01/07/2021
এইতো সেদিনের কথা।
সালটা 2016 । এসএসসি পরীক্ষার্থী। কেবল মাত্র তিন মাস গেল। বাবার ব্যবসায় হাল ধরেছি। প্রতিদিনই আশা করি আজ স্কুলে যাব কিন্তু হয়েও হয় না। সবাই যখন আমার সামনে দিয়ে স্কুলে যায় আমি তখন পালিয়ে বেড়ায়, যদি কোন পরিচিত বন্ধুর সাথে দেখা হয়ে যায়। এভাবেই কেটে গেল আরও তিনটি মাস। স্কুল থেকে খবর আসলো পরীক্ষা হবে। বাসায় বললাম। কোন শব্দ নাই। মনটা বড়ই খারাপ। কিছুদিন পর থেকে বাবার ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেল। সারাদিন বাড়িতেই ঘোরাঘুরি। একদিকে যেমন সংসারের অভাব, অন্যদিকে আমার জীবনে ঘনিয়ে আসছে কালো দিন। বাড়িতে ঠিকমতো রান্নাবান্নাও হয় না। তখন বাড়ির বাইরেই যেন ভালো সময় কাটতো। বাড়িতে গেলেই কেমন যেন অশান্তি। সর্বশেষ সিদ্ধান্ত এইযে, আমাকে কাজ করতে হবে। শুরু হলো আমার কাজের জীবন। প্রায় এক মাস সেভেন স্টার এ লাইন ম্যান এর কাজ করলাম। কয়েকদিন ভালোই লাগলো। রোজার ঈদ টা ভালই কেটে গেল। পরে আমি আর গেলাম না। কারণ একদিন রাজশাহীতে যেতে আমাদের গাড়িটা এক্সিডেন্ট করে। আবার কিছুদিন আগেগর মতই ঘোরাঘুরি। সংসারে আবার একই অবস্থা তখন আমার কাছে বাড়ি মানে জাহান্নাম মনে হতো। তখন আমি হারে হারে বুঝতে পারি বেকারত্ব কতটা যন্ত্রনার। আমার মা অনেক জায়গা আমার জন্য কাজ খোঁজে। কিন্তু কোন কাজ পায় না। অবশেষে আমার মামা বাজারের একটি মুদির দোকানে কাজে লাগিয়ে দেয়। জীবনে বড় ইচ্ছা ছিল পড়াশুনা শেষ করে ভাল একটা চাকরী করব। কিন্তু সে ইচ্ছা আর পূরণ হল না। যাই হোক, আল্লাহর মেহেরবানীতে কাজ পেয়ে গেলাম। আমার মাসিক বেতন 4000 টাকা। আমার জন্য এই টাকা অনেক বেশি। এভাবেই চলে গেল আরও তিনটি মাস। হঠাৎ একটা ফোন আসলো। নাম্বারটা অচেনা। আমি স্বাভাবিকভাবে রিসিভ করলাম। কন্ঠটা অনেক চেনা চেনা লাগছে। কথা বলে বুঝতে পারলাম স্কুল থেকে আমার এক বন্ধু ফোন দিয়েছে। আমার ভালো লাগছে। কতদিন পর আমার একজন কাছের বন্ধুর সাথে কথা বলছি। ও বলল, তোর সাথে কত যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছি। তুই ফর্ম ফিলাপ করবি না। আমি বললাম, এখন কাজ করি আর পড়াশোনা হবে না। ও একটু বলে রাখি ছাত্র হিসেবে আমি তেমন খারাপ ছিলাম না। সবসময় এক থেকে তিন মধ্যেই থাকতাম। সেজন্যই আমার বন্ধুদের একটু বেশি চেষ্টা ছিল। ওরা আমাকে বলেছিল কোন হেল্প লাগলে বল তবু পরীক্ষা টা দে। আমি বললাম, না রে দোষ আর সম্ভব না। ফরম ফিলাপ হয়ে গেল আমাকে ছাড়াই। আমার কাজের বয়স প্রায় আড়াই মাস। ভেবেছিলাম জীবনটা এভাবেই কেটে যাবে। কিন্তু আমার মনে সব সময় একটাই চিন্তা জীবনে কিছু করতে হবে। তাই বুঝি আল্লাহপাক আমার মনের আশা পূরণ করার জন্য একটি মাধ্যমে পাঠিয়ে দিলেন। আমাদের বাড়ির পাশে একজন জায়গা কিনেছিলেন। একদিন