26/02/2021
আমার ৪ বছরের বাচ্চা ছেলেটা যখন আমার দিকে করুণ চোখে তাকিয়ে বললো,
- "বাবা, আমি আরবি শিখবো না। আমিও তন্ময় ভাইয়ার মত গান শিখবো আর জেনি আপুর মত নাচ শিখবো।"
কথাটা শুনে আমি মোটেও অবাক হয় নি বরং কিছুক্ষণ আগে যা ঘটলো তা শুধু আমার বাচ্চা ছেলের মনে প্রভাব ফেলে নি। আমার মনেও প্রভাব ফেলেছে...
আমার শ্বশুর চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর পারিবারিক একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সেই অনুষ্ঠানে উনার সকল ছেলেমেয়েরা আসে।
সন্ধ্যার পর আমরা সবাই মিলে যখন কথাবার্তা বলছি তখন আমার ছোট শালা বাচ্চাদের জন্য একটা প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। সেই প্রতিযোগিতায় বাচ্চারা যে যা পারে সেটা তারা করে দেখাবে। আমার ছেলেকে প্রথম ডাকলে আমি আমার ছেলের কানে কানে বলি,
- বাবা, তুমি সূরা ফাতিয়া খুব সুন্দর করে পাঠ করবে কেমন?
আমার ছেলে যখন সূরা পাঠ করছিলো তখন কেউ সেটা মনোযোগ দিয়ে শুনছিলো না। সবাই যার যার মত ফোন টিপছিলো, কথাবার্তা বলছিলো। কিন্তু আমার স্ত্রী শ্রাবণীর বড় বোনের ৬ বছরের ছেলেটা যখন মাইয়া ও মাইয়ারে তুই অপরাধীরে এই গানটা গাইছিলো তখন সবাই অনেক মনোযোগ দিয়ে শুনছিলো। কেউ কেউ গানের সাথে সুর মেলাচ্ছিল। গান শেষে সবাই করজোড়ে হাততালি দিলো। কেউ কেউ জড়িয়ে ধরে চুমু খেলো। শ্রাবণীর বড় ভাইয়ের ৮ বছরের মেয়েটা যখন ও সাকি গানের সাথে নাচ করছিলো তখন ওর সাথে উপস্থিত অনেকেই নাচছিলো। হেসে খেলে খুব মজা করছিলো।
এটা দেখেই আমার বাচ্চা ছেলেটার মন খারাপ হয়ে গেলো। সে মনে মনে হয়তো ভাবছে, সে গান নাচ পারে না দেখে তাকে কেউ আদর করে নি!
রাতে খাবার টেবিলে বসে যখন সবাই খাচ্ছিলাম তখন শ্রাবণীর বড় ভাই আমার দিকে তাকিয়ে বললো,
- "তুমি নিজে হলে কাঠমোল্লা আর আমার ছোট বোনটাকেও বানালে তোমার মতো। এই গরমের ভিতর দেখি তুমি আমার বোনটাকে আলখাল্লা পরিয়ে নিয়ে এসেছো। এইভাবে নাক-মুখ ঢেকে চলাচল করলে দম আটকে তো মরে যাবে। এখন দেখছি ছেলেটাকেও ঐ দিকেই নিয়ে যাচ্ছো। অন্তত, ছেলেটাকে তোমাদের মত না বানিয়ে ক্রিয়েটিভ কিছু শিখাও!"
আমি ঘাড় নেড়ে শুধু বললাম,
- জ্বি আচ্ছা
শ্রাবণীর বড় বোন তখন বললো,
- "আমার ছেলের গানের মাস্টারকে প্রতি মাসে ৫ হাজার টাকা করে দিতে হয়। আমি তো শ্রাবনীকে সব সময় বলি তোর ছেলেকেও একটা গানের টিচার রেখে দে। কিন্তু, শ্রাবণী তো আমার কোন কথাই শুনে না।"
কথাটা শুনে শ্রাবণীর বড় ভাই আমায় খোঁচা দিয়ে বললো,
- "গানের টিচার রাখলে তো পিয়াসের টাকা নষ্ট হবে। তাই সে ও ওর ছেলেকে ওর মত কাঠমোল্লা বানাবে। বিয়ের পর দেখলাম না কখনো আমার বোনকে দামি কিছু কিনে দিতে।"
কথাগুলো কেন জানি সহ্য করতে পারছিলাম না তাই মৃদু হেসে শ্রাবনীর বড় ভাইকে বললাম,
- ভাই, আপনি মারা গেলে আপনার মেয়ে প্রতিদিন আপনায় স্মরণ করে সাকি সাকি গানের তালে তালে নাচবে। এতে কি আপনার কবরের আজাব কমবে না বাড়বে সেটা আমি ঠিক জানি না।
আর তারপর শ্রাবণীর বড় বোনের দিকে তাকিয়ে বললাম,
- আপা, আপনি মারা গেলে আপনার ছেলে প্রতিদিন আপনার কবরের সামনে গিয়ে অপরাধী গান শুনিয়ে আসবে। এতে মনে হয় কবরের আজাবটা দ্বিগুণ বৃদ্ধি পাবে। তখন শুধু এটাই বলবেন, যদি ছেলেকে ৫ হাজার টাকা খরচ করে গান না শিখিয়ে ৫০০টাকা খরচ করে একটু কুরআন শিক্ষা দিতাম তাহলে কবরে আমার এতটা আজাব হতো না...
আমি মারা গেলে না হয় আমার কাঠমোল্লা ছেলে কবরে পাশে দাড়িয়ে একটু দোয়া করে আসবে। এতে নিশ্চয়ই আমার কবরের আজাব পুরোটা না কমলেও কিছুটা হলেও কমবে।
আমার কথাগুলো শুনে সবাই মাথা নিচু করে চুপ করে রইলো, আর কিছু না বলে নিজের প্লেটে থাকা খাবারটা শেষ করলাম।
রাতে ঘুম আসছিলো না তাই বেলকনিতে দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাৎ শ্রাবণী পিছন থেকে আমার কাঁধে হাত রেখে বললো,
- ভাইয়া আর আপুর কথায় কিছু মনে করেছো কি?
আমি হেসে বললাম,
- আরে না, আচ্ছা আমি তোমায় জন্য যে দামী কিছু কিনে দিতে পারি না এজন্য কি আমার প্রতি তোমার কোন অভিযোগ আছে?
শ্রাবণী আমায় শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললো,
"তোমার মত একজনকে আমি পেয়েছি এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি, আমার আর কিছু চাই না।"
• প্রাপ্তি •
- আবুল বাশার পিয়াস