02/10/2026
জীবনের আসল প্রাপ্তি কি??
আল্লাহ যাঁর কল্যাণ চান, তাঁকে ১টা জিনিস দেন — বাকি সব এমনিতেই আসে
একটা দৃশ্য কল্পনা করুন। আপনি একটা কোম্পানিতে ইন্টারভিউ দিতে গেলেন। আপনাকে বলা হলো — "আমরা তোমাকে একটা মাস্টার-কী দেব। এই একটা চাবি দিয়ে তুমি অফিসের সব দরজা খুলতে পারবে — ক্যান্টিন, লাইব্রেরি, কনফারেন্স রুম, এমনকি সিইও-র অফিস পর্যন্ত।" আপনি কি সেই চাবি নেবেন, নাকি বলবেন — "না, আমাকে আলাদা আলাদা ৫০টা চাবি দিন"?
নিশ্চয়ই মাস্টার-কী নেবেন। কারণ একটা চাবিতে সব দরজা খোলে — সেটাই বুদ্ধিমানের কাজ।
অথচ আশ্চর্যের কথা শুনুন। আমাদের জীবনেও আল্লাহ জাল্লা জালালুহু ঠিক এমনই একটা মাস্টার-কী রেখেছেন। একটা জিনিস পেলে ভালো চাকরি, সুখী সংসার, সুস্থ শরীর, প্রশান্ত অন্তর — সবকিছু ধীরে ধীরে আসতে থাকে। কিন্তু আমরা সেই মাস্টার-কী খুঁজছি না — বরং আলাদা আলাদা ৫০টা চাবি নিয়ে দৌড়াচ্ছি।
সেই একটা জিনিস কী? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের মুখে বলে গেছেন —
مَنْ يُرِدِ اللَّهُ بِهِ خَيْرًا يُفَقِّهْهُ فِي الدِّينِ
উচ্চারণ: মাইঁ ইউরিদিল্লাহু বিহি খাইরান, ইউফাক্কিহহু ফিদ্দীন।
অর্থ: আল্লাহ যাঁর কল্যাণ চান, তিনি তাকে দ্বীনের গভীর বুঝ দান করেন। (সহিহ বুখারি: ৭১; সহিহ মুসলিম: ১০৩৭)
এবার হাদিসটা ভেঙে ভেঙে দেখি — এর ভেতরে কী কী লুকিয়ে আছে।
প্রথমে লক্ষ করুন — "মাইঁ ইউরিদিল্লাহু বিহি খাইরান" — আল্লাহ যাঁর কল্যাণ চান। এখানে "খাইর" শব্দটা ব্যাপক। খাইর মানে শুধু আখিরাতের কল্যাণ নয় — দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতের কল্যাণ। অর্থাৎ আল্লাহ যখন কারো সামগ্রিক ভালো চান — তাঁর রিজিক, স্বাস্থ্য, পরিবার, আখিরাত সবকিছু মিলিয়ে — তখন তিনি কী করেন? একটা ব্যবসা দেন? একটা চাকরি দেন? একটা বিশাল ব্যাংক ব্যালেন্স দেন? না। তিনি একটা জিনিস দেন, যেটা বাকি সবকিছুর চাবি।
দ্বিতীয় অংশ — "ইউফাক্কিহহু ফিদ্দীন" — তাকে দ্বীনের গভীর বুঝ দান করেন। খেয়াল করুন — আল্লাহ বলেননি "দ্বীন শেখান," বলেছেন "দ্বীনের ফিকহ দান করেন।" ফিকহ মানে শুধু হালাল-হারামের তালিকা জানা নয়। ফিকহ মানে গভীর বোঝাপড়া — জীবনের প্রতিটা পরিস্থিতিতে আল্লাহ কী চান, সেটা বুঝতে পারা। চট্টগ্রামের একজন ব্যবসায়ী যখন বোঝেন — এই ব্যবসায়িক সুযোগটা লোভনীয়, কিন্তু এতে সুদের ছোঁয়া আছে, তাই আমি এড়িয়ে যাব — এটাই ফিকহ। ঢাকার একজন চাকরিজীবী যখন বোঝেন — বসের অন্যায় আদেশ মানা যাবে না, যদিও চাকরি যেতে পারে — এটাই ফিকহ।
এবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটা বুঝুন। এই হাদিসে একটা উল্টো যুক্তি লুকিয়ে আছে — যেটা অনেকে খেয়াল করেন না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন — আল্লাহ যাঁর কল্যাণ চান, তাঁকে দ্বীনের বুঝ দেন। তাহলে উল্টোটাও সত্য — আল্লাহ যাঁর কল্যাণ চান না, তাঁকে দ্বীনের বুঝ দেন না। অর্থাৎ যে মানুষটা দ্বীন নিয়ে কোনো আগ্রহ রাখে না, দ্বীনি ইলম অর্জনের কোনো চেষ্টা করে না — সে আসলে আল্লাহর কল্যাণের তালিকা থেকে বাদ পড়ে যাচ্ছে। ভাবুন একবার — আপনার ব্যাংক ব্যালেন্স বাড়ছে, গাড়ি আছে, ফ্ল্যাট আছে — কিন্তু দ্বীনের বুঝ নেই। আল্লাহর হিসাবে আপনার "খাইর" হচ্ছে না — আপনি শুধু দুনিয়ার "কিছু অংশ" পাচ্ছেন। এটাই সেই ভয়ংকর বাস্তবতা, যেটা আমরা বুঝি না।
এখন প্রশ্ন — কেন দ্বীনের বুঝ পেলে বাকি সব আসে? কারণ দ্বীনের বুঝ আপনার পুরো জীবনের সমীকরণ বদলে দেয়। যে মানুষটার অন্তরে দ্বীনের গভীর বোঝাপড়া ঢুকে যায়, তাঁর রিজিকের সাথে সম্পর্ক বদলে যায় — তিনি আর টাকার পেছনে দৌড়ান না, টাকা তাঁর পেছনে আসে। তাঁর পরিবারের সাথে সম্পর্ক বদলে যায় — কারণ তিনি স্ত্রী-সন্তানের হক বোঝেন, ধৈর্য ধরেন, ক্ষমা করেন। তাঁর স্বাস্থ্যের সাথে সম্পর্ক বদলে যায় — কারণ তিনি শরীরকে আল্লাহর আমানত মনে করেন। সবকিছু একটা জায়গা থেকে ঠিক হতে থাকে — সেই জায়গাটা হলো অন্তরের দ্বীনি বোঝাপড়া।
আল্লাহ জাল্লা জালালুহু কুরআনে এই সত্যটা আরেকভাবে নিশ্চিত করেছেন —
مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِّن ذَكَرٍ أَوْ أُنثَىٰ وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً
অর্থ: যে সৎকর্ম করবে — পুরুষ হোক বা নারী — এবং সে মুমিন, আমি অবশ্যই তাকে একটি পবিত্র সুন্দর জীবন দান করব। (সূরা নাহল: ৯৭)
"হায়াতান তাইয়িবাহ" — পবিত্র সুন্দর জীবন। এটাই সেই ফল, যেটা দ্বীনের বুঝ থেকে জন্ম নেয়। ঢাকার গুলশানের যে মানুষটা কোটি টাকার ফ্ল্যাটে থেকেও ডিপ্রেশনের ওষুধ খান — তাঁর কাছে এই হায়াতান তাইয়িবাহ নেই। আর গ্রামের যে কৃষক সারাদিন মাঠে খেটে রাতে তাহাজ্জুদে কাঁদেন — তাঁর চোখে যে প্রশান্তি, সেটাই হায়াতান তাইয়িবাহ। টাকা দিয়ে বিছানা কেনা যায়, ঘুম কেনা যায় না। টাকা দিয়ে ওষুধ কেনা যায়, আরোগ্য কেনা যায় না। টাকা দিয়ে বিনোদন কেনা যায়, অন্তরের প্রশান্তি কেনা যায় না।
তাহলে হিসাবটা মেলান। আল্লাহর মাস্টার-কী হলো দ্বীনের গভীর বুঝ। এই একটা চাবি পেলে — রিজিকে বরকত আসে, পরিবারে শান্তি আসে, অন্তরে প্রশান্তি আসে, আর আখিরাতে জান্নাত অপেক্ষা করে।
(সংগৃহীত )