তিনি জায়গা দেখতে এসে আমাদের এলাকার এক ভাইয়ের সাথে গল্প করতে করতে বললো আমার অফিসের জন্য একজন ছেলে দরকার। তখন এলাকার বড় ভাই আমার নামটি বলে। তখন আমি মুদির দোকানে কাজ করি। ছুটির দিনে আমাকে এই বিষয়ে বলে। আমি অনেক ভাবলাম এবং যেখানে কাজ করব ওখানকার নাম্বারটা নিয়ে সাহস করে কথা বললাম। কথা বলার পর আমাকে দেখা করতে বলে। আমি বললাম আমিতো কাজ করি সন্ধ্যার পর ছাড়া দেখা করতে পারবো না। উনি বললো ঠিক আছে তুমি আমাকে ফোন দিয়ে এসো। তখনো আমি বাড়ির কাউকে কিছু জানাই নি। মনে মনে ঠিক করলাম এখানেই কাজ করব। মামাকে বিষয়টা জানালাম। কেউই আমার কাজের পক্ষে না। সবাই বলল ওই কাজের কোনো ভবিষ্যত নেই। আমি তো কারোর কথাই মাথায় নিচ্ছি না। কিন্তু একটা সমস্যা রয়ে গেল। যেই মুদির দোকানে কাজ করি সেখানে বলতে পারছি না। সর্বশেষ আমার মামাকে ওই দোকানে না করে দিতে বললাম। মামা ইতস্ত বোধ করল। আমি বুঝতে পারলাম। কিন্তু আমার এছাড়া আর কোন পথ ছিল না। একদিন কাজে গেলাম না । সেদিনের তারিখটা আমার আজও মনে আছে 31- 12 - 2015। আমার মুদির দোকানের কাজও শেষ । অন্যদিকে আমার জীবনে নতুন এক অধ্যায় শুরু হয় 1- 1- 2016ইং তারিখ। মনে হচ্ছিল সবকিছুই নতুন নতুন। এই কাজ করার প্রধান কারণ ছিল আবার নতুন করে পড়াশোনার সুযোগ। যাই হোক চাকরির পাশাপাশি আবার নতুন করে ক্লাস নাইনে ভর্তি হয়ে গেলাম। আমার জীবনের আরেক অধ্যায় শুরু হলো। প্রতিদিন সকাল সাতটায় প্রাইভেট। সকাল 9 টায় অফিস। আবার বিকেল 3 টায় কোচিং। এভাবে 2017 সালে এসএসসি পাস করলাম। তারপর এইচএসসিতে ভর্তি হলাম। পড়াশুনা আর চাকরি একসাথে চালাতে বেশ হিমশিম খাচ্ছিলাম। এদিকে অফিসের সবার সাথে ভাল সম্পর্ক হয়ে গেল। সবাই আমাকে অনেক সাহায্যও করতো। কম্পিউটারের কাজ আমার অনেক ভালো লাগতো। কিন্তু আমি কম্পিউটারের “ক’’ ও বুঝি না। যখনি সময় পেতাম কম্পিউটার নিয়ে নাড়াচাড়া করতাম। আস্তে আস্তে কম্পিউটারের কাজ শিখে গেলাম। 2019 সাল। আমি এইচএসসি পরীক্ষার্থী। এতদুর আসার পেছনে অনেকের সহযোগিতা রয়েছে। এরমধ্যে অন্যতম আমার প্রাণের প্রতিষ্ঠান “আল- আমানা” 3 ই মার্চ এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হলো। সবার কাছে দোয়া চেয়ে গেলাম পরীক্ষা দিতে। এভাবে পরীক্ষা শেষ করে রেজাল্ট বের হল। আমি 3.92 পয়েন্ট নিয়ে পাশ করলাম। সেদিন ছিল আমার সবচেয়ে বেশি খুশির দিন । কারণ আমার মোটামুটি ভাল ফলাফলের খবর শুনে আমার থেকে আমার প্রতিষ্ঠানের সবাই বেশি খুশি। যাই হোক এবার নার্সিং এ ভর্তি হওয়ার জন্য অ্যাডমিশন পরীক্ষা দিয়ে নার্সিং এ ভর্তি হয়ে গেলাম। এখন 2021 আমি নার্সিং দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আমার জীবনের লক্ষ ঠিক ঠাকই চলছিলো। কিন্তু কভিড-19 সব কিছু শেষ করে দিচ্ছে।