10/12/2025
চট্টগ্রামের পটিয়ার রবীন্দ্র মিত্র পত্রিকা বিলি করতে প্রতিদিন ভোর পাঁচটায় বেরিয়ে পড়েন। না, কোনো বাহনে চেপে নয়। পায়ে হেঁটে। অবাক হলেও সত্যি, পটিয়ার গৈড়লা হাই স্কুল, ঘোষের হাট, তেকোটা, মুকুটনাইট, ধলঘাট ক্যাম্প, খানমোহনা হয়ে কেলিশহর ভট্টাচার্য হাট, দারোগাহাট পর্যন্ত প্রায় ২২ কিলোমিটার গ্রামের পথে হাঁটেন তিনি। তবে বর্তমানে তিনি বাস করেন চট্টগ্রাম শহরে মেয়ের বাসায়। সেখান থেকে বাস ধরে ছুটে যান পটিয়ায়। এরপর শুরু হয় হেঁটে হেঁটে পত্রিকা বিলি। রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে। ঝুম বৃষ্টি বা কাঠফাঁটা রোদ কোনোটাই তাকে বিচলিত করে না। চোখেমুখে বয়সের ছাপ থাকে , থাকে কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ আর হাতে ছাতা—তবে শরীরে থাকে না কোনো ক্লান্তির ছাপ। রবীন্দ্র মিত্ররা খুব ধীরলয়ে পুরো দেশ থেকেই নাই হয়ে যাচ্ছেন। আমরা টেরও পাচ্ছি না।
তাঁর পুরো নাম রবীন্দ্র লাল মিত্র। জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী (এনআইডি) তাঁর বয়স ৮২ বছর। তবে তিনি বলেন তাঁর আসল বয়স ৯৩। এনআইডিতে ভুল আছে।
জানা যায়, খুব ছোটোবলোয় মাত্র ৮ বছর বয়সে তিনি তাঁর বাবাকে হারান। তাঁর বাবার নাম ছিলো নিরঞ্জন লাল মিত্র। ২ ভাই ও ১ বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। বড় ভাই পরিমল লাল মিত্র। তিনি চট্টগ্রামের কে সি দে রোডে পত্রিকা বিক্রি করতেন। রবীন্দ্র বাবাহীন হওয়ার দরুণ খুব বেশিদূর পড়াশোনার চাকা ঘুরিয়ে নিতে পারেন নি। সপ্তম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করতেই তাঁকে ভীষণ হিমশিম খেতে হয়েছে।
কিশোর বয়সেই চট্টগ্রামের একটি প্রেসে চাকরি নেন মাত্র ৫ টাকা বেতনে। সেসময়ে বিয়েটাও সেরে নেন।
প্রেসের কাজ খুবই কষ্টের ছিল রবীন্দ্র মিত্রর। তাও তাতে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন দীর্ঘ ৪০ বছর বয়স পর্যন্ত। এরপর? এরপর চারকরি ছেড়ে দিয়ে পত্রিকার হকার হিসেবে কাজ শুরু করেন। তখন থেকেই শুরু হয় গ্রামে গ্রামে হেঁটে পত্রিকা পৌঁছে দেওয়ার কাজটা। প্রথমে ৩০-৩৫টি পত্রিকা নিয়ে শুরু করেন তিনি। তারপর তা বেড়ে একসময় দাঁড়ায় ২৫০টি পত্রিকাতে। একটাসময় মাস শেষে তাঁর আয় হতো ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা। যা দিয়ে বেশ ভালোমতোই তাঁর সংসার চলেছে। তবে এখন সময় ঘুরছে উল্টোপথে। বর্তমানে অনলাইন পত্রিকা নিস্তেজ করে দিয়েছে ছাপা পত্রিকার আকাশচুম্বী চাহিদাকে। তাই বেশিরভাগ মানুষই ভুলে গেছেন ছাপা পত্রিকার ঘ্রাণ। একেবারেই যে কেউ পড়েন না তাও নয়। গ্রামের আলগোছের পথ ধরে হাঁটা মানুষগুলো পথ পেরিয়ে টং দোকানের চায়ের আড্ডার ফাঁকে পড়ার জন্য ঠিকই খোঁজেন ছাপা পত্রিকা। রবীন্দ্র মিত্ররা তাই এখনও টিকে আছেন খানিকটা। বদলে নেন নি কাজের ধরণকেও। পত্রিকা এখনও বিক্রি করেন। তবে আগের মতো আয় রোজগারটা নেই। বর্তমানে সর্বসাকুল্যে তাঁর আয় থাকে মাত্র ৮ হাজার টাকা। তাও তিনি এই কাজ ছাড়েন নি। সুদূর শহর থেকে গ্রামের পথে নেমে পড়ে গ্রামে গ্রামে পত্রিকার ফেরি করেন। পত্রিকার ফেরিওয়ালা হয়েই বাঁচেন। বাঁচিয়ে রাখেন পুরোনো দিনের ছাপা পত্রিকার সুঘ্রাণটুকুকেও। পত্রিকা বিক্রির ফাঁকে ফাঁকে প্রতিটি সংবাদপত্র তিনি উল্টে দেখেন। কত রকমের খবর সেখানে। মানুষের কাছে সেই খবর পৌঁছে দিতে পেরে ভালো লাগে ভীষণ। যাদের কাছে খবরের পত্রিকা পৌঁছে দেন, তাদের কাছে রবীন্দ্র মিত্রের বেশ সুনাম। ভীষণ পছন্দ করেন তাঁকে। তবে এই কাজ করে কেমন কাটছে রবীন্দ্র মিত্রের জীবন?
রবীন্দ্র মিত্রের কোনো ছেলে নেই। পাঁচ মেয়ে। স্ত্রী বেলু মিত্র ৩ বছর ধরে অসুস্থ। মেজ মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে থাকেন তাঁর স্ত্রী। রবীন্দ্র মিত্র থাকেন তৃতীয় মেয়ের বাসায়, চট্টগ্রাম শহরে। প্রতিদিন সেখান থেকে উঠে কে সি দে রোড থেকে পত্রিকা সংগ্রহ করে দৌঁড়ঝাঁপ শুরু করেন পটিয়ার গন্তব্যে।
রবীন্দ্র মিত্র বলেন, আমার যত দিন শরীর চলবে, তত দিন পত্রিকা বিক্রি করে নিজের খাবারটুকু নিজেই জোগাড় করব।’ এলাকায় চেয়ারম্যানের সুবাদে নামেমাত্র বয়স্ক ভাতা জোটে রবীন্দ্র মিত্রের কপালে। মাত্র ৬ ‘শ টাকা। একটু দুঃখবোধ করে বলেন যদি অন্তত ১ হাজার টাকা দিতো তাও কিছুটা চলতো । পত্রিকার বিক্রির কাজ প্রসঙ্গে তিনি দুঃখ নিয়ে বলছিলেন ছাপা পত্রিকার বর্তমান অবস্থার কথা। মুঠোফোনের কারণে এখন বেশির ভাগ মানুষ পত্রিকা কেনেন না। তিনি বলেন, ‘পত্রিকা হাতে নিয়ে পড়ার আনন্দ এখন আর পায় না মানুষ।’
রবীন্দ্র মিত্র আমাদের সকল প্রজন্মের জন্য উদ্দীপনা আর নিষ্ঠার প্রতীক। তিনি দীর্ঘজীবী হোন! তাঁর জন্য অফুরান শ্রদ্ধা! ❤
#চট্টগ্রাম #পটিয়া #হৃদয়েরপটিয়া #চট্টগ্রাম