05/05/2018
স্পিন বল কাহাকে বলে ও কি কি উদহারন সহ বর্ণনা করা হলো।
-------------------------------
একটা সময় ছিল যখন ক্রিকেটে কেবল দুই ধরনের বোলার ছিল। এক. যারা জোরে বল করতে পারে এবং দুই. যারা জোরে বল করতে পারে না। এই দুই প্রকারের বাইরেও যে বোলিংয়ের আরেকটি ধারা আছে, সেটির সন্ধান পেতে অবশ্য খুব বেশিদিন সময় লাগে নি। হ্যাঁ, বোলিংয়ের এই 'তৃতীয়' ধারাটির নাম স্পিন। আজ আপনাদের জানাব স্পিন বোলিংয়ের বেসিক কিছু ধারণা যেগুলো আসলে না জানলেই নয়।
বলা হয়ে থাকে,“স্পিন বোলিং ইজ মোর অ্যান আর্ট দ্যান সাইন্স”। একজন স্পিন বোলারের মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে বলের ফ্লাইট, লুপ, স্পিড এবং টার্নের বৈচিত্র্য দিয়ে ব্যাটসম্যানকে বিভ্রান্ত (deceive) করা। এই বিভ্রান্তি সৃষ্টি করাই একটা শিল্প, স্পিন বোলিংয়ের আসল সৌন্দর্য। এই শিল্পকে খেলার ময়দানে ঠিকঠাক ফুটিয়ে তুলতে একদল নির্ভর করেন আঙুলের কারিকুরিতে, আরেকদল নির্ভর করেন কবজির মোচড়ে।
যেকোন স্পিনারের প্রতিটা ডেলিভারির কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। সেগুলো হল-
১. ফ্লাইট (Flight)
একটা বলকে আলতো করে বাতাসে ভাসিয়ে দেয়ার (tossing the ball up in the air) নামই ফ্লাইট। ক্লাসিক স্পিন বোলিংয়ের সৌন্দর্যই হচ্ছে ফ্লাইট।
২. ডিপ (Dip)
'ডিপ’ মানে কোন বস্তুর ওপর থেকে দ্রুত নিচে নেমে যাওয়া বুঝায়। বলের ফ্লাইট অনুযায়ী বল যেখানে পিচ করার কথা, সেখানে না পড়ে যদি কিছুটা শর্টার লেন্থে পড়ে, তখন সেটাকে বলা হয় ডিপ।
আমরা জানি, বলের ওপর সাইড স্পিন ছাড়াও আরও দুই ধরনের স্পিনিং ফোর্স কাজ করে। একটা হচ্ছে ওভার স্পিন বা টপ স্পিন, আরেকটা হল ব্যাকস্পিন। বলের ওপর প্রযুক্ত ব্যাকস্পিন যত বেশি হবে, বলটি তত বেশি বাতাসে ফ্লোট (float) করবে এবং সামনে এগিয়ে যাবে। আর বলের ওপর ওভার স্পিন যত বেশি থাকবে, বলটির ফ্লাইট থেকে ডিপ করার সম্ভাবনা তত বেড়ে যাবে।
ডিপের কারণেই ব্যাটসম্যান বলের ফ্লাইট এবং লেন্থ বুঝতে ভুল করে (misjudging the length)।
৩. লুপ (Loop)
লুপকে আমরা বলতে পারি এক ধরনের ইলিউশান। ফ্লাইট এবং ডিপ একসাথে মিলে লুপ সৃষ্টি করে। বলা যায়, ফ্লাইটেড ডেলিভারির লেন্থের যে বৈচিত্র্য সেটাই লুপ।
৪. টার্ন (Turn)
বল মাটিতে বাউন্স করার পর তার প্রাথমিক লাইন বা গতিপথ থেকে যেকোন একপাশে ঘুরে যাওয়া (lateral deviation) অর্থাৎ বাঁক নেওয়াকে আমরা বলছি টার্ন। এটা নির্ভর করে বলের ওপর প্রয়োগকৃত রেভ্যুলেশনের (রোটেশন/ঘূর্ণন সংখ্যা) ওপর। ফিঙ্গার বা রিস্টের ঘূর্ণন সংখ্যা যত বেশি হয়, বল টার্ন করার সম্ভাবনাও তত বেড়ে যাবে। টার্নের জন্য দায়ী স্পিনিং ফোর্সের নাম সাইড স্পিন।
