম্মান বাঁচাইতে হইবো, আমি কোথাও যাইতে পারুম না"
শুকবার দুপুর দুইটায় কঙ্কনের বিবাহ হয়ে গেলো। সন্ধ্যায় সাতটায় আমি চিঠি লিখতে বসলাম। চিঠি লেখা শেষে করে প্রতিদিনের মত রাত নয়টা নাগাদ কঙ্কনের ফোনে কল করলাম। ওপাশ থেকে মেয়লী কণ্ঠে কেউ একজন বলে গেল,"আপনি যে নাম্বারে কল করেছেন, সে নাম্বারটি এই মহূর্তে বন্ধ আছে, অনুগ্রহ করে আবার চেষ্টা করুন"। ভোর ছয়টায় উঠে পুরোনো সাইকেলটা নিয়ে আমি বৃদ্ধ বকুল গাছের কাছে গিয়ে বকুল কুড়লাম। বকুল হাতে কঙ্কনের মাদ্রাসায় যাবার পথে কঙ্কনের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রইলাম। সঙ্গে আমার ভাঙাচুরা সাইকেল।
পৃথিবীও নিয়ম মাফিক চলতে থাকলো। কোথাও কোন অসুবিধা হলো না। কঙ্কনের হলুদের আসরে বসার আজ আট বছর পূর্ণ হলো। প্রতিবার ফোন করে নম্বারটি বন্ধ আছে এ কথা শুনতে আমারও কোন অসুবিধা হলো না এই আট বছরে। আমারও কোন অসুবিধা হলো না চিঠি লিখতে, বৃদ্ধ বকুল গাছ থেকে বকুল তুলতে, ঐ পথের বাঁকে দাড়িয়ে অপেক্ষা করতে। কঙ্কন চলে গিয়েছিল একদিন স্বামীর দেশে, আর আমার মাঝে রেখে গিয়েছিল অসীম শূন্যতা। আমি ঐ শূন্যতাকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছি। খারাপ লাগে না। গত বছর কঙ্কনের একটা মেয়ে হয়েছে। মেয়েটা এখন একটু একটু হাঁটতে শিখেছে। নরম তুলতুলে পায়ে টুকটুক করে হাঁটে। মেয়েটাকে যখন দেখি আমার শূন্য পৃথিবীটা আরও শূন্য হয়ে যায়। বুকের ভিতরে কি যেন এক আগুন দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে।
তখন,
তুলতুলে ঐ একজোড়া নরম পায়ের অংশ হতে না পারা দুঃখের কাছে জগৎ সংসারকে আমার তুচ্ছ মনে হয়....