08/05/2024
বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি পড়াশুনা করতে চেয়েছিলাম মার্কেটিং এ
কিন্তু পেলাম ম্যানেজমেন্ট।
মার্কেটিং আমার কাছে দুর্দান্ত লাগতো !
তাই আমি সুযোগ পেয়ে ম্যানেজমেন্ট থেকে মার্কেটিং এ মাইগ্রেট করে ফেললাম।
এরপর বিবিএ এবং এমবিএ মার্কেটিং এ করলাম।
কিন্তু আমার চাকরী হল HR এ
আমি সুযোগ খুঁজতে থাকলাম।
এবং একটি সুযোগ পেয়ে একি কোম্পানির মার্কেটিং বিভাগে চলে এলাম।
তবে এইচআরে কাজ করতে আমার খুব একটা খারাপ লাগত না।
বা অন্য কোন প্রফেশন নিয়েও আমার কোন আপত্তি ছিল না।
শুধু মার্কেটিং কে একটু বেশি ভালবাসতাম এই যা।
তবে একটি প্রফেশনকে আমি দুচোখে দেখতে পারতাম না।
আর সেটি হল “সেলস !”
জীবনে আর যাই করি না কেন সেলস এ চাকরী করবো না! এই ছিল আমার প্রতিজ্ঞা।
কেন এই চিন্তা আমাকে ভূতের মত পেয়ে বসে ছিল তাঁর মূলোৎপাটন কখনো হয়নি ।
ধারণা করি ছোট বেলা থেকেই সাহিত্য ঘেঁষা মানসিকতার ফলে এমন হলেও হতে পারে।
তবে, এমবিএ শেষ করার পর ‘যেকোন একটি চাকরী লাগবে’ মানসিকতা থেকে সামনে যা পাচ্ছিলাম সেখানেই পরীক্ষা দিচ্ছিলাম।
এরি মধ্যে একটি বড় কোম্পানির টেরিটরি সেলস অফিসার হিসাবে আমার চাকরী হয়ে গেল।
সব কিছু মিলিয়ে প্রায় ৪০ হাজার টাকার মতো স্যালারি ছিল।
কিন্তু আমি সেলস কে এতোই ঘৃণা করতাম যে চাকরী জীবনের শুরুতেই এতো ভাল অপশন পেয়েও হাসি মুখে সেখান থেকে সরে আসি।
মার্কেটিং এ শিফট করার পর আমি প্রফেশনাল লাইফের অন্যতম বড় ধাক্কাটি খাই।
আমি দেখলাম, টিমের সবাই সেলস নিয়েই কথা বলছেন।
কোন ক্যাম্পেইনটা কীভাবে সাজালে সেলস বাড়বে এই হল আমাদের মার্কেটিং টিমের আলোচনার অন্যতম বিষয় !
একেই বলে “পড়বি তো পর মালির ঘাড়েই”
কি আর করা !
অগত্যা সেলস নিয়ে মাথা ঘামাতেই হলো।
তখনো আমি সেলস এর ইমপ্যাক্ট বুঝে উঠতে পারিনি !
কিছুদিন পর থেকে সেলসের বিষয়গুলো আমার কাছে পরিষ্কার হতে শুরু করলো !
খেয়াল করে দেখলাম আমাদের কোম্পানির এইচআরও সেল করছেন।
আমাদের ইঞ্জিনিয়ার কলিগও সেল করছেন।
আশে পাশে সবাইকে দেখলাম , সবাই যার যার মতো করে সেল করছেন।
আমি বহু দিন পর্যন্ত সেলস এর ভুল অর্থ জেনে এসেছি !
আমার কাছে সেলস মানে ছিল, কিছু মানুষ প্রোডাক্ট বা সার্ভিস বিক্রি করার জন্য মাঠে ঘাটে দৌড়াদৌড়ি করে বেড়ায়।
জোর করে কাস্টমারের কাছে প্রোডাক্ট বিক্রি করে।
এবং এই কাজের জন্য মাস শেষে কমিশন পায়!