একটা বল কোন পাশে কতটুকু টার্ন করবে সেটা নির্ভর করে বোলারের গ্রিপ, সিম ও রিস্ট পজিশন এবং রিলিজ পয়েন্টের ওপর। বলের পেস, ফ্লাইট এবং পিচও এক্ষেত্রে ফ্যাক্টর হতে পারে।
৫. ড্রিফট (Drift)
বল পিচ করার পূর্বে বাতাসে বলের গতিপথে যে পার্শ্বীয় বিচ্যুতি (lateral deviation) ঘটে তাকে বলা হয় ড্রিফট। তার মানে বাতাসে বলের গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে যেকোন একদিকে সরে যাওয়াকেই (movement of the ball through the air) বলে ড্রিফট।
টার্নের মত ড্রিফটও নির্ভর করে বলের ওপর প্রয়োগকৃত রেভ্যুলেশনের (রোটেশন/ঘূর্ণন সংখ্যা) ওপর। যেকোন ঘূর্ণায়মান বস্তুর ড্রিফটের জন্য দায়ী যে বল তাকে বলা হয় ম্যাগনাস ফোর্স (Magnus force)।
ড্রিফট এবং টার্নের নিখুঁত কম্বিনেশনই একটা ডেলিভারিকে ব্যাটসম্যানের কাছে করে তুলতে পারে দুর্বোধ্য। ড্রিফটের কারণেই ব্যাটসম্যান অনেক সময় ভুল লাইনে খেলতে বাধ্য হয়।
৬. বাউন্স ও স্কিড (Bounce & Skid)
বল মাটিতে পিচ করার পর বলের হাইট যদি প্রত্যাশার চেয়ে বেশি হয় তখন আমরা বলি বল বাউন্স করছে। আর বলের হাইট যদি প্রত্যাশার চেয়ে কম হয় অর্থাৎ লো হয়ে যায় তখন বলা হয় যে বল স্কিড করছে।
বল বাউন্স করে মূলত ওভার স্পিনের কারণে, আর স্কিডের জন্য দায়ী ব্যাকস্পিন। টার্নের মত বাউন্সও পিচের ওপর নির্ভরশীল। তবে বোলারের হাইটও বাড়তি বাউন্স আদায়ের ক্ষেত্রে একটা ফ্যাক্টর হতে পারে।
বাউন্সের সাথে টার্ন যোগ হলে সেটা যেকোন ব্যাটসম্যানকে সমস্যায় ফেলতে বাধ্য।
এবারে আসি স্পিন বোলিংয়ের বিভিন্ন টাইপ প্রসঙ্গে।
টেকনিক্যালি স্পিন বোলার দুই প্রকার। আঙুলের কারিকুরির সাহায্যে যারা বল ঘোরান, তাদের বলে ফিঙ্গার স্পিনার আর যারা কবজির মোচড়ে বলকে স্পিন করান তাদের বলে রিস্ট স্পিনার।
'অফ স্পিন' এবং 'লেগ স্পিন' এই দুটো টার্ম দিয়ে কেবল স্পিনের ডিরেকশন বা গতিপথ বুঝায়। একজন বোলারকে লেগ স্পিনার না অফ স্পিনার বলব সেটা নির্ভর করছে তার স্টক ডেলিভারির ওপর।
সকলের বোঝার সুবিধার্থে স্পিন বোলিংকে ৪টা বেসিক ক্যাটাগরিতে ভাগ করলাম।
১. ডানহাতি ফিঙ্গার স্পিন/ রাইট আর্ম অফ ব্রেক
ডানহাতি ফিঙ্গার স্পিনারের স্টক ডেলিভারি হচ্ছে অফ ব্রেক। বল রিলিজের সময় আঙুলের মুভমেন্ট হবে বাম থেকে ডানে অর্থাৎ ঘড়ির কাঁটার দিকে।
