12/18/2020
রউফুল আলম স্যারের ফেসবুক টাইমলাইন থেকে
—বিসিএস সর্বস্ব দেশে—
ভারতের কয়েক লক্ষ লোক আমাদের দেশে কাজ করছে। ভারত আমাদের দেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে নিচ্ছে। —এই হলো আমাদের অভিযোগ ও হাপিত্যেশ! কিন্তু আমরা কী ভাবি, এই গ্লোবালাইজেশনের কালে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো কী চায়? —কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো চায় দক্ষ জনশক্তি। কে কোথা থেকে এলো, সেটা একটা প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের ভাবার বিষয় না। ঠিক এ কারণেই, বাংলাদেশের বহু ছেলে-মেয়ে আমেরিকায় বসে লক্ষ ডলারের চাকরি করছে। বহু আমেরিকানদের পেছনে ফেলে, চীন ও ভারতের ছেলে-মেয়েরা দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে।
আমাদের ছেলে-মেয়েরা কেমেস্ট্রি পড়ে রূপালি ব্যাংকে চাকরি করে। এপ্লাইড ফিজিক্স পড়ে পরিসংখ্যান ব্যুরো অফিসে গিয়ে বুড়ো হয়। আর এদিকে কর্পোরেট অফিসের বড়ো বড়ো জবগুলো দখল করে আছে ভারতীয়রা। —কেন হয়েছে এটা? কারণ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কর্মমুখী শিক্ষা দিতে পারছে না। বাজারমুখী শিক্ষা দিতে পারছে না। অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে যোগাযোগ নেই দেশের কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের। আমরা বুঝতে চাই না, একটা দেশ চালায় অর্থনীতি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সেই অর্থনীতিকে স্টেইবল বা সাস্টেইনেবল করতে বিশ্বমানের জনশক্তি তৈরি করে—হোক সেটা ব্যাংকার, বিজ্ঞানী, শিক্ষক কিংবা প্রযুক্তিবিদ!
আমেরিকায় কেউ বায়োকেমিস্ট্রি পড়ে ব্যাংকে চাকরি করতে যায় না। ব্যাংকে চাকরি পাবেও না। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয় তাকে যে এডুকেশন ও ট্রেইনিং দিয়ে সনদ দিয়েছে, সেটা বাজারের সাথে তাল রেখেই দিয়েছে। সেই স্টুডেন্ট ব্যাচেলর শেষ করে তার লেভেলের একটা জবে ঢুকে পড়বে। শুধু তাই নয়, গোটা দেশে বায়োকেমেস্ট্রি রিলেটেড কি পরিমান জব আছে, সে অনুপাতেই স্টুডেন্টদের শিক্ষা দেয়া হবে। যেনো অধিকসংখ্যক স্টুডেন্ট সেই বিষয়টা পড়ে বেকার না হয়ে পড়ে। আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গণহারে ডিপার্টমেন্ট খুলে, গণহারে ছেলে-মেয়ে ভর্তি করানো হয়। আমরা ভাবিও না, সেই ছেলে-মেয়েগুলো পাশ করে কি করবে! দেশে ফিলোসফি চর্চার একটা বিশ্বমানের ইনস্টিটিউট নেই অথচ সারা দেশে অন্তত কয়েক হাজার স্টুডেন্ট ফিলোসফি পড়ে—এই হলো চিত্র! সারা পৃথিবী যখন কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তায়(AI) সুপ্রিমেসির জন্য লড়াই করছে, তখন আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা, মেশিন লার্নিং এই বিষয়গুলো নিয়ে তেমন পড়াশুনা ও গবেষণা শুরুই হয়নি। —কী দুঃখজনক!
