07/02/2024
●ট্রান্সজেন্ডার প্রসঙ্গে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি
☛প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, ট্রান্সজেন্ডার মহান আল্লাহর বিরুদ্ধে চরম সীমালঙ্ঘন। এটি আল্লাহর সৃষ্টিতে ইচ্ছাকৃত পরিবর্তন আনা, সমলিঙ্গের মধ্যে যৌনতাসহ নানা বিকৃত যৌনতার স্বাভাবিকীকরণ এবং মহান আল্লাহর নির্ধারিত পরিবার ও সামাজিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বিদ্রোহ। এখানে ট্রান্সজেন্ডারবাদ প্রসঙ্গে ইসলামের অবস্থান নিয়ে কিঞ্চিৎ আলোচনা তুলে ধরা হলো:
☛ট্রান্সজেন্ডার বিশ্লেষণ ও উদ্দেশ্য
●হলো দুটি ইংরেজি শব্দ Trans ও gender-এর সংমিশ্রণ। Trans অর্থ পরিবর্তন করা এবং gender মানে লিঙ্গ।
Transgender এমন একজন পুরুষ বা নারীকে বোঝায়, যাকে আল্লাহ তাআলা একজন পূর্ণ পুরুষ বা নারী হিসেবে সৃষ্টি করেছেন, কিন্তু তারা এই সৃষ্টিতে অসন্তুষ্ট। তারা আল্লাহর সিদ্ধান্ত ও তাদের জন্মগত লিঙ্গ পরিবর্তন করে পুরুষ থেকে নারী বা নারী থেকে পুরুষ হতে চায়। ট্রান্সজেন্ডারবাদের উত্থানের পেছনে সরাসরি সম্পর্ক খুঁজতে গেলে এ বিষয়গুলো উঠে আসে :
১. পাশ্চাত্যের নারীবাদী আন্দোলন, বিশেষ করে নারীবাদী আন্দোলনের তৃতীয় ধারা (Third wave feminism), যা নারীত্ব ও পুরুষের ধারণাকে আক্রমণ করেছে।
২. আমেরিকায় হওয়া সমকামী অধিকার আন্দোলন, যার মাধ্যমে সমকামিতাসহ নানা বিকৃত যৌনতা এবং সমকামী বিয়ে আইনি বৈধতা পেয়েছে।
৩. ষাটের দশকে আমেরিকায় ঘটা যৌন বিপ্লব, যা যৌনতার ব্যাপারে সব ধরনের মূল্যবোধ মুছে ফেলেছে।
৪. এই তিনের মিশ্রণে তৈরি হওয়া জেন্ডার আইডেন্টিটি (Gender Identity) মতবাদ।
●আমাদের মনে রাখতে হবে যে, মূলত ট্রান্সজেন্ডারের মুখোশের আড়ালে সমকামিতাকে সহনীয় করাই হচ্ছে পশ্চিমাদের একমাত্র লক্ষ্য। সাধারণত মুসলিম প্রধান দেশগুলোতে সমকামী আন্দোলন প্রতিষ্ঠা করা কোনভাবেই সম্ভব নয়। তাই অভিনব কায়দায় নতুন করে ট্রান্সজেন্ডার মতবাদের আড়ালে সাধারণ মানুষকে বোকা বানিয়ে সমকামিতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে মুসলিম সমাজে।
আমাদেরকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, সমকামিতা ইসলামে জঘন্যতম অপরাধ এবং হারাম। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ( সূরা আম্বিয়া এর ৭৪) নম্বর আয়াতে এরশাদ করেন: وَ لُوۡطًا اٰتَیۡنٰهُ حُکۡمًا وَّ عِلۡمًا وَّ نَجَّیۡنٰهُ مِنَ الۡقَرۡیَۃِ الَّتِیۡ کَانَتۡ تَّعۡمَلُ الۡخَبٰٓئِثَ ؕ اِنَّهُمۡ کَانُوۡا قَوۡمَ سَوۡءٍ فٰسِقِیۡنَ ﴿ۙ۷۴﴾ আমি লূতকে হিকমত ও ইলম দিয়েছিলাম এবং এমন এক জনপদ থেকে তাকে মুক্তি দিয়েছিলাম, যার অধিবাসীরা এক কদর্য কাজ (সমকামিতা) করত। বস্তত তারা ছিল অত্যন্ত নিকৃষ্ট নাফরমান সম্প্রদায়।
☛যেসব মাধ্যমে এই মতবাদ ছড়ানো হয়
(ক) মিডিয়া
(খ) এনজিও
(গ) অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট
(ঘ) জাতীয় শিক্ষাক্রম পাঠ্যপুস্তক বোর্ড বাংলাদেশ (NCTB)যেমন, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড ২০২৩ শিক্ষাবর্ষের সপ্তম শ্রেণীর ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুশীলন বইয়ে ৫১-৫৬ পৃষ্ঠায় ‘শরিফার গল্প’শিরোনামের লেখায় সরাসরি ট্রান্সজেন্ডারবাদের দীক্ষা দেয়া হয়েছে।
●কিছু মানুষ নিজেদের বিপরিত লিঙ্গের বলে দাবি করে কেন?