যেমন: গ্রায়েম সোয়ান, রবিচন্দ্রন অশ্বিন, নাথান লায়ন।
২. বাঁহাতি ফিঙ্গার স্পিন/ লেফট আর্ম অর্থোডক্স
ডানহাতি ফিঙ্গার স্পিনারের 'মিরর কপি' হচ্ছে লেফট আর্ম অর্থোডক্স।
যেমন: রঙ্গনা হেরাথ, ড্যানিয়েল ভেট্টোরি, সাকিব আল হাসান।
৩. ডানহাতি রিস্ট স্পিন/ রাইট আর্ম লেগ ব্রেক
ডানহাতি রিস্ট স্পিনারের স্টক ডেলিভারি হচ্ছে লেগ ব্রেক। বল রিলিজের সময় রিস্টের মুভমেন্ট হবে ডান থেকে বামে অর্থাৎ ঘড়ির কাঁটার বিপরীতে।
যেমন: শেন ওয়ার্ন, ইয়াসির শাহ, ইমরান তাহির, রশিদ খান।
***ব্যতিক্রম- মুত্তিয়া মুরালিধরন একজন ডানহাতি রিস্ট স্পিনার হয়েও তাঁর ছিল ক্লকওয়াইজ রিস্ট মুভমেন্ট। স্টক ডেলিভারি ছিল অফ ব্রেক। যার ভিত্তিতে তিনি একজন অফ স্পিনার।
৪. বাঁহাতি রিস্ট স্পিন/ লেফট আর্ম আনঅর্থোডক্স/চায়নাম্যান
ডানহাতি রিস্ট স্পিনারের 'মিরর কপি' হচ্ছে লেফট আর্ম আনঅর্থোডক্স যার আরেক নাম চায়নাম্যান।
যেমন: ব্র্যাড হগ, পল অ্যাডামস, লক্ষণ সান্দাকান, কূলদীপ যাদব।
'চায়নাম্যান' নামটা এসেছে চাইনিজ বংশোদ্ভূত ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাবেক বাঁহাতি রিস্ট স্পিনার এলিস আচংয়ের হাত ধরে। তবে ইতিহাসের সর্বপ্রথম লেফট আর্ম আনঅর্থোডক্স বোলার হলেন দক্ষিণ আফ্রিকার চার্লি লোয়েলিন।
এবারে আসি স্পিন বোলিংয়ের প্রচলিত বিভিন্ন ভ্যারিয়েশন প্রসঙ্গে।
★ লেগ স্পিন ভ্যারিয়েশন
১. লেগ ব্রেক (Leg break)
লেগ স্পিনারের স্টক ডেলিভারির নাম লেগ ব্রেক। এন্টি-ক্লকওয়াইজ রিস্ট মুভমেন্টের দ্বারা বলে রেভ্যুলেশন ইমপার্ট করা হয় এবং বলটি পিচ করার পর টার্নের গতিপথ হবে লেগ সাইড থেকে অফ সাইডে।
২. গুগলি/রঙ-আন (Googly/Wrong-un)
গুগলি বা রঙ-আন হচ্ছে লেগ স্পিনের গ্রিপে অফ স্পিন। গুগলির আচরণ লেগ ব্রেকের সম্পূর্ণ বিপরীত। সাধারণ লেগ ব্রেক পিচে পড়ার পর লেগ থেকে অফের দিকে টার্ন করে। কিন্তু গুগলি টার্ন করে অফ থেকে লেগের দিকে।
সাধারণ লেগব্রেক আর গুগলির গ্রিপিংয়ের কৌশল এক হলেও রিস্ট পজিশন এবং রিলিজ পয়েন্ট সম্পূর্ণ আলাদা। ট্রেডিশনাল 'ফ্রন্ট অফ দ্য হ্যান্ড' রিলিজের পরিবর্তে বল রিলিজ করা হয় 'ব্যাক অফ দ্য হ্যান্ড' থেকে।
একজন লেগ স্পিনারের অস্ত্রভান্ডারে সবচেয়ে মারাত্মক ও কার্যকরী অস্ত্র হচ্ছে গুগলি।
১৯০৩ সালে সর্বপ্রথম 'গুগলি' আবিষ্কার করেন সাবেক ইংলিশ লেগ স্পিনার বার্নার্ড বোসাঙ্কোয়েট। পরবর্তীতে বিল ও'রাইলি, আব্দুল কাদির, মুশতাক আহমেদ, রশিদ খানসহ অনেকেই গুগলি ব্যবহারে পারদর্শিতা দেখিয়েছেন।