আমাদের কোর্সগুলোর আপডেট হয় কম। কোন শিক্ষক কিসের উপর পিএইচডি করে গেলো, সেটার ভিত্তিতে কোর্স ডিজাইন করা হয়। এটা ভয়ংকর! কারণ একটা ডিপার্টমেন্টে ত্রিশজন শিক্ষক ত্রিশটা ফিল্ডে পিএইচডি করে। স্টুডেন্টরা কী ত্রিশ ফিল্ডের কোর্স পড়বে? তাছাড়া, জামা-কাপড়ের মতো পড়াশুনা এবং গবেষণারও ট্রেন্ড আছে, ফ্যাশন আছে। সেটা বদলায়—প্রতি দশকে দশকেই বদলায়। পৃথিবীর এই ট্রেন্ডের সাথে সাথে কোর্সগুলোকে বদলাতে হয়। শিক্ষকদের প্রচুর পড়তে হয়। প্রচুর শ্রম দিয়ে কোর্স ডিজাইন, প্রজেক্ট ডিজাইন, ল্যাব ওয়ার্ক ইত্যাদি বদলাতে হয়। দেশ-বিদেশের কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান ও শিল্প-কারখানাগুলোতে কি ধরণের কাজ হয় সেগুলোর ভিত্তিতে কারিকুলাম ডিজাইন করতে হয়। একটা ব্রিজ তৈরি করতে হয়, যেনো শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ও প্রফেশনাল ক্যারিয়ারের ট্রানজিশনটা স্মুথ হয়।
দেশের ছেলে-মেয়েরা কেন শুধু বিসিএস বিসিএস করছে? —কারণ, সরকারি বা বেসরকারি আর কোন চাকরি নেই যেখানে একটা স্টুডেন্ট শ্রেফ স্নাতক পাশ করেই অফিসার শব্দটা লাগিয়ে উচ্চ বেতন তুলতে পারে। দেশের লাখো ছেলে-মেয়ে আসে গ্রাম থেকে। বহু কষ্টে, আর্থিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে সেইসব ছেলে-মেয়েরা স্নাতক পাশ করে। কিন্তু তারা জানে, শুধু কারেন্ট এফেয়ার্স পড়ে, খবরের কাগজের ছবি হওয়া সম্ভব!
আর এই বিসিএস সর্বস্বতার চক্রে হারিয়ে যায় বহু সম্ভাবনা। আমাদের উদ্ভাবন, আবিষ্কার করার মতো মেধাবী ছেলে-মেয়েগুলোকে আমরা দেশে ধরে রাখতে পারি না। গবেষণা ইনস্টিউট নেই। প্রচুর সংখ্যক তরুণ উদ্যোক্তা নেই। মেধাবী ও ডেডিকেইটেড শিক্ষক তৈরি হয় না। দেশের সবচেয়ে উদ্যোমী, পটেনশল, মেধাবী শ্রেণীর পুরোটা যখন শুধু বিসিএস ঘোরে বুঁদ হয়ে থাকে, তখন রাষ্ট্রের ভিত দুর্বল হয়। সেটা কী আমরা উপলব্ধি করছি? আর এ থেকে উত্তরণের জন্য রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার বিকল্প নেই। রাষ্ট্র যদি না বুঝে তার সম্ভাবনাকে কীভাবে সেগ্রিগেইট বা ডিসেমিনেইট করে গ্রো করার সুযোগ দিতে হবে, তাহলে সে রাষ্ট্রের তন্ত্রগুলো কখনোই শক্তিশালী হয় না। দেশ হলো মানবদেহের মতো—প্রত্যেকটা তন্ত্রকেই ভালো রাখতে হয়, শক্তিশালী করতে হয়।
……..........
নিউজার্সি, যুক্তরাষ্ট্র।
প্রাসঙ্গিক সূত্র:
CENTRE for Policy Dialogue (CPD) has recommended that the government should form a committee to investigate the large remittance outflows to India. This remittance is fully legal and is sent by the 500,000 or so Indians who work in Bangladesh. It is reported that Bangladesh stands 5th among the 15 n...