এই ছিল আমার ভুল ধারণা!
এরপর আমি সেলস নিয়ে কিছুটা স্টাডি শুরু করলাম।
সেলসে কাজ করারও সুযোগ হল।
এবং এক সময় মার্কেটিং টিমের পাশাপাশি সেলস টিম দেখার দায়িত্বও আমার কাছে চলে আসলো।
তখন আর হাত গুটিয়ে থাকার অবকাশ রইলো না।
এজন্য আমি সেলস নিয়ে বিভিন্ন বই, ব্লগ, ভিডিও, কোর্স করতে শুরু করলাম।
টিমের সাথে আরও ক্লোজলি কাজ করতে শুরু করলাম।
কোন কিছু শেখার সময় একটি বিষয় আমি মেনে চলি।
চেষ্টা করি ওই বিষয়টাই ফান্ডামেন্টাল থেকে শুরু করে আস্তে আস্তে উপরের জিনিসগুলোর শেখার ।
আমি বুঝতে পারলাম, সেলস এর ফান্ডামেন্টাল হল, একজন মানুষ প্রথমে আরেক জন মানুষকে কনভিন্স করেন ।
এবং এর পরেই তিনি তাঁর প্রোডাক্ট বা সার্ভিস সেই লোকের কাছে বিক্রি করতে পারেন।
তাঁর মানে আগে কনভিন্স করতে হয়।
কনভিন্স করলে সেলস আপনা আপনি হয়।
সেলসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যদি কোন শব্দ থেকে থাকে তা হল “কনভিন্স।”
যার কনভিন্সিং পাওয়ার যত বেশি তিনি সেলসম্যান হিসাবে তত সফল !
আপনি খেয়াল করবেন, আপনার কোম্পানির ইঞ্জিনিয়ার কলিগটাও কোন নতুন প্রোজেক্ট পেতে আরেক কোম্পানিতে গিয়ে প্রেজেন্টেশন দিচ্ছেন।
তারমানে তাঁর নিজের কোম্পানির প্রোডাক্ট বা সার্ভিসকে আরেক কোম্পানির কাছে কনভিন্সিং ওয়েতে প্রেজেন্ট করতে হচ্ছে।
অর্থাৎ দিন শেষে সেল করতে হচ্ছে।
আপনি যদি এইচআরের কথা বলেন, তাঁদের রিক্রুট্মেন্টের সময় যোগ্য প্রার্থীদেরকে কনভিন্স করতে হচ্ছে জয়েন করার জন্য।
কোম্পানির রিটেনশনে, বেনিফিট নেগোশিয়েশন, ক্রস ডিপারট্মেন্টাল কনফ্লিক্ট ম্যানেজমেন্ট এরকম শত কাজে এইচআরকে কনভিন্স করতে হয়, এক বা একাধিক মানুষ বা ডিপার্টমেন্টকে।
এসব কিছু বাদ দিয়েও আপনি চিন্তা করতে পারেন।
যখন কোন কোম্পানিতে আপনি চাকরীর ইন্টার্ভিউ দেন, সেখানেও আপনাকে কনভিন্স করতে হয় এই বিষয়ে যে, বাকিদের চেয়ে কেন আপনি ভাল, কেন আপনাকে নেয়া উচিৎ।
অর্থাৎ এখানেও কিন্তু আপনি কনভিন্স করছেন।
হয়তো আপনি প্রতি মাসে চাকরীর ইন্টার্ভিউ দিচ্ছেন না।
কিন্তু আপনার টিমকে ম্যানেজ করতে টিম মেম্বারদের প্রতিদিন প্রতিনিয়ত কনভিন্স করতে হচ্ছে বিভিন্ন বিষয়ে।
অর্থাৎ আপনি সেল করছেন।
যদি আপনার নিজের টিম না থাকে, তাহলে নিশ্চিত আপনি অন্য কোন টিমের অংশ হয়ে কাজ করছেন।
এখানে কিন্তু আপনার বসকে, কলিগদের প্রায় প্রতিদিন বিভিন্ন বিষয়ে কনভিন্স করতে হচ্ছে ।
মানে এখানেও আপনি সেল করছেন।
এখানেই শেষ নয়, আপনার লাইফ পার্টনার কে বিভিন্ন ইস্যুতে প্রায় প্রতিদিন কনভিন্স করতে হচ্ছে।
আপনার বাবা-মা, ভাইবোন, বন্ধু এদেরকে কী কনভিন্স করতে হচ্ছে না?