৩. টপ স্পিনার (Top Spinner)
টপ স্পিনার হচ্ছে স্টক ডেলিভারি এবং গুগলির মাঝামাঝি একটা ডেলিভারি। এই বলের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে 'টার্ন কম, বাউন্স বেশি'। বলে সাইড স্পিনের চেয়ে ওভার স্পিন বেশি থাকায় এমনটা হয়ে থাকে।
তুলনামূলক হাই ট্র্যাজেক্টরি এবং আপওয়ার্ড স্পিনিং মোশনের কারণে বলে প্রচুর ওভারস্পিন থাকে। ফলে বল ফ্লাইট থেকে দ্রুত ডিপ করে অর্থাৎ লুপ সৃষ্টি হয় এবং স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বাউন্স করে।
ভারতের সাবেক লেগ স্পিনার অনিল কুম্বলের স্টক ডেলিভারিই ছিল টপ স্পিন।
৪. স্লাইডার (Slider)
লেগ স্পিন এবং স্লাইডারের পার্থক্য বলের গ্রিপিং এবং রিলিজ পয়েন্টে। কনভেনশনাল 'ক্রস সিম' গ্রিপের পরিবর্তে স্লাইডারের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় 'সিম আপ' গ্রিপ। রিলিজের সময় সিম পজিশন থাকে হরাইজন্টাল/স্ক্র্যাম্বলড (scrambled)। ফলে বাতাসে বলের ট্রাজেক্টরিতে সিমের নির্দিষ্ট কোন ডিরেকশন থাকে না।
স্লাইডারের বেলায় সাধারণ লেগব্রেকের মত সিম ডিরেকশন অনুযায়ী বল স্পিন করে না। অস্থিতিশীল (unstable) সিম ডিরেকশনের কারণে বল অনিয়মিতভাবে (unsteadily) বাতাসে স্পিন করতে থাকে এবং পিচ করার পর একদমই টার্ন করে না বরং স্কিড করে।
স্লাইডারের আবিষ্কারক সাবেক অস্ট্রেলিয়ান লেগ স্পিনার পিটার ফিলপট। পরবর্তীতে রিচি বেনো, ডগলাস রিং, শেন ওয়ার্ন, ইয়াসির শাহসহ অনেকেই স্লাইডারে পারদর্শিতা দেখিয়েছেন।
৫. ফ্লিপার (Flipper)
একজন রিস্ট স্পিনারের যতগুলি ভ্যারিয়েশন আছে, তার মধ্যে সবচেয়ে কঠিন হচ্ছে ফ্লিপার আয়ত্ত করা। এটির গ্রিপ করার পদ্ধতিও একেবারেই আলাদা। বৃদ্ধাঙ্গুলি, তর্জনী ও মধ্যমার সাহায্যে বলকে শক্তভাবে চেপে ধরে 'ফ্রন্ট অব দ্য হ্যান্ড' একশনে ছেড়ে দেয়া হয় (squeezed out)।
ফ্লিপারের বৈশিষ্ট্য হল, তুলনামূলক ফ্লাটার ট্র্যাজেক্টরিতে বল পড়ার পর লো হয়ে যাবে এবং প্রায় দ্বিগুণ গতিতে স্কিড করবে।
স্লাইডার এবং ফ্লিপারের কার্যকারিতা একই; পার্থক্য কেবল গ্রিপিংয়ে। ফ্লিপারে এলবিডব্লু এবং বোল্ড হবার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে।
ফ্লিপারের আবিষ্কারক সাবেক অস্ট্রেলিয়ান স্পিন কিংবদন্তি ক্ল্যারি গ্রিমেট। পরবর্তীতে শেন ওয়ার্ন, অনিল কুম্বলে, ব্র্যাড হগসহ অনেকেই ফ্লিপার ব্যবহারে সফলতা অর্জন করেছেন।
৬. কুইকার (Quicker)
কনভেনশনাল লেগ ব্রেকের ফাস্টার ভ্যারিয়েশন হচ্ছে 'কুইকার'।
