06/21/2026
গ্রিনল্যান্ডের দক্ষিণে তৈরি হয়েছে রহস্যময় এক ‘কোল্ড ব্লব’। চারপাশের সমুদ্র যখন ক্রমশ উষ্ণ হচ্ছে, তখন এই অঞ্চল বরং ঠান্ডা হয়ে উঠছে। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, এর পিছনে রয়েছে আটলান্টিকের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক সঞ্চালন ব্যবস্থা এএমওসির দুর্বল হয়ে পড়া। এর প্রভাব পড়তে পারে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা এমনকি ভারতের বর্ষাতেও।
---
পৃথিবীর সব সমুদ্র যখন একের পর এক উষ্ণতার নতুন চিহ্ন গড়ছে, তখন উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের একটি অংশ যেন উল্টো পথে হাঁটছে। গ্রিনল্যান্ডের দক্ষিণে, আইসল্যান্ডের কাছাকাছি বিস্তীর্ণ জলভাগে গত কয়েক দশক ধরে তাপমাত্রা কমেছে বা খুব ধীরে বেড়েছে। এই অস্বাভাবিক শীতল অংশটিকেই বিজ্ঞানীরা বলছেন ‘কোল্ড ব্লব’। প্রথমে একে স্বাভাবিক ওঠানামা বলে মনে করা হলেও এখন বহু গবেষক মনে করছেন, এটি পৃথিবীর জলবায়ু ব্যবস্থার গভীরে ঘটে চলা বড় এক পরিবর্তনের দৃশ্যমান চিহ্ন। সেই পরিবর্তনের নাম আটলান্টিক মেরিডিওনাল ওভারটার্নিং সার্কুলেশন বা সংক্ষেপে এএমওসি।
এএমওসি আসলে বিশাল এক সামুদ্রিক সঞ্চালন ব্যবস্থা। এটি পৃথিবীর বিষুবরেখার কাছাকাছি অঞ্চল থেকে উষ্ণ ও লবণাক্ত জলকে উত্তর আটলান্টিকের দিকে নিয়ে যায়। গ্রিনল্যান্ড ও উত্তর মেরুর কাছাকাছি পৌঁছে সেই জল ঠান্ডা ও ভারী হয়ে গভীরে ডুবে যায়, তারপর সমুদ্রের তলদেশ বরাবর আবার দক্ষিণে ফিরে আসে। এই পুরো প্রক্রিয়াটি পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধের তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, ঝড়ের গতিপথ এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা পালন করে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই সঞ্চালন ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়লে তার প্রভাব শুধু ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকায় নয়, বহু দূরের ভারতেও পৌঁছাতে পারে।
গত কয়েক বছরে প্রকাশিত একাধিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, এএমওসি গত শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের তুলনায় প্রায় পনেরো থেকে কুড়ি শতাংশ দুর্বল হয়েছে। কিছু গবেষকের মতে, গত এক হাজার বছরের মধ্যে এই সঞ্চালন ব্যবস্থা এখন সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। এর কারণ হিসেবে উঠে আসছে গ্রিনল্যান্ডের বরফ দ্রুত গলে যাওয়া, বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন এবং উত্তর আটলান্টিকে বিপুল পরিমাণ মিঠে জলের প্রবাহ। মিঠে জল সমুদ্রের জলের লবণাক্ততা কমিয়ে দেয়, ফলে জল আগের মতো ভারী হয়ে তলিয়ে যেতে পারে না। এর ফলেই ধীরে ধীরে কমে যেতে পারে এএমওসির গতি।
দুই হাজার ছাব্বিশ সালের মে ও জুন মাসে এই বিষয়টি আবার আলোচনায় এসেছে নতুন কয়েকটি গবেষণা ও বিশ্লেষণের কারণে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, গ্রিনল্যান্ডের দক্ষিণে যে কোল্ড ব্লব দেখা যাচ্ছে, সেটি কেবল স্থানীয় আবহাওয়ার প্রভাব নয়। বরং দীর্ঘমেয়াদি সমুদ্র সঞ্চালনের পরিবর্তনের সঙ্গেই এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। উনিশ শতকের শেষ দিক থেকে এই অঞ্চলের গড় তাপমাত্রা প্রায় শূন্য দশমিক পাঁচ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা প্রায় এক ডিগ্রি ফারেনহাইট কমেছে, যেখানে পৃথিবীর অধিকাংশ সমুদ্র উল্টো উষ্ণ হয়েছে।
