04/08/2026
বিখ্যাত সায়েন্স ফিকশন বই ‘ফারেনহাইট ৪৫১’–এর গল্পের মতো বাস্তবেও একটা অবাক করা ঘটনা ঘটছে। কিছু এআই প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান তাদের মডেলকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য বই ব্যবহার করছে। আর শেখা শেষে সেই বইগুলো একদম নষ্ট করে ফেলছে।
এখন প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে নতুন ও শক্তিশালী এআই মডেল বানানোর প্রতিযোগিতা চলছে। কিন্তু ইন্টারনেট থেকে ছবি বা লেখা নিলে কপিরাইট আইনের ঝামেলা ও মামলার ঝুঁকি থাকে। এই সুযোগে এআই কোম্পানিগুলোর কাছে নতুন কাগজের বই বিক্রি করার এক নতুন ব্যবসা চালু হয়েছে। এই ব্যবসায়ীরা বাজার থেকে লাখ লাখ বই কিনে নেয়। এরপর বইগুলোর বাঁধাই কেটে পাতাগুলো আলাদা করা হয়। প্রতিটি পাতা মেশিনে স্ক্যান করে কম্পিউটারে তথ্য হিসেবে জমা করার পর মূল বইটি ফেলে দেওয়া হয় বা পুড়িয়ে ধ্বংস করে ফেলা হয়।
‘৪০৪ মিডিয়া’ নামের একটি প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যমে জানা যায়, এআই কোম্পানিগুলো নিজেরা বাজারে গিয়ে সরাসরি বই কেনে না। তারা অন্য কিছু এজেন্সির সাহায্য নেয়। এই এজেন্সিগুলো গোপনে নিজেদের ও এআই কোম্পানিগুলোর পরিচয় লুকিয়ে বাজার থেকে লাখ লাখ বই জোগাড় করে দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে ইন্টারনেটে এআইয়ের তৈরি কৃত্রিম ও নিম্ন মানের লেখার সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। তাই ২০২৩ সালে জেনারেটিভ এআই জনপ্রিয় হওয়ার আগে ছাপা হওয়া বইগুলোর চাহিদা এখন সবচেয়ে বেশি। কারণ, ওই বইগুলোয় কেবল মানুষের লেখা খাঁটি ও মানসম্মত তথ্য রয়েছে, যা এআইকে নতুন কিছু শেখানোর জন্য একেবারে নিখুঁত।
বইয়ের এই অস্বাভাবিক চাহিদার কারণে পুরোনো বইয়ের বাজারের চিত্র বদলে যাচ্ছে। একজন বই বিক্রেতা জানান, আগে যেখানে সপ্তাহে প্রায় ২০টি বই বিক্রি হতো, এআই ক্রেতারা আসার পর এখন সেখানে প্রতি সপ্তাহে কয়েক শ বই বিক্রি হচ্ছে। এই ব্যবসায় লাভ হলেও তিনি চিন্তিত। কারণ, এভাবে স্ক্যানের পর ধ্বংস করে দেওয়ার ফলে অনেক দুর্লভ ও প্রাচীন বই পৃথিবী থেকে চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে।
ওই বই বিক্রেতা বলেন, ‘এতে আমার আর্থিক লাভ হয়, আর যেসব পুরোনো বই আগে বিক্রি হচ্ছিল না, সেগুলোও দোকান থেকে খালি হয়ে যায়। বিদেশ থেকে আনা বা অন্য ভাষার বই বিক্রির ক্ষেত্রে আমি বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে আছি। তবে এই বইগুলোর শেষ পরিণতি আমার মোটেও পছন্দ নয়, আর এভাবে দুর্লভ বই ধ্বংস করে ফেলা দেখতেও আমার খারাপ লাগে।’
এই পুরো বিষয়টি আসলে এআই প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান ‘অ্যানথ্রোপিক’–এর ‘প্রজেক্ট পানামা’–র মতো। এই প্রজেক্টের অধীনে তারা লাখ লাখ বই স্ক্যান করার পর চিরতরে ধ্বংস করে দিয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের একটি কপিরাইট মামলায় সান ফ্রান্সিসকোর বিচারক রায় দেন, আনুষ্ঠানিকভাবে কেনা বই স্ক্যান করে ডিজিটাল কপিতে রূপান্তর করা ও মূল বইটি নষ্ট করে ফেলা আইনত বৈধ। পরবর্তী সময় ‘ওপেনএআই’ ও ‘মেটা’র বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোয়ও অন্য বিচারকেরা একই ধরনের রায় দেন।
তবে আরেকটি মামলায় ভিন্ন রায় আসে। এআই মডেল ‘ক্লড’–কে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য অবৈধ বা পাইরেটেড বই ব্যবহারের অপরাধে বিচারক ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের একটি জরিমানা অনুমোদন করেন। এই সিদ্ধান্তের ফলে অ্যানথ্রোপিককে ক্ষতিগ্রস্ত হাজার হাজার লেখককে বইপ্রতি প্রায় তিন হাজার ডলার করে ক্ষতিপূরণ দিতে হয়েছে।
এমনকি ইলন মাস্কও এ নিয়ে নিজের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি এক এক্স পোস্টে জানান, তিনি তাঁর স্পেসএক্স এআই টিমকে নির্দেশ দিয়েছেন যেন তারা লাইব্রেরির দুর্লভ বইগুলোর মলাট কেটে ধ্বংস না করে; বরং বই অক্ষত রেখে কঠিন পদ্ধতিতে স্ক্যান করে।
এই পুরো প্রক্রিয়ার সূচনা হয়েছিল প্রায় দুই বছর আগে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে এআই চ্যাটবট ‘ক্লড’–এর নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘অ্যানথ্রোপিক’ গুগল বুকসের সাবেক কর্মকর্তা টম টার্ভিকে নিয়োগ দেয়। তাঁর লক্ষ্য ছিল বিশ্বের সব বই সংগ্রহ করা, যাতে অ্যানথ্রোপিকের এআই মডেলের তথ্যের চাহিদা মেটানো যায়।
বার্সেলোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্যের শিক্ষক ও পুরোনো বই বিক্রেতা মার্সাল ফন্ত ই এস্পি মনে করেন, এআই কোম্পানিগুলো এখন তথ্যের সংকটে পড়েছে। ইন্টারনেট এখন এআইয়ের তৈরি কৃত্রিম ও নিম্ন মানের লেখায় ভরে গেছে। তাই এআইকে আরও উন্নত করতে কোম্পানিগুলোর এখন প্রয়োজন মানুষের লেখা খাঁটি ও উচ্চ মানের পুরোনো বই।
বর্তমানে এ কাজটি আইনিভাবে বৈধ হলেও সিলিকন ভ্যালির সবাই প্রযুক্তির এই আচরণকে সহজভাবে নিতে পারছেন না। প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান ‘ফ্যাক্টরি এআই’–এর প্রধান নির্বাহী মাতান গ্রিনবার্গ জানিয়েছেন, ‘মানুষের তৈরি এত ব্যক্তিগত একটি জিনিসকে যান্ত্রিকভাবে ধ্বংস করার মধ্যে মানবতাবিরোধী এক মানসিকতা স্পষ্ট। কারণ যা–ই হোক না কেন, যারা বই ধ্বংস করে, ইতিহাস কখনো তাদের ক্ষমা করে না।’
সূত্র: ইয়াহু নিউজ, রয়টার্স
লিখা : কিশোর আলো