শহীদ আফ্রিদী, রশিদ খানরা ফ্লাটার ট্রাজেক্টরিতে ৯০ কিলোমিটারের বেশি স্পিডে যে লেগ ব্রেক করে থাকেন, সেটাই 'কুইকার'। লেগ ব্রেকের মত টপ স্পিনার এবং গুগলিরও কুইকার ভ্যারিয়েশন আছে।
★ অফ স্পিন ভ্যারিয়েশন
১. অফ ব্রেক (Off Break)
অফ স্পিনারের স্টক ডেলিভারির নাম অফ ব্রেক। ক্লকওয়াইজ ফিঙ্গার মুভমেন্টের দ্বারা বলে রেভ্যুলেশন ইমপার্ট করা হয় এবং পিচ করার পর টার্নের গতিপথ হবে অফ সাইড থেকে লেগ সাইডে।
২. দুসরা (Doosra)
দুসরা হচ্ছে অফ স্পিনের গ্রিপে লেগ স্পিন। অফ স্পিনারের রঙ-আনও বলে থাকেন অনেকে। এর আচরণ অফ ব্রেকের সম্পূর্ণ বিপরীত। সাধারণ অফব্রেক পিচে পড়ার পর অফ থেকে লেগের দিকে টার্ন করে। কিন্তু দুসরার গতিপথ লেগ থেকে অফের দিকে।
প্রথাগত অফব্রেকের প্রায় অবিকল গ্রিপে বোলারের হাত থেকে নির্গত হয় এই ডেলিভারি; পার্থক্য কেবল রিস্ট পজিশন এবং রিলিজ পয়েন্টে। ধ্রুপদী অফস্পিনে বুড়ো আঙুলের সঙ্গে থাকে তর্জনী ও মধ্যমার কারিকুরি। দুসরায় বল ছাড়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তে অনামিকা বা রিং ফিঙ্গারের ব্যবহার বলটাকে ঠেলে দেয় উল্টোদিকে।
দুসরার আবিষ্কারক সাবেক পাকিস্তানি অফ স্পিনার সাকলাইন মুশতাক। সাকলাইন ছাড়াও মুত্তিয়া মুরালিধরন, হরভজন সিং, সাঈদ আজমল এবং ইয়োহান বোথাও দুসরা ব্যবহারে সফলতা পেয়েছেন।
৩. আর্ম বল (Arm Ball)
আর্ম বলকে বলা হয় অফ স্পিনারের ন্যাচারাল ভ্যারিয়েশন। আর্ম বলের গ্রিপিং টেকনিক অনেকটা ফাস্ট বোলারদের নরমাল ‘সিম আপ’ ডেলিভারির মত। থাম্ব এবং তর্জনী বলের সিম বরাবর রেখে সামনের দিকে জোরের ওপর পুশ করা হয়। আর্ম বল করার সময় কাঁধের ওপর প্রচুর চাপ পড়ে।
আর্ম বলের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, বল স্পিন না করে আর্মের ডিরেকশনে সোজা চলে যাবে এবং স্কিড করবে। সিম পজিশন সোজা রাখার ফলে ফাস্ট বোলারদের মত বল সুইং করার একটা প্রবণতা থাকে।
লেফট আর্ম অর্থোডক্স স্পিনারদের অন্যতম সেরা অস্ত্র এই আর্ম বল। বাঁহাতি ফিঙ্গার স্পিনারদের স্টক ডেলিভারি টার্ন করে 'এওয়ে ফ্রম দ্য রাইট হ্যান্ডার্স'। অন্যদিকে, আর্ম বল ড্রিফট করে ভেতরে ঢোকে এবং অনেকটা ইনসুইঙ্গারের মত আচরণ করে।
ইংল্যান্ডের সাবেক লেফট আর্ম স্পিনার হেডলি ভেরিটি 'ফাস্ট ইনসুইঙ্গিং' আর্ম বলের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। পরবর্তীতে ডেরেক আন্ডারউড, ড্যানিয়েল ভেট্টোরি, মোহাম্মদ রফিক, আব্দুর রাজ্জাক, রঙ্গনা হেরাথ, সাকিব আল হাসানরা আর্ম বল ব্যবহারে পারদর্শিতা দেখিয়েছেন।
