31/03/2026
চল্লিশের কোঠায় এসে আমার এক বান্ধবীর স্বামী মারা যায়। জীবনটা যেখানে নতুন করে গুছানোর কথা, সেখানে হঠাৎ সবকিছু ভেঙে পড়ে। অফিসের কিছু পুরুষ সহকর্মী মাঝেমধ্যে তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার ছলে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করত। চা, আড্ডা, আর গল্পগুজবের আড়ালে কষ্ট বাড়ানোর মতো কিছু বাক্য ছুঁড়ে দিতো অবলীলায়। একদিন তেমন এক আড্ডায় গল্পের ছলে বলল, “আপনার তো জীবনের সবই শেষ…” “আপনি তো এখন বুড়ি হয়ে গেছেন, স্বামীও তো নাই…!”
সেদিন বান্ধবী চুপ না থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলেছিল, “কে বলেছে আমি বুড়ি হয়ে গেছি? Humayun Ahmed তো আমার চেয়েও বেশি বয়সে নতুন করে বিয়ে করেছে, বাবা হয়েছে, জীবনটা উপভোগ করে গেছে, নিজের মতো করে বেঁচেছে এবং দাপটের সাথে মারাও গিয়েছে। বয়স হওয়ার পরে তার জীবনের মূল্য যদি কমে না যায়, তাহলে আমার জীবনের মূল্য কমে যাবে কেন?”
তারপর সে যোগ করল,
“আমি দেখতে সুন্দরী, আমি বুদ্ধিমতী, আমি সাহসী। যে কোনো পরিস্থিতি আমি সামলে নিতে পারি। আমার নাবালক দুইটা সন্তান আছে, আমি তাদের পড়াচ্ছি, মানুষ করছি। মা হিসেবে যা করার, করছি। বাবা হিসেবেও যা দরকার, সেটাও করছি। নিজে ইনকাম করি, নিজের মত চলি। কারো কাছে হাত পাতি না। চাইলে বিয়ে করতে পারি, করি না কারণ প্রয়োজন মনে করি না। তাহলে আমার মূল্য কমে গেল কিভাবে? আমার জীবন শেষ হয়ে গেল কবে? আপনারা যদি ভাবেন জীবন একটা বয়সের পরে শেষ, সেটা আপনাদের বৃথা চিন্তা। আমি তো তা মানি না।”
আমরা নারীদেরকে আসলে বয়স দিয়ে বিচার করতে শিখেছি আজীবন, যোগ্যতা দিয়ে না। যে কারো একটু বয়স হয়ে গেলেই তাকে "বুড়ি" বলে হেয় করার চেষ্টা করা হয়। "বুড়ি" শব্দটাকে গালি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। জীবন কি কখনোই একটা সংখ্যায় আটকে থাকে?
"বুড়ি” তো একটা বয়স নির্দেশক শব্দ মাত্র। যদিও ইদানিং সোশ্যাল মিডিয়ায় এটাকে কাউকে ছোট করা, হেয় করা বা অপমান করার জন্য অহরহ ব্যবহার করা হয়। তখন এই শব্দটা-ই গালি হয়ে যায়। একই বয়স ভিন্ন মানুষের কাছে ভিন্নভাবে দেখা হয়। ১৬ বছরের কাছে ২৬ “বুড়ি”, ২৬-এর কাছে ৩৬ “বুড়ি”, আবার ৩৬-এর কাছে ৪৬ "বুড়ি"।
বয়সটা তো আপেক্ষিক। কিন্ত এখনকার ছেলেমেয়েরা যখন কাউকে অপছন্দ করে বা আক্রমণ করতে চায়, তখন “বুড়ি”, “খালা”, “আন্টি” সম্বোধনগুলো ব্যবহার করে। এগুলো ইচ্ছা করে আঘাত দেওয়ার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
জয়া আহসান আর বিপাশা হায়াত, এই দুইজনকে নিয়ে ইদানীং অদ্ভুত একটা তুলনা চলছে। প্রথম কথা, তারা কি একই বয়সের? না। তাদের ক্যারিয়ারের সময়, পথচলা, সবই আলাদা। Bipasha Hayat অনেক আগে মিডিয়ায় এসেছেন, আর Jaya Ahsan পরে এসে নিজের জায়গা তৈরি করেছেন। বিপাশা হায়াত নিজের চুল সাদা রাখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, এটা তার ব্যক্তিগত পছন্দ। এতে কি তার সৌন্দর্য কমে গেছে? একদমই না। Still she is beautiful! অন্যদিকে জয়া আহসান নিজেকে ফিট রাখেন, গ্ল্যামারাস লুকে থাকেন, অভিনয় আর মডেলিং, সবই করছেন দারুণভাবে।
দুইজনের জীবনযাপন আলাদা, পছন্দ আলাদা, স্টাইল আলাদা, আর সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই দুইজনের ছবি পাশাপাশি বসিয়ে “বুড়ি” প্রমাণ করার যে চেষ্টা, এটা শুধু অরুচিকর না, এটা সরাসরি মানসিক দারিদ্র্যের প্রকাশ।
একজন নারী নিজের মতো করে বাঁচলে, তাতেও সমস্যা, আর অন্যভাবে বাঁচলেও সমস্যা! বয়সের উল্লেখ করে কেন নারীদেরকে এই অবমূল্যায়ন করা হবে? কখনো কি কোন পুরুষকে বয়সের কারণে অবমূল্যায়িত হতে দেখেছেন?
বয়স কখনোই কোনো সীমাবদ্ধতা না। শেষ পর্যন্ত, জীবন কোনো নির্দিষ্ট বয়সে থেমে যায় না, থেমে যায় আমাদের চিন্তাধারায়। একজন মানুষের মূল্য তার বয়সে নয়, তার সাহস, আত্মসম্মান, সক্ষমতা আর বেঁচে থাকার ইচ্ছায়। “বুড়ি” শব্দটা যদি কাউকে হেয় করার অস্ত্র হয়ে ওঠে, তাহলে সমস্যাটা শব্দে না, সমস্যাটা আমাদের মানসিকতায়।
একজন নারী কবে, কখন, কীভাবে বাঁচবে, সেটা তার নিজের সিদ্ধান্ত। সমাজের বানানো মাপকাঠিতে তার জীবনকে ছোট করে দেখার অধিকার কারো নেই। বয়স শুধু সংখ্যা, কিন্তু জীবন তার চেয়ে অনেক বড়, অনেক গভীর, অনেক সম্ভাবনাময়। তাই আমরা মানুষকে বয়স দিয়ে নয়, তার মানুষত্ব দিয়ে বিচার করতে শিখি। কারণ, জীবন কখনোই শেষ হয়ে যায় না, যতক্ষণ না মানুষ নিজে হাল ছেড়ে দেয়। আর সম্মানটা বয়সের তুলনা করে নয়, উপলব্ধি করে দিতে হয়।
collected