29/07/2022
সম্মানিত মুসল্লি বৃন্দ,
আমরা আজকে আমরা যে বিষয়ে আলোচনা করবো তা যদি সঠিকভাবে আমরা অনুধাবন করতে পারি এবং বাস্তব জীবনে সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারি তাহলে আমাদের পার্থিব জীবন সুন্দর এবং সংকটমুক্ত হবে। পাশাপাশি আমাদের পারোলৌকিক জীবনে সাফল্য লাভও সহজ হবে, ইনশাআল্লাহ।
সে বিষয়টা হলো অপচয়।যা আমাদের সকল কর্মকান্ডের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে।
প্রথমতঃ যেটা বলে রাখা ভালো, আজকের আলোচনাটা যেমনি ভাবে আপনাদের বিরুদ্ধে যাবে তেমনি ভাবে আমার বিরুদ্ধেও যাবে। এ কারণে আমরা মনঃক্ষুণ্ণ না হয়ে কুরআন হাদিসের যথাযথ অনুসরণ করে আমাদের জীবন সুন্দর করার চেষ্টা করি।
দ্বিতীয়তঃ যে কথা বলতে চাই, আজ বাংলাদেশের অধিকাংশ মিম্বারে সরকার বিরোধী কথা হবে তথা বিদ্যুৎ সংশ্লিষ্ট সরকারের যে বিশেষ বক্তব্য ছিল, সেটার বিরুদ্ধেই হবে। আমরাও সেটার বিরুদ্ধে কথা বলতে পারি। বলাটা কোনমতেই অনুচিত নই। তবে যেটা আরো বেশি ফল বহন করে নিয়ে আসবে আমাদের জন্যে, আমাদের দেশের জন্যে আমরা সে বিষয়ে ভালভাবে ফোকাস করতে চাই।
আর সে বিষয়টি হলো অপচয়
অপচয়। একটি অপরাধ।একটি পাপ।
এর আরবী পরিভাষা হলো ‘ইসরাফ’ (إسراف) ।যার শাব্দিক অর্থ সীমালঙ্ঘন, অপব্যয়, অমিতব্যয়, বাড়াবাড়ি, মাত্রাতিরিক্ততা, অপরিমিতি।
বিশিষ্ট ভাষাতত্ত্ববিদ শরীফ আলী জুরজানী (৭৪০-৮১৬ হিঃ) ‘ইসরাফ’-এর সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে,
الإسراف هو إنفاق المال الكثير في الغرض الخسيس وتجاوز الحد في النفقة، وقيل: أن يأكل الرجل ما لا يحل له، أو يأكل مما يحل له فوق الاعتدال، ومقدار الحاجة-
‘ইসরাফ হ’ল কোন হীন উদ্দেশ্যে প্রচুর অর্থ-সম্পদ ব্যয় করা এবং ব্যয়ের ক্ষেত্রে সীমা লঙ্ঘন করা। কেউ কেউ বলেন, কোন ব্যক্তির অবৈধ বস্ত্ত ভক্ষণ করা অথবা তার জন্য যা কিছু হালাল তা অপরিমিত ও প্রয়োজনের অতিরিক্ত আহার করা’।শরীফ আলী জুরজানী, কিতাবুত তা‘রীফাত (বৈরূত: দারুল কিতাবিল আরাবী, ১৪০৫ হি.), পৃঃ ৩৮।
ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন,من أنفق درهما في غير حقه فهو سرف ‘যে ব্যক্তি অনর্থক কাজে এক দিরহামও খরচ করল সেটাই অপচয়’।[ইমাম কুরতুবী, আল-জামি‘ লি আহকামিল কুরআন (বৈরূত : দারু ইহয়াইত তুরাছিল আরাবী, ১৯৮৫ খ্রি./১৪০৫ হি.), ১৩তম খন্ড, পৃঃ ৭৩
আলোচনা থেকে জানতে পারলাম, অতিরিক্ত, অপ্রয়োজনীয়' কোন কিছুতে ব্যয় করা কিংবা প্রয়োজনীয় কোন কাজে অতিরিক্ত ব্যায় করা অপচয়।
অন্যত্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরোক্ষভাবে অপ্রয়োজনীয়' কোন কিছু করা থেকে বারণ করেছেন। রাসূল (ছাঃ) বলেন,فِرَاشٌ لِلرَّجُلِ وَفِرَاشٌ لاِمْرَأَتِهِ وَالثَّالِثُ لِلضَّيْفِ وَالرَّابِعُ لِلشَّيْطَانِ ‘একটি বিছানা স্বামীর জন্য, আরেকটি স্ত্রীর জন্য, তৃতীয়টি মেহমানের জন্য আর চতুর্থটি শয়তানের জন্য’।[মুসলিম হা/৫৫৭৩।