১। মানসিক অসুস্থতা
২। যৌন বিকৃতি ও কুপ্রব্রিতির অনুসরন
৩। ওয়াসওয়াসা
৪। অসত সংস্রব
☛ট্রান্সজেন্ডারবাদের কারনে সমাজে যে সংকট তৈরি হবে:
নিজেকে নারী দাবি করা পুরুষ কি নারীদের বাথরুম,নারীদের কমনরুম ব্যবহার করবে? আপনি কি চাইবেন আপনার বোন, স্ত্রী বা সন্তান কোনো ট্রান্সনারীর (যে কিনা আদতে একজন পুরুষ ) সাথে একই বাথরুম ব্যবহার করুক? কী হবে কোনো পুরুষ যখন শাড়ি বা সালওয়ার কামিজ পরে মেয়েদের সালাতের জায়গায় এসে উপস্থিত হবে? নিজেকে পুরুষ দাবি করা নারী কি সালাত আদায় করবে পুরুষদের সাথে একই কাতারে ? ট্রান্সজেন্ডারবাদকে বৈধতা দেওয়ার অর্থ সামাজিকভাবে যে জায়গাগুলো নারীদের জন্য নির্ধারিত সেখানে পুরুষদের অনুপ্রবেশের পথ করে দেওয়া। একটু চিন্তা করলে এ সমস্যাগুলো যে কেউ ধরতে পারবেন।
☛ট্রান্সজেন্ডার ও হিজড়ার পার্থক্য
ট্রান্সজেন্ডারবাদের কথা শুনলে বেশির ভাগ মানুষ মনে করে, এটা হয়তো হিজড়াদের অধিকার নিয়ে কোনো আন্দোলন। এটি মারাত্মক ভুল ধারণা। এই দুটি জিনিস একেবারেই আলাদা। দুই মেরুর জিনিস। মানুষ হয় সম্পূর্ণ পুরুষ অথবা নারী।
যাদের দেহ শুক্রাণু উৎপাদনের জন্য তৈরি, তারা পুরুষ আর যাদের দেহ ডিম্বাণু উৎপাদনের জন্য তৈরি, তারা নারী। এটা শুধু বাহ্যিক যন্ত্রপাতির বিষয় নয়, পুরো প্রজননব্যবস্থার বিষয়। সুতরাং এখন যারা জন্মগতভাবে অস্বাভাবিক এবং কিছু যৌন ত্রুটি বা জটিলতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে, যাকে আমরা হিজড়া বলি, ইংরেজিতে তাদের বলা হয় ইন্টারসেক্স (Inters*x)। পক্ষান্তরে ট্রান্সজেন্ডাররা ইন্টারসেক্স নয়, তারা সম্পূর্ণরূপে পুরুষ বা নারী হিসেবে জন্মগ্রহণ করে এবং পরে লিঙ্গ পরিবর্তন করে।
মূলত বর্তমানে যারা নিজেদের ট্রান্সজেন্ডার দাবি করছে তাদের বেশির ভাগই ইন্টারসেক্স নয়। তাদের কোনো ধরনের ডিএসডি (Disorders of s*x development) নেই। তাদের জন্ম হয়েছে সুস্থ ও স্বাভাবিক যৌনাঙ্গ নিয়ে।
➥ট্রান্সজেন্ডার সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি
●পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘আমি (আল্লাহ) মানুষকে সৃষ্টি করেছি সুন্দরতম গঠনে।’ (সুরা : ত্বিন, আয়াত : ৪)