তবে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে ভারতের সঙ্গে এই কোল্ড ব্লবের সম্ভাব্য সম্পর্ক। চলতি বছরে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, উত্তর আটলান্টিকের এই শীতল অঞ্চল ভারতীয় গ্রীষ্মকালীন বর্ষার ধরন বদলে দিতে পারে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, উনিশশো নিরানব্বই সালের পর থেকে উত্তর-পশ্চিম ভারতে গড় বৃষ্টিপাত প্রায় পঁচিশ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে গঙ্গা সমভূমি অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কমেছে প্রায় চার শতাংশ। গবেষকদের ধারণা, কোল্ড ব্লবের কারণে বায়ুমণ্ডলের সঞ্চালন ব্যবস্থায় পরিবর্তন ঘটছে, যার প্রভাব পড়ছে ভারত মহাসাগর ও মৌসুমি বায়ুর উপর। অর্থাৎ, আটলান্টিক মহাসাগরের একটি অঞ্চলের পরিবর্তন কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরের মানুষের জীবনেও প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে সব বিজ্ঞানী একমত নন। একদল গবেষক মনে করেন, কোল্ড ব্লবের পেছনে সমুদ্র সঞ্চালনের পাশাপাশি বায়ুমণ্ডলের পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ঝড়ের গতিপথ, বায়ুর চাপ এবং বাতাসের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন এই শীতল অঞ্চল তৈরিতে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ এবং সমুদ্রের গভীর স্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে বহু গবেষক এখন মনে করছেন, মূল কারণ হিসেবে এএমওসির দুর্বলতাকেই সবচেয়ে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল, এই দুর্বলতা কি একসময় বিপজ্জনক সীমায় পৌঁছাতে পারে? বিজ্ঞানীরা বলছেন, এএমওসি এমন একটি ব্যবস্থা যার একাধিক স্থিতিশীল অবস্থা থাকতে পারে। অর্থাৎ এটি ধীরে ধীরে দুর্বল হতে পারে, আবার কোনও নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করলে দ্রুত আরও দুর্বল অবস্থায় চলে যেতে পারে। সেই সীমা কোথায়, তা এখনও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। কেউ বলছেন, এই শতাব্দীর মধ্যেই বড় পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। আবার কেউ মনে করছেন, সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার আশঙ্কা এখনও খুব স্পষ্ট নয়। তাই বিজ্ঞানীদের বক্তব্যে আতঙ্কের চেয়ে সতর্কতার সুরই বেশি শোনা যাচ্ছে।
কোল্ড ব্লবকে তাই এখন আর শুধুমাত্র সমুদ্রের একটি অদ্ভুত শীতল অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে না। বরং এটি পৃথিবীর জলবায়ু ব্যবস্থার গভীরে ঘটে চলা পরিবর্তনের একটি দৃশ্যমান চিহ্ন। পৃথিবীর উষ্ণ হতে থাকা সমুদ্রের মাঝখানে এই শীতল অঞ্চল যেন বিজ্ঞানীদের সামনে বারবার একই প্রশ্ন তুলে ধরছে—পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক সঞ্চালন ব্যবস্থাগুলোর একটি ঠিক কতটা বদলে যাচ্ছে, আর সেই বদলের অভিঘাত কত দূর পর্যন্ত পৌঁছাবে।