অর্থাৎ কোন বসৎ বাড়িতে পুরুষদের জন্য, নারীদের জন্য, অতিথিদের জন্য আলাদা আলাদা ঘর থাকার পরেও আভিজাত্য, বিলাসিতা প্রদর্শনের জন্য অতিরিক্ত ঘর রাখা শয়তানের জন্য ঘর রাখার নামান্তর।
উপরে বর্ণিত হাদীসে অপচয় ও কৃপণতার মাঝামাঝি অবস্থা বর্ণিত হয়েছে । কিন্তু অধিকাংশ লোক এই নীতির প্রতিফলন ঘটায় না। অথচ ইসলাম মধ্যপন্থা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা ঈমানদার বান্দাদের বৈশিষ্ট্য প্রসঙ্গে বলেন,وَالَّذِينَ إِذَا أَنْفَقُوا لَمْ يُسْرِفُوا وَلَمْ يَقْتُرُوا وَكَانَ بَيْنَ ذَلِكَ قَوَامًا ‘তারা যখন ব্যয় করে, তখন অপব্যয় করে না বা কৃপণতা করে না। বরং তারা এতদুভয়ের মধ্যবর্তী অবস্থায় থাকে’ (ফুরকান ২৫/৬৭)।
মহানবী (ছাঃ) বলেন,كُلُوا وَاشْرَبُوا وَتَصَدَّقُوا وَالْبَسُوا غَيْرَ مَخِيلَةٍ وَلاَ سَرَفٍ ‘তোমরা খাও, পান কর, দান-ছাদাক্বাহ কর এবং পরিধান কর, তবে অহংকার ও অপচয় ব্যতীত’।আহমাদ হা/৬৬৯৫, সনদ হাসান
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,يَا بَنِي آدَمَ خُذُوْا زِينَتَكُمْ عِنْدَ كُلِّ مَسْجِدٍ وَكُلُوْا وَاشْرَبُوْا وَلَا تُسْرِفُوْا إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِيْنَ، ‘হে আদম সন্তান! তোমরা প্রত্যেক ছালাতের সময় সুন্দর পোষাক পরিধান কর। তোমরা খাও ও পান কর। কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ অপচয়কারীদের ভালবাসেন না’ (আ‘রাফ ৭/৩১)।
আলোচনার প্রাসঙ্গিকতায় আমরা এ আয়াত থেকে ধরে নিতে পারি জীবনধারণের জন্য কিংবা সুন্দরভাবে জীবন পরিচালনা করার জন্য যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই করা বৈধ, করা উচিত। কিন্তু এর অতিরিক্ত করা অপচয়।
আরেক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
إِنّ اللهَ كَرِهَ لَكُمْ ثَلاَثًا قِيلَ وَقَالَ وَإِضَاعَةَ الْمَالِ وَكَثْرَةَ السّؤَالِ.
আল্লাহ তোমাদের জন্যে তিনটি বিষয়কে অপছন্দ করেন- ১. অপ্রয়োজনীয় প্রসঙ্গে আলোচনা করা/না জেনে আন্দাজে কথা বলা, ২. সম্পদ নষ্ট করা, ৩. অধিক প্রশ্ন করা। -সহীহ বুখারী, হাদীস ১৪৭৭
শুধু অর্থ সম্পদের অপচয়ই নয়। যে মুমিন সে তো অপ্রয়োজনীয়, অনর্থক কাজ থেকে বিরত থাকার কথা। মহান আল্লাহ বলেন-
وَ الَّذِیْنَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُوْنَۙ
বাজে কাজ থেকে দূরে থাকে,( আল-মু’মিনূন,:আয়াত: ৩,)
হাদীস নববীর নির্দেশনা-
إِنّ مِنْ حُسْنِ إِسْلاَمِ الْمَرْءِ تَرْكَهُ مَا لاَ يَعْنِيهِ.
ইসলামের অন্যতম সৌন্দর্য-এর অনুসারী অনর্থক সব কিছু বর্জন করবে। -(জামে তিরমিযী, হাদীস ২৩১৮)
এবার ভিন্ন ভাবে বলি।
নিম্মোক্ত আয়াতটি সবার কাছে জানা।
لَىِٕنْ شَكَرْتُمْ لَاَزِیْدَنَّكُمْ وَ لَىِٕنْ كَفَرْتُمْ اِنَّ عَذَابِیْ لَشَدِیْدٌ.
