27/08/2026
আমি মাদরাসা খুলেছি, দোকান নয়............?
-আল্লামা তাক্বি উসমানী (দা:বা:)
আমার শ্রদ্ধেয় আব্বাজান হযরত মাওলানা মুফতি মুহাম্মদ শফী রাহ. আমাদেরকে অসিয়ত করে বললেন, শোনো! আমি মাদরাসা খুলেছি, কোনো দোকান খুলি নি, এবং যে কোনো মূল্যে তা চালু রাখা আমার দায়িত্ব নয়। তবে আমার দায়িত্ব হলো যথাসাধ্য চেষ্টা করা। তেমনিভাবে সদা-সর্বদা চালু রাখাও আমার দায়িত্ব নয়। তাই যতদিন সম্ভব সঠিক পদ্ধতি ও ন্যায়-নিষ্ঠার সাথে চালাও। কিন্তু যেদিন ন্যায়-নীতি ত্যাগ করতে হবে সেদিন মাদরাসা তালাবদ্ধ করে দিবে। কেননা মাদরাসা মূল উদ্দেশ্য নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টিই মূল উদ্দেশ্য। আর এ উদ্দেশ্য তখনই অর্জন হবে যখন মাদরাসা সঠিক নিয়মে পরিচালনা করা হবে। সঠিক নিয়মে চালানো সম্ভব না হলে অন্য কোনো পেশা খুঁজে নাও।
সাধারণত যখন মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করা হয় তখন মস্তিষ্কে এই কথা বদ্ধমূল থাকে যে, যেকোনো মূল্যে মাদরাসা চালু রাখতেই হবে। তখন সঠিক পন্থায় পরিচালনা সম্ভব না হলে ভুল পন্থায় পরিচালিত হয়। কিন্তু মুফতি শফী রাহ. বলতেন, ভুল পন্থায় মাদরাসা পরিচালনার প্রশ্নই হয় না। তাই সঠিক পন্থায় না চললে বন্ধ করে দাও। এর জন্য আখেরাতে জিজ্ঞাসিত হবে না। তিনি আজীবন এই নিয়ম বজায় রেখেছেন। এর বিপক্ষে কোনো আবেগ-অনুভূতির ক্ষেত্রে ছাড় দেন নি।
যখন দারুল উলূম করাচী নানকওয়াডা থেকে বর্তমান স্থানে স্থানান্তরিত হয় তখন এই জায়গা জনমানবহীন বিরানভূমি ছিলো। এমন জঙ্গল ছিলো যে, দূর-দূরান্ত পর্যন্ত পানি, বিদ্যুত ও ফোন ছিলো না। এখানে যাতায়াতের কোনো পরিবহণ ব্যবস্থাও ছিলো না। সুদূর জঙ্গল পেরিয়ে প্রায় দু'মাইল দূরে বাস পাওয়া যেতো। পানি শারাফিগোঠ থেকে আনা হতো। এখানকার বর্তমান প্রসিদ্ধ শিক্ষকমণ্ডলীও কষ্টদায়ক জীবনযাপনের কারণে তখন এখানে আসতে রাজি ছিলেন না। এমনকি তখন কয়েকজন নামিদামি শিক্ষক চলে যান, যাদেরকে মাদরাসার ভিত্তি মনে করা হতো। তাদের চলে যাওয়াতে বাহ্যিকভাবে মাদরাসার উপর প্রভাব পড়েছিলো। হিতাকাঙ্ক্ষীরা আব্বাজানকে বললেন, বড় বড় উস্তাযগণ চলে গেলে মাদরাসা চলবে কীভাবে! কোনো প্রসিদ্ধ উস্তাযকে চিঠি লিখে আসতে বলেন। কিন্তু আব্বাজান বললেন, এটা নিয়ম বহির্ভূত। আমি এমন করতে পারবো না। আমি এমন করতে পারবো না যে, এক মাদরাসা বরবাদ করে আরেক মাদরাসা আবাদ করবো। সে তো কোনো এক মাদরাসায় চাকরি করছে। তাই আমি بيع على بيع أخيه করতে পারবো না। তবে সে যদি স্বেচ্ছায় চলে আসে সেটা ভিন্ন কথা।
এক বছর এমন হলো যে, দাওরায়ে হাদীসে মাত্র ১২/১৩ জন ছাত্র ছিলো। লোকেরা বলতে লাগলো, দাওরায়ে হাদীসে মাত্র ১২/১৩ জন ছাত্র! হযরত বললেন, ছাত্রদের সংখ্যা বেশি হওয়া আবশ্যকীয় নয়। সঠিক নিয়মে আমরা যতটুকু করতে পারবো ততটুকুই আমাদের দায়িত্ব। চাই ছাত্র ১০ জন হোক, ০৫ জন হোক অথবা ০১ জন। সঠিক পন্থা ত্যাগ করে ছাত্রদের সংখ্যা বাড়াতে পারবো না। এভাবে কয়েক বছর কেটে গেলো। লোকেরা বরাবর বলতে থাকলো, অমুক মাদরাসায় এতো এতো ছাত্র আর এখানে মাত্র ১৪ জন! এর উত্তরে আব্বাজান বলতেন, ছাত্রদের সংখ্যা বৃদ্ধি করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমাদের উদ্দেশ্য তো হলো দ্বীনের খেদমত করা। তাই উস্তাযের মত একজন উস্তাযই যথেষ্ট। কেউ বললো, হযরত এখন তো প্রয়োজন ও অপারগতার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বললেন, মৌলভীদের মতো যুক্তি দিবেন না। এই কাজ আমি করতে পারবো না। হ্যাঁ, কেউ স্বেচ্ছায় কোনো মাদরাসা ছাড়লে তাকে ডেকে পাঠাবো। হযরত আজীবন এই নিয়মে কাজ করেছেন।
এ কথা স্মরণ রাখতে হবে, যেহেতু দ্বীনই আসল উদ্দেশ্য, সুতরাং সকল ক্ষেত্রে দ্বীনের শিক্ষা সামনে থাকতে হবে। এবং সে অনুযায়ী আমল করতে হবে। এমন যেনো না হয় যে, মাদরাসার জন্যে এক নিয়ম হবে আর অন্যদের জন্যে আরেক নিয়ম।