14/05/2026
ঠিক আছে রোদেলা, পরের অংশটা দিচ্ছি—
---
*নীল_কুয়াশা | পর্ব ২*
নীলার হাত কাঁপছিল।
আমার হাতও।
প্লাস্টিকের ব্যাগটার ভেতর থেকে আমি প্রথমে ছবিটা বের করলাম।
ছবিতে মা।
আমাদের পুরান ঢাকার ছাদে, ঈদের দিন।
গায়ে নীল শাড়ি, কপালে ছোট্ট টিপ।
আমি তখন সাত বছরের। মায়ের কোমর জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছি, দাঁত বের করে হাসছি।
মায়ের চোখে তখন সেই হাসি— যেটা আমি বারো বছর বয়সের পর আর কখনো দেখিনি।
ছবিটা উল্টালাম।
পেছনে ছোট ছোট করে লেখা—
_“আমার রোদেলা। আমার সাহস। ২০১২”_
হাত থেকে ছবিটা পড়ে যেতে নিয়েছিল।
২০১২… মা চলে যাওয়ার ঠিক আগের বছর।
নীলা তখন কাগজগুলো এগিয়ে দিল।
ভাঁজ করা, হলুদ হয়ে যাওয়া কয়েকটা পৃষ্ঠা।
উপরে আমার নাম— _রোদেলা_।
প্রথম লাইনটা পড়েই আমার গলা শুকিয়ে গেল।
> “রোদেলা,
> যদি কোনোদিন এই চিঠি তোর হাতে পড়ে, তার মানে আমি আর ফেরার পথ রাখিনি।
> কিন্তু তুই যেন ভাবিস না— তুই দায়ী।”
আমার চোখ ঝাপসা হয়ে এলো।
নীলা পাশে বসে ছিল, নিঃশব্দে কাঁদছিল।
চিঠিটা আমি পড়তে লাগলাম।
> “সেদিন তুই যা দেখেছিলি, সেটা সত্যি।
> আমি অস্বীকার করব না।
> কিন্তু সত্যির পেছনে আরেকটা সত্যি ছিল— যেটা আমি কখনো বলতে পারিনি।
>
> তোর নানা মারা যাওয়ার পর আমাদের সংসার ডুবছিল।
> তোর বাবা তখন বেকার।
> আমি অফিসে নতুন জয়েন করেছি।
>
> বড় স্যার… উনি আমাকে বলেছিলেন, ‘প্রমোশন চাইলে একটু মানিয়ে নিতে হবে।’
> আমি ভেবেছিলাম, চাকরি না থাকলে তোরা না খেয়ে মরবি।
> তাই… মানিয়ে নিয়েছিলাম।
> একবার, দুইবার… তারপর নিজেকেই ঘেন্না করতে শুরু করলাম।
>
> সেদিন তুই আমাকে দেখে ফেললি।
> আমি ভয় পেয়ে গেলাম।
> যদি তোর বাবা জানে, যদি তোরা জানো— আমি আর মুখ দেখাতে পারব না।
>
> আমি পালিয়ে গেলাম, কারণ আমার মনে হলো— আমি থাকলে তোদের আরও লজ্জা হবে।
> আমি ভাবলাম, আমি না থাকলে তোদের জীবন সহজ হবে।
>
> কিন্তু সবচেয়ে বড় ভুলটা করলাম আমি।
> তোকে দোষ দিলাম।
>
> রোদেলা, মাফ করিস।
> তুই সত্যি বলেছিলি।
> দোষটা আমার ছিল।
>
> আমি জানি, ফিরে আসার অধিকার আমার নেই।
> শুধু এটুকু চাই— তুই নিজেকে দোষ দিস না।
> তুই কোনোদিন ভাঙার কারণ ছিলি না।
> তুই ছিলি একমাত্র কারণ, যার জন্য আমি এতদিন বেঁচে আছি।
>
> ইতি,
> তোর মা”
চিঠিটা পড়া শেষ হলে ঘরে পিনপতন নীরবতা।
বাইরে শুধু রাস্তার কুকুরের ডাক।
আমার বুকের ভেতর এতদিন যে পাথরটা চেপে ছিল, সেটা একটু নড়লো।
সব আমার দোষ না।
আমি দায়ী না।
নীলা ফিসফিস করে বলল,
“আব্বু জানতো?”
আমি মাথা নাড়লাম।
বাবা জানতো।
তাই তো সেদিন রাতে বাবার গলাটা এত ভেঙে গিয়েছিল।
তাই তো বাবা আর কখনো মায়ের নাম নেয়নি।
পরদিন সকালে আমি বাবার ঘরে গেলাম।
বাবা বারান্দায় বসে ছিল, হাতে চায়ের কাপ।
আগের মতোই চুপচাপ।
আমি চিঠিটা ওর সামনে রাখলাম।
বাবা পড়লো।
একটা শব্দও বললো না।
শুধু চোখের কোণে পানি জমলো।
অনেকক্ষণ পর বলল,
“তোর মা কাপুরুষ ছিল রে রোদেলা।
নিজের ভুল স্বীকার করার সাহস ছিল না।
তাই তোর ওপর দোষ চাপিয়ে পালো।”
আমি বললাম,
“তুমি কেন বলোনি আমাকে?”
বাবা হাসলো।
সেই পুরোনো, ভাঙা হাসি।
“তুই নিজেকে দোষ দিতি।
আমি চাইছিলাম, তুই বড় হোস।
নিজে বুঝিস।”
সেদিন প্রথমবার বাবা আমাকে জড়িয়ে ধরলো।
এত বছরের দূরত্ব এক মুহূর্তে গলে গেল।
আমি বুঝলাম, সংসার ভাঙেনি।
সংসার ভেঙে গিয়েছিল আমার ভেতরে।
আর সেটা জোড়া লাগলো একটা চিঠিতে।
মা আর ফিরলো না।
ফিরবেও না হয়তো।
কিন্তু আজ আমি জানি—
আমি দোষী না।
আমি ভাঙার কারণ না।
আমি ছিলাম মায়ের একমাত্র সত্যি।
আজ আমার বয়স চব্বিশ।
আমি এখন আর রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে মায়ের জন্য অপেক্ষা করি না।
আমি নিজেই নিজের জন্য দাঁড়াই।
আর রাতে ঘুমানোর আগে আয়নায় নিজেকে দেখি।
বলি—
“রোদেলা, তুই ঠিক আছিস।”
*সমাপ্ত।*
---
চাইলে আমি এটাকে ছোট গল্পের মতো করে একটা পূর্ণাঙ্গ ভার্সনও সাজিয়ে দিতে পারি, যাতে ইউটিউব/ফেসবুকে ন্যারেশন দিতে পারো। বানাবো?
সংগৃহীত