অর্থঃ তোমরা যদি (আমার নিআমতের) কৃতজ্ঞতা আদায় কর তাহলে আমি অবশ্যই তোমাদেরকে আরও বাড়িয়ে দেব, আর যদি অকৃতজ্ঞ হও তাহলে (জেনে রেখো,) আমার শাস্তি অবশ্যই অত্যন্ত কঠিন! -সূরা ইবরাহীম (১৪)
সাধারণত এখানে কুফরির অর্থ করা হয় আল্লাহর পথে সম্পদ ব্যায় না করা। কিন্তু এখানে এ অর্থ করারও সুযোগ আছে যে, আল্লাহর বিধান অনুযায়ী তাঁর পন্থায় অর্থ-সম্পদ ব্যয় না করাও কুফরি তথা অকৃতজ্ঞতা। যেহেতু আল্লাহ অপচয় হারাম করেছেন সেহেতু অপচয় করলে আল্লাহ কঠিন শাস্তি দিবেন।
এবার আসুন আমরা কিভাবে অপচয় করি তার কিছু দৃষ্টান্ত দেখে নিই।
১) প্রয়োজনের অতিরিক্ত পোশাক পরিচ্ছদ ক্রয়।
২) ভোজন বিলাসিতা।
৩) স্মার্টনেসের নামে খাবারের প্লেটে খাবার উপযোগী উচ্ছিষ্ট রাখা।
৪) বুফে খেতে যেয়ে অপচয়ের প্রতিযোগিতায় নামা।
৫) শখের বসে প্রয়োজন ছাড়া একই পরিবারে একাধিক প্রাইভেট কার ব্যবহার করা।
৬) অজু গোসলে, নিত্যদিনের কাজে প্রয়োজনাতিরিক্ত পানি ব্যবহার করা।
৭) শুধু একটি দিয়াশলাই খরচ করার ভয়ে গ্যাসের চুলা জালিয়ে রেখে রাষ্ট্রীয় সম্পদ নষ্ট করা।
৮) নিজের বসৎ বাড়ি, অফিস-আদালতে সৌন্দর্য বর্ধনের নামে প্রয়োজনাতিরিক্ত বিদ্যুৎ খরচ করা।
৯) বিয়ে, জন্মদিন, মেজবান ইত্যাদি আয়োজনে শোভাবর্ধনে, ভোজনে বেশি-বেশি করা।
১০) দিবস উদযাপন, কোন কিছু উদ্ভোদনে অপরিনামদর্শী ব্যয় করা।
আরো কত ভাবে যে অপচয় হয় তা বলে শেষ করা যাবে না। তাই শেষ করতেও চাইনা।
এবার আপনি বলবেন, আমার সামর্থ্য আছে, খরচ করতে সমস্যা কি? তাহলে নিচের হাদিস খানা একটু খেয়াল করুন। রাসুল সঃ আমাদেরকে কি সুন্দর করে বুঝিয়েছেন
أن النبى صلى الله عليه وسلم مر بسعد وهو يتوضأ فقال: " ماهذا السرف؟ " فقال: أفى الوضوء إسراف قال: " نعم وإن كنت على نهر جار
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাসের পাশদিয়ে যাচ্ছিলেন এমন সময় সা'দ অজু করছিলেন। নবী সঃ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, সা'দ এটা কোন ধরনের অপচয়? সা'দ রাঃ বল্লেন, "অজুতেও কি অপচয় আছে?"
রাসুল সঃ বল্লেন, "তুমি যদি নদিতে অজু করো তাহলেও" ( অপচয়ের ব্যাপারে খেয়াল রাখতে হবে। তোমার প্রয়োজনের অতিরিক্ত খরচ করা যাবেনা)
আলোচনায় আমরা এ কথাটা স্পষ্ট করার চেষ্টা করেছি যে অপচয় একটি অন্যায়,অপরাধ। সাথে সাথে এটি পাপও বটে।
একটি পরিচিত একটি পংক্তি। যা সকলের জানা আছে। " যে জন দিবসে মনের হরষে জ্বালায় মোমের বাতি / আশু গৃহে তার দখিবে না আর নিশীথে প্রদীপ বাতি। "
অপচয় এমন একটা অপরাধ যা অপরাধীকে পার্থিব জীবনে শাস্তির মুখোমুখি করে,পরবর্তী জীবনে অপমান লাঞ্ছনার স্বীকার হতে হয় অপরিনামদর্শী, দাম্ভিক অপচয় কারিকে । আমাদের সামনে এরকম অসংখ্য দৃষ্টান্ত আছে যে, অপচয় কারির পরবর্তী প্রজন্মও অপচয়ের শাস্তি বহন করে চলছে।
সুতরাং আমাদের উচিত অপচয় থেকে বেচে থাকা। সেটা অর্থের সাথে সংশ্লিষ্ট হোক, কিংবা খাদ্যের সাথে, অথবা সময়ের সাথে। বিদ্যুতের ক্ষেত্রে অপচয়ও আমাদের রোধ করতে হবে।সেটা আমাদের বাসাবাড়ি, প্রতিষ্ঠান, দোকানপাট অফিস-আদালত যেখানেই হোক না কেন।।
এর মাধ্যমে আমাদের পার্থিব জীবন সুন্দর, সহজ ও সংকট মুক্ত হবে। পাশাপাশি আমাদের পারলৌকিক মুক্তির পথ সুগম হবে এবং আল্লাহতালার কাছে আমাদের হিসাবটাও সহজ হবে। ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহ তাআলা বক্তা ও শ্রোতা উভয়কে আমল করার তাওফিক দান করুক। আমিন।
হাযা নিন ইনদী ওয়াল ইলমু ইনদাল্লাহ। আসসালামুআলাইকুম ওরাহমাতুল্লাহ