৪. ক্যারম বল/ সুডোকু বল (Carrom Ball/ Sudoku Ball)
ক্যারম বল মূলত ফিঙ্গার স্পিনের গ্রিপে লেগ স্পিন। ক্যারম বলের গ্রিপ অফ স্পিন কিংবা দুসরা থেকে একদমই আলাদা। এখানে বলটাকে গ্রিপ করা হয় বৃদ্ধাঙ্গুলি, তর্জনী এবং ভাঁজ করা মধ্যমাঙ্গুলির সাহায্যে। ঠিক যেভাবে একজন ক্যারম প্লেয়ার স্ট্রাইকে শুট করার আগে 'স্ট্রাইকার গ্রিপ' করেন, ক্যারম বলের গ্রিপও সেই একই ধরনের। রিলিজের আগে বলটাকে শক্তভাবে স্কুইজ করা হয় এবং ছাড়া হয় আঙুলের সাহায্যে টোকা (flick) দিয়ে।
যখন মধ্যমাঙ্গুলির গ্রিপ লেগের দিকে থাকে তখন বল লেগ থেকে অফের টার্ন করে। যখন মধ্যমাঙ্গুলির গ্রিপ অফের দিকে থাকে তখন বল অফ থেকে লেগে টার্ন করে। গ্রিপের উপর নির্ভর করে ক্যারম বলের গতিপথ স্ট্রেইটও হতে পারে। তার মানে ক্যারম বলের গ্রিপে ভ্যারিয়েশন এনে অফ স্পিন, লেগ স্পিন, টপ স্পিন তিনটাই করা সম্ভব। যে কারণে ক্যারম বলকে অনেকে 'মিস্ট্রি বল' হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকেন।
চল্লিশের দশকে অস্ট্রেলিয়ার জ্যাক আইভারসন সর্বপ্রথম ক্যারম বল আবিষ্কার করেন। পরবর্তীতে জন গ্লিসন এবং তার বহু বছর পরে অজন্তা মেন্ডিস, রবিচন্দ্রন অশ্বিন, সুনীল নারাইন এবং মুজিব জাদরান ক্যারম বলে পারদর্শিতা দেখিয়েছেন।
৫. টপ স্পিনার (Top Spinner)
একজন রিস্ট স্পিনার এবং একজন ফিঙ্গার স্পিনারের 'টপ স্পিনার' কার্যত একই ডেলিভারি; পার্থক্য কেবল বলের গ্রিপিং এবং রিস্ট পজিশনে।
৬. আন্ডারকাটার (Undercutter)
তুলনামূলক লোয়ার ট্রাজেক্টরিতে 'হরাইজন্টাল সিম' গ্রিপে এক বিশেষ কায়দায় এই বলটি ডেলিভারি দেওয়া হয়। সাধারণ অফ ব্রেক, দুসরা কিংবা টপ স্পিনের সাথে এর পার্থক্য অনেক।
বলটির 'পয়েন্ট অব রিলিজে' হাতের পাম অর্থাৎ তালু থাকবে আকাশের দিকে। রিলিজের সময় বলে প্রচুর 'হরাইজন্টাল সাইড স্পিন' ইমপার্ট করার ফলে বলটি বাতাসে ড্রিফট করবে। কিন্তু টার্ন করার পরিবর্তে বল স্কিড করবে।
রাউন্ড আর্ম একশন ছাড়া এই বল করা সম্ভব না। লো ট্র্যাজেক্টরির কারণে এই বলে মারা বেশ কঠিন।
৭. তিসরা/অর্থোডক্স ব্যাক স্পিনার (Teesra/ Orthodox Backspinner)
তিসরা হচ্ছে স্লাইডারের অফ স্পিন ভার্সন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে একদমই অপ্রচলিত এই ডেলিভারিটির বিশেষত্ব হচ্ছে ব্যাকস্পিন। প্রচুর ব্যাকস্পিন থাকায় বল পড়ার পর লো হয়ে যাবে এবং স্কিড করবে।
তিসরার আবিষ্কারক সাবেক পাকিস্তানি অফ স্পিনার সাকলাইন মুশতাক।