আল্লাহ তাআলা মানুষকে যে স্বাভাবিক দেহাবয়ব দিয়ে সৃষ্টি করেছেন, সেটাই তার জন্য উৎকৃষ্ট নিয়ামত। ইসলামী বিধি-বিধানের বাইরে গিয়ে একে পরিবর্তন-পরিবর্ধনের অধিকার কারো নেই। লিঙ্গ পরিবর্তন ইসলামে জঘন্যতম হারাম ও কবিরা গুনাহ। এর সঙ্গে আপস করার কোনোই সুযোগ নেই।
পুরুষকে আল্লাহ যে পুরুষালি বৈশিষ্ট্য দিয়ে সৃষ্টি করছেন, তা সেভাবেই বজায় রাখা এবং নারীকে যে নারীত্বের বৈশিষ্ট্য দিয়ে সৃষ্টি করেছেন তা-ও সেভাবে ধরে রাখাই আল্লাহর বিধান। এটা এমনই এক ব্যবস্থা, যা না হলে মানবজীবন যথাযথভাবে চলবে না। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘রাসুল (সা.) নারীর বেশধারী পুরুষদের এবং পুরুষের বেশধারী নারীদের অভিসম্পাত করেছেন’। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৮৮৫)
সব ইসলামী আইনবিদ এ বিষয়ে একমত যে ট্রান্সজেন্ডার হচ্ছে আল্লাহ তাআলার সৃষ্টিতে বিকৃতিসাধন, যা সুস্পষ্ট হারাম। আবার অনেকের ভাষ্য মতে এটি কুফরি। তাফসিরে কুরতবিতে ইমাম কুরতবি (রহ.) বলেন, আল্লাহর সৃষ্টিতে কোনোরূপ পরিবর্তন করা নাজায়েজ। (তাফসিরে কুরতবি : ৫/৩৯৩)
➥পরিশেষ:
বিগত শতকের শুরু থেকে পশ্চিমে এই মতবাদের আগ্রাসন শরু হলেও সম্প্রতি আমাদের দেশেও এই মতবাদকে প্রতিষ্ঠার জন্য নানা প্রচেষ্টা চলছে। বেশ কিছু সংবাদ মাধ্যমের নিউজে দেখা গেছে ২০২৪-২০২৫ এর মধ্যেই জাতীয় সংসদে তা পাশ করে একে আইনি বৈধতা দেওয়া হবে। ইতিমধ্যে বিষয়টি অনেকদূর এগিয়ে গেছে। সত্যিই যদি এই মতবাদ আইনি বৈধতা পায় এবং সমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ করে; তাহলে ব্যক্তি. পরিবার ও সমাজ ব্যবস্থার সকল অবকাঠামো একসাথে ভেঙ্গে পড়বে। পাশাপাশি সন্তান,সম্পদ বিবাহ ও ধর্মীয় নানা বিষয়ে দেখা দিবে অনাচার। ঈমান হারাবে কোটি মানুষ। আগত দিনে উম্মতকে এই মহাবিপদ থেকে বাঁচানোর দায়িত্ব এই উম্মতের কর্ণধার আলেমগনের। পাশাপাশি সচেতন ঈমানদার নারী-পুরুষ প্রত্যেককে এই ফেতনা থেকে নিজে বাঁচার এবং অন্যকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে হবে। আল্লাহ তায়াল আমাদেরকে কবুল করুন।আমিন