তাহলে একটু খেয়াল করে দেখুন, আপনি না চাইলেও মানুষজনকে কনভিন্স করতেই হচ্ছে।
এখন সিদ্ধান্ত আপনার আপনি কী জেনে কনভিন্স করবেন, নাকি না জেনে করবেন?
হ্যাঁ, কারো কারো জন্মগতভাবেই কনভিন্সিং পাওয়ার থাকে।
তাঁদের কথা বলছি না।
কিন্তু যাদের থাকে না, তাঁরা কি করবেন?
উত্তর হচ্ছে তাঁরা শিখতে পারেন।
কীভাবে শিখবো?
অনেক ধরণের বই আছে, কোর্স আছে, ভিডিও কন্টেন্ট আছে, ব্লগ আছে, আপনার কলিগ আছেন, আপনি শিখতে চাইলে শেখার রাস্তার অভাব হবে না।
কিন্তু তারও আগের প্রশ্ন আপনি কী আসলে শিখতে চান কিনা?
কিছু মানুষের যোগ্যতা হয়তো আপনার মান দ্বন্দ্বে কম হতে পারে,
খেয়াল করে দেখবেন তাঁরা জীবনে ঠিকি এগিয়ে যান। কিন্তু আমরা হিসাব মেলাতে পারি না!
খেয়াল করে দেখবেন তাঁদের কনভিন্সিং স্কিল খুব ভালো।
তাঁরা তাঁদের আইডিয়া যেকারো ভেতরে ইঞ্জেক্ট করে দিতে পারে।
মানুষকে মোটিভেট করতে পারে।
কিংবা মানুষ তাঁদের বিশ্বাস করে।
বা মানুষ তাঁদের ভালোবাসে।
বা মানুষ তাঁদের সহজ সরল ভেবে সাহায্য করে।
বা মানুষ তাঁদের সাথে কথা বলে আনন্দ পায়
বা মানুষ তাঁদের সাথে কথা বলে হাসতে পারে।
একেক জন মানুষ অন্যদের কনভিন্স করার জন্য একেক ধরণের টুল এপ্লাই করেন।
তবে সেলস স্কিল এতো এক রৈখিক কোন স্কিল নয়।
এটি একটি মাল্টিডাইমেনশনাল স্কিল যেখানে অনেক কিছু শেখার আছে।
আমার কাছে মনে হয় সেলস স্কিল কোন প্রফেশনাল স্কিল নয়।
বরং এটি একটি লাইফ স্কিল যা আমাদের স্কুল-কলেজ-ভার্সিটিতে শেখানো উচিৎ ছিল।
যা আমাদের কখনো বোঝানো হয়নি।
এজন্য আমার মতো অনেক মানুষ সেলস থেকে দূরে দৌড়ায়।
কিন্তু আমরা কী একটু চিন্তা করে দেখেছি…
"Nothing happens until someone sells something."
এতো গুরুত্বপূর্ণ একটি লাইফ স্কিল কে বাদ দিয়ে আমরা কি আসলেই সামনে আগাতে পারবো ?
ভাবার বিষয় কিন্তু !
আচ্ছা আপনার সেলস স্কিল কেমন ?